জাতীয় নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী বাছাইয়ের মহড়া পাঁচ সিটিতে!

চলতি বছরের শেষে বা আগামী বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তার আগে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি সিটি করপোরেশনে নির্বাচন হতে যাচ্ছে মে-জুনে। সংসদ নির্বাচনের মাস ছয়েক আগের এই ভোটে প্রার্থী ঠিক করা ছিল আওয়ামী লীগের জন্য এক রকম পরীক্ষা। নৌকার মেয়র প্রার্থী ঘোষণাকে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের মহড়া হিসেবে দেখছেন দলটির নেতারা।

শনিবার (১৫ এপ্রিল) আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় পাঁচ সিটিতে নৌকার মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে দলের সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের জানান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এবার গাজীপুরে আজমত উল্লাহ খান, বরিশালে আবুল খায়ের আবদুল্লাহ, সিলেটে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজশাহীতে খায়রুজ্জামান লিটন ও খুলনায় তালুকদার আব্দুল খালেক আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন।

পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে খুলনা ও রাজশাহীতে বর্তমান মেয়ররা নৌকার টিকিট পেলেও বাকি তিন সিটিতে পরিবর্তন এসেছে। গাজীপুর সিটিতে সাবেক মেয়র প্রার্থীকে এবার মনোনয়ন দেওয়া হলেও বরিশাল ও সিলেটে নতুন মুখ বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সূত্রমতে, আওয়ামী লীগ সভাপতি বৈঠকে বলেছেন, প্রার্থীদের নিজের যোগ্যতায় বিজয়ী হয়ে আসতে হবে। কেউ সুবিধা নিয়ে নির্বাচিত হবেন, সেটি এবার হবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির মনোনয়ন বোর্ডের তিনজন সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের ছয় মাস আগে হতে যাচ্ছে পাঁচ সিটির নির্বাচন। তাছাড়া এবার সিটি নির্বাচন বিএনপি বর্জন করায় নিজেরা নিজেরাই ভোট করতে হচ্ছে। সে জন্য জনমত যাচাই ও প্রার্থী বাছাইয়ের এই পরীক্ষা ভালোভাবে সম্পন্ন করতে চায় সরকার। যাতে দেশে-বিদেশে বিদ্যমান ব্যবস্থায় ভালো নির্বাচন সম্ভব, সেটি প্রমাণিত হয়। এসব বিবেচনায় স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ও ক্লিন ইমেজের ভালো প্রার্থী মনোনীত করা হয়েছে।

অবশ্য পাঁচ সিটিতে মেয়র প্রার্থীদের নাম ঘোষণার সময় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, যারা মনোনয়ন চেয়েছে, তাদের প্রার্থিতা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সেটা বিবেচনা করেই আমরা একজনকে বেছে নিয়েছি। সবকিছু চিন্তা-ভাবনা করেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কাজেই এখানে কী প্রভাব ফেলেবে, কী ফেলবে না- সেই প্রভাবের কথা ভেবেই তো মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড সূত্র বলছে, রাজশাহীতে খায়রুজ্জামান লিটন ও খুলনায় তালুকদার আব্দুল খালেকের গ্রহণযোগ্যতার ওপর তাদের ভরসা আছে। স্থানীয় নেতারাও তাদের ওপর আস্থাশীল বলে জানিয়েছেন। তাদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে তেমন কোনও বিতর্ক নেই। এসব বিবেচনায় লিটন ও খালেককে এবারও প্রার্থী করা হয়েছে আর গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম ও বরিশালের মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ বাদ পড়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় নেতাদের আস্থাহীনতা, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা, দলের রাজনীতিতে আলাদা বলয় তৈরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মাধ্যমে করা জরিপেও বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন খুলনায় তালুকদার আব্দুল খালেক (ওপরে প্রথম), রাজশাহীতে খায়রুজ্জামান লিটন, বরিশালে আবুল খায়ের আবদুল্লাহ, সিলেটে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী (নিচে প্রথম), গাজীপুরে আজমত উল্লাহ খান

দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আরও তিন নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পাঁচ সিটিতে নৌকার প্রার্থী বাছাই করতে গিয়ে মূলত জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের বার্তা দিয়েছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। এবার সংসদ নির্বাচনে বিতর্কিত, অপকর্মকারী ও অজনপ্রিয় এমপিরা নৌকার টিকিট পাচ্ছেন না, এটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেলো। তারা যতই প্রভাবশালী হোক বা তাদের পেছনে যত বড় প্রভাবশালীই থাকুক না কেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রবিবার (১৬ এপ্রিল) আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তে যুগোপযোগী ও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রার্থী দিয়েছি আমরা। রাজনীতিতে মানুষের মুডের অ্যাসেসমেন্ট করতে হয়। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেভাবে আমরা পাঁচ সিটিতে নৌকার প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছি। নির্বাচনে জেতার মতো প্রার্থীদের হাতে নৌকা প্রতীক দেওয়া হয়েছে। এটাকে আপনারা মহড়া বলতে পারেন, যা খুশি বলতে পারেন।

মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজনীতি করতে হয়, সিদ্ধান্ত নিতে হয় উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের এই সদস্য বলেন, মানুষ তাদের কাছে আস্থাশীল প্রার্থী প্রাত্যাশা করে। তারা সুষ্ঠু ও একটি ভালো নির্বাচন চায়। মানুষের সেই প্রত্যাশার প্রতি সম্মান জানাতে পাঁচ সিটিতে প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন এসেছে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় নিশ্চিতভাবেই বড় পরিবর্তন আসবে উল্লেখ করে কাজী জাফরুল্লাহ বলেন, বর্তমান সংসদের অনেক সদস্য নৌকার মনোনয়ন পাবেন না। তাদের পরিবর্তে সাবেক সংসদ সদস্য অথবা নতুন নেতাদের প্রার্থী করা হবে। তবে সেই সংখ্যাটা কেমন হবে, তা এখনও বলার সময় আসেননি। আর আমি সংখ্যা বলে দেওয়ার পক্ষেও না।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্যের মতে, পাঁচ সিটির মধ্যে তিনটিতেই নৌকার কাণ্ডারী পরিবর্তন করে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী নেতাদের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত মন্ত্রী-এমপিদের আমলনামা দেখে মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন জরিপে ভালো অবস্থানে থাকা নেতাদের প্রার্থী করা হবে।

এবার নৌকার টিকিট না পাওয়া সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র। তার বাবা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন, পারিবারিকভাবে ভাতিজা সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর সঙ্গে অনেক আগে থেকেই খোকন সেরনিয়াবাতের চাপা দ্বন্দ্ব রয়েছে। সাদিক স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়ানোর পর খোকন সেরনিয়াবাত সক্রিয় হয়ে ওঠায় তার নাম সামনে আসে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে নৌকার টিকিট পাওয়া আজমত উল্লাহ খান গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠন হওয়ার পর প্রথম নির্বাচনে (২০১৩ সাল) আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আলোচনায় আসেন জাহাঙ্গীর আলম। তখন নির্বাচনে জয়লাভ করেন বিএনপির (প্রয়াত) নেতা এম এ মান্নান। ২০১৮ সালের নির্বাচনে নৌকার টিকিট নিয়ে মেয়র হলেও বহিষ্কৃত হন জাহাঙ্গীর আলম। পরে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে মেয়র পদ থেকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার হয়নি।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও নিজ জেলার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে নিয়ে জাহাঙ্গীর আলমের বিতর্কিত বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এর জেরে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি।

আরও পড়ুন-

পাঁচ সিটির মেয়র পদে আ.লীগের মনোনয়ন চূড়ান্ত, বাদ সাদিক ও জাহাঙ্গীর