সামান্তা শারমিনের নতুন আহ্বান

জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন সামান্ত শারমিন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এক ফেসবুক পোস্টে তিনি এ কথা জানান। তিনি পদত্যাগের পেছনে মৌলক চারটি কারণ দেখান। এগুলো হলো-জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটভুক্ত হওয়া, বড় রাজনৈতিন দলের লেজুড় হয়ে নির্বাচন করা, নারী নেতৃত্বের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া এবং কাউন্সিল না করে অগণতান্ত্রিকভাবে এনসিপির নতুন কমিটি দেওয়া। 

স্ট্যাটাসের শেষে সামান্তা লেখেন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরির প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, আমি কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। যারা আমার সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে চান সবাইকে আহ্বান করছি, যোগাযোগ করুন। আমি আপনাদের সঙ্গে নিয়েই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরির প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে চাই।

সামান্তা শারমিনের পুরো স্ট্যাটাস তুলে ধরা হলো

ফেসবুক পোস্টে সামান্তা লেখেন, কিছুক্ষণ আগে জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে আমি পদত্যাগ করেছি। প্রায় এক বছর আগে আমি জাতীয় নাগরিক পার্টির জোট গঠনের প্রশ্নে একটা আলাদা অবস্থান নিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, জামায়াত ইসলামী নীতিগত বা কৌশলগত কোনও ক্ষেত্রেই মিত্র হওয়ার যোগ্য না এবং তাদের সঙ্গে জোট করার জন্য এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে।  

তিনি লেখেন, গত ১১ মাস ধরে আমার রাজনৈতিক বোঝাপড়া অনুযায়ী এনসিপির অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে যখনই সুযোগ পেয়েছি, তখনই দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব প্রদান এবং তর্ক- বিতর্ক বা আলাপ- আলোচনা করেছি। যেহেতু সংগঠনে নানা চড়াই-উৎরাই থাকে, সেখানে দল যদি ভুল পথে যায় সেই পথ থেকে দলকে রক্ষা করার চেষ্টা করা আমার রাজনৈতিক কর্তব্য ছিল। সেই কর্তব্য পালন করতে এনসিপির অভ্যন্তরে মতাদর্শিক সংগ্রামকেই বেছে নিয়েছিলাম। কারণ দলের গৃহীত নীতিসমূহকে স্বীকৃত ফোরামগুলোতে যুক্তিসঙ্গত উপায়ে চ্যালেঞ্জ করা ব্যতীত দলকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনার ভিন্ন কোনও গণতান্ত্রিক পন্থা ছিল না। আজ প্রায় এক বছরের এই সংগ্রামের ইতি ঘোষণা করলাম, কারণ এনসিপির পক্ষে তার দলের প্রারম্ভের মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক হওয়া সম্ভব বলে মনে করি না।

তিনি লেখেন, পদত্যাগ করার জন্য আমি হয়তো আরও উপযোগী সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারতাম, যখন দলের কোনও একটি সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডেরে প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমার পদত্যাগকে মূল্যায়ন করা সহজ হতো, কিন্তু আমি মনে করি এই অপেক্ষা অর্থহীন। এনসিপি কখনও কখনও নানান ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকা নিতেই পারে (এমনকি জামায়াতের সঙ্গে জোট ত্যাগ করার মতো সিদ্ধান্ত) কিন্তু তবুও পুরোনো রাজনৈতিক ধাঁচের বাইরে নিজস্ব পরিচয়, চিন্তা ও কর্মসূচি তৈরি করতে পারবে বলে আমি মনে করি না।

তিনি লিখেন, দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলতে চাই, পুরোনো ব্যবস্থার রাজনৈতিক দল কখনই রাষ্ট্রের নতুন ব্যবস্থা আনার জন্য সহায়ক হবে না; বরং বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এখন সময় এসেছে যখন দলের সঙ্গে আমার এতদিন যেসব মতপার্থক্য হয়েছে, আলাপ আলোচনা হয়েছে সেসব বিষয় দলের সবার এবং দলীয় কাঠামোর বাইরের শুভানুধ্যায়ীদের জানানো দরকার।

প্রথম প্রসঙ্গ: সংস্কারের বন্ধু জামায়াত হতে পারে কি না

দেশের আপামর মানুষের আকাঙ্ক্ষার দল হিসেবে এনসিপির রাজনীতি ছিল সংস্কার। আমাদের এটা নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে যাওয়ার পথে রাষ্ট্রের বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো যেন বাধা দিতে না পারে। সে জন্য কমপক্ষে তিনটি জায়গায় সংস্কার করার দরকার ছিল।
 
১. সাংবিধানিক সংস্কার (সংবিধানে স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী ভিত্তি পরিবর্তনের জন্য) 

২. আইনের সংস্কার (রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইন-কানুনকে গণবিরোধী থেকে জনকল্যাণের দিকে নেওয়ার জন্য)

৩. রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার (পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচলিত কাঠামোর সংস্কার এবং এর মাধ্যমে এই ভূখণ্ডের ঔপনিবেশিক রাজনীতি বদলের জন্য)

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই তিনটির মধ্যে একটিকেও নিজ দলের রাজনীতি ও রাষ্ট্রপ্রকল্পের অংশ মনে করে না এবং জামায়াত প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না। সংগঠনটির দার্শনিক ভিত্তি ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রপ্রকল্প গণতান্ত্রিক রাষ্টপ্রকল্প নয়। জামায়াতকে যতটুকু সংস্কারের কথা বলতে দেখা যায় ততটুকু বলে ২৪ এর আকাঙ্ক্ষাকে কুক্ষিগত করার প্রয়োজন থেকে, ভণিতা হিসেবে।

তিনি লেখেন, গণতান্ত্রিক সংস্কারের মূল জায়গা একটি উদার গণতান্ত্রিক সামাজিক মূল্যবোধ থেকে উৎসারিত। অন্যদিকে জামায়াত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপন্থীই শুধু নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সব সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিয়ে একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই সংগঠনটির রাজনৈতিক অভিপ্রায়। এ জন্যই তার রাজনীতির মূলভিত্তি পরিবর্তন হয়নি। তার প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনে গণহত্যাকেও জায়েজ মনে করে জামায়াত। ৭১'এ জামায়াতের ভূমিকাকে অপরাধ মনে না করা এবং এর জন্য জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়া- এই সাংগঠনিক ও দার্শনিক ভিত্তির ওপরই দণ্ডায়মান।

তিনি লেখেন, এনসিপি যখন জামায়াতকে সংস্কারের পথে বন্ধু মনে করেছে তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, যারা স্বভাবজাত কারণেই উদার, গণতান্ত্রিক, যারা সংস্কারের প্রকৃত শক্তি, তারা সংস্কারের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এনসিপির নিজস্ব ও রাজনৈতিক লাইন স্পষ্ট না থাকায় জামায়াতের মধ্যে এনসিপিকে হারিয়ে যেতে হচ্ছে এবং জামায়াতের জন্য নানান ইস্যুতে প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা নিতে হচ্ছে।

যেহেতু জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া দল এনসিপি, তাই আমি দলকে বারবার এই সমস্যাগুলো সম্পর্কে সাবধান করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি।

দ্বিতীয় প্রসঙ্গ: নির্বাচন 

২০২৬ সালের নির্বাচনটি একটি রাজনৈতিক নির্বাচন হিসেবে অনুষ্ঠিত হওয়ার সকল সম্ভাবনা ছিল। এই ভূখণ্ডে এমন রাজনৈতিক নির্বাচন বারবার এসেছে যেমন ৪৬ সালে, ৫৪ সালে, ৭০ সালে এমনকি ৯০ সালেও। এসব নির্বাচন কেবল ক্ষমতাসীন দল পরিবর্তনের নয়; বরং একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। ২৬-এর নির্বাচনের পূর্বে এটি যেন একটি রাজনৈতিক নির্বাচন না হয়ে ক্ষমতা বদলের নির্বাচনে পর্যবসিত হয়, সেই লক্ষ্যে নির্বাচনকে অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চরিত্র থেকে সরাতে চেয়েছে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো। এনসিপির সুযোগ ছিল ঐকমত্য কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের ব্যর্থতা ইত্যাদির পরেও যারা এই পুরোনো ব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে চায় তাদের সঙ্গে জোট করা অথবা একা হলেও একটা রাজনৈতিক নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এই কাজটি করতে পারলে এখনকার ফলাফলের চেয়ে আরও ভালো  ফলাফল পেতে পারতো এনসিপি। কারণ রাজনৈতিক নির্বাচনের ফলাফল দলীয় ক্ষমতা দিয়ে হয় না। এটাই ইতিহাসে পূর্ববর্তী সব রাজনৈতিক নির্বাচনের শিক্ষা। কিন্তু এনসিপি ইতিহাসের এই শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে ‘বড়’ রাজনৈতিক দলের লেজুড় হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি আর অভ্যুত্থানোত্তর নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করেছে।

১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনি কৌশলে অংশ না নিয়েও বর্তমানে যেই ফলাফল এসেছে তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করা যায় এমন পাঁচটি পদ্ধতির কথা আমি দলের নেতৃত্বকে বলেছিলাম, কিন্তু দল সে পথে হাঁটেনি। রাজনৈতিক জয় অপেক্ষা নির্বাচনি জয়কে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে সংস্কারবিহীন সিস্টেম দিয়ে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি করার গ্রহণযোগ্যতাও হারিয়ে ফেলেছে এনসিপি। 

এখানে সংক্ষেপে নিরাপত্তাহীনতা প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে, শহীদ ওসমান হাদি ঢাকার একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ আসনে, শক্ত প্রতিদ্বন্দীর বিপক্ষে ন্যূনতম পাঁচশত ভোট পাওয়ার আকাঙ্খা নিয়ে সম্পূর্ণ একা নতুন ধরনের নির্বাচনি ক্যাম্পেইন করেছিলেন। অথচ অগণতান্ত্রিক ও অতি পুরাতন নির্বাচনি কৌশল 'বড় পার্টির সাথে জোট' করার কারণ হিসেবে ওনার মৃত্যুর ঘটনাকেই ব্যবহার করা হয়েছে, যা পুরোপুরি অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তৃতীয় প্রসঙ্গ: অভ্যুত্থানে নারীর মালিকানা ও অধিকার
 
আধুনিক রাজনীতির ইতিহাসে নারীরা যেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, সেই আন্দোলন পরাজিত হয়নি। বাংলাদেশের লড়াইয়ের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নারীরা ছিলেন এই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক, সম্মুখসারির যোদ্ধা ও রক্ষাকর্তা।

নারীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, ন্যায্য হিস্যা, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান—এসবই ছিল এই অভ্যুত্থানে তাদের অংশগ্রহণের ভিত্তি। গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশ নেননি, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। ব্যারিকেডের সামনে তাদের অবস্থান, সাহস ও সক্রিয়তা অভ্যুত্থানকে সার্বজনীন রূপ দিয়েছে। কিন্তু বিজয়ের পর থেকেই পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক পক্ষগুলো, দলগুলো নারীদের সেই বিজয়ের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে সক্রিয় হয়েছে। আন্দোলনের সময় যেসব সামাজিক অনুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় নাই, যেসব প্রতিবন্ধকতা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণকে থামাতে পারে নাই, বিজয়ের পর সেগুলোকেই নারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবেই নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য হিস্যার দাবিকে কোণঠাসা করে পুরোনো, নারীবিহীন রাজনৈতিক মাঠ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে।

পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে এসে এনসিপির সামনে ভিন্ন একটি রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ ছিল। দলটি চাইলে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারতো। সে জন্য শুধু নারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট না; সংখ্যা, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এনসিপি সেই পথ বেছে নেয়নি বরং দলটির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে গেছে। এর মধ্য দিয়ে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের অবনমন ঘটেছে।

এনসিপি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে আসার যে সম্ভাবনা গণঅভ্যুত্থান তৈরি করেছিল, তা ধারণ করতে চায়নি। বরং পুরোনো দলগুলোর মতোই নারীদের কোণঠাসা করেছে, তাদের প্রতিবাদকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি এবং পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ নারীরা দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ। এনসিপি মনে করেনি নারীদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা মানে শুধু দলের নারী সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা নয়; দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা।

বাংলাদেশের মতো সমাজে নারীদের উত্তরণের জন্য ইতিবাচক বৈষম্য বা পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন দরকার —অর্থাৎ ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীদের এগিয়ে নিতে বিশেষ সুযোগ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাও অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। কারণ, রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো নারীদের দমিয়ে রাখতে সক্রিয়। এই ব্যবধান কাটাতে নারীদের শুধু সমান সুযোগ দিলেই চলে না; প্রয়োজন অধিক প্রতিনিধিত্ব, অধিক ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ। এত কিছুর পরও হয়তো প্রতিষ্ঠিত বৈষম্যের পুরো ব্যবধান দূর করা সম্ভব হতো না। 

নারীদের রাজনৈতিকভাবে পেছনে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় জামায়াত ও অতি-ডানপন্থী শক্তিগুলোর ভূমিকা রয়েছে। এনসিপিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের রক্ষণশীল অবস্থানের অনুসারী ও সহযোগী হয়েছে। ফলে সমস্যাটি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই; দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার মধ্যেও নারীবিরোধী অবস্থান জায়গা করে নিয়েছে।

আন্দোলনে নারী যে ভূমিকা রাখতে পারেন, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে পুরুষও তা রাখতে পারেন না। পুরুষ যখন অন্য পুরুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে দাঁড়ান, তার প্রভাব এক রকম; কিন্তু নারী যখন পুরুষের রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠেন, তখন সেই ভূমিকা প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতাসম্পর্ক ও সামাজিক প্রত্যাশাকে আরও গভীরভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নারীরা ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকে সুরক্ষিত করেছেন। অথচ বিজয়ের পর তাঁদের মর্যাদা, রাজনৈতিক অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

এই বৈপরীত্য একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: আন্দোলনের সময় মিছিলের সামনে নারীদের এগিয়ে রাখা কি তাদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সক্ষমতার স্বীকৃতি ছিল, নাকি বিপদের মুখে তাদের উপস্থিতিকে নিরাপত্তাবলয় হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল ছিল? যদি নারীদের সাহস ও ত্যাগ আন্দোলনের প্রয়োজনে গ্রহণ করা হয়, অথচ বিজয়ের পর তাদের ক্ষমতা ও ন্যায্য হিস্যা অস্বীকার করা হয়, তাহলে তাদের অংশগ্রহণের প্রকৃত স্বীকৃতি কোথায়?

যে অভ্যুত্থান বৈষম্য, নিপীড়ন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তার উত্তরাধিকার বহন করার দাবি করা একটি দল নিজের কাঠামোর ভেতরেই বৈষম্যমূলক ক্ষমতাসম্পর্ক পুনরুৎপাদন করতে পারে না। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশগ্রহণ করেননি; তাঁরা আন্দোলনের চরিত্র নির্মাণ করেছেন। যে রাজনৈতিক শক্তি বিজয়ের জন্য নারীর সাহস ও প্রতিরোধকে প্রয়োজনীয় মনে করে, অথচ বিজয়ের পর তাঁদের সমান মর্যাদা ও ক্ষমতা দিতে অস্বীকার করে, সে শক্তি প্রকৃত অর্থে বৈষম্যবিরোধী নয়।

চতুর্থ প্রসঙ্গ: কাউন্সিল এড়িয়ে এনসিপির পুনর্গঠন
 
অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক দলের প্রত্যাশা করেছিল, যার কাঠামো হবে প্রচলিত দলগুলোর চেয়ে ভিন্ন। সেই নতুনত্ব শুধু নেতৃত্ব বা রাজনৈতিক বক্তব্যে বা সাধারণ চলাফেরায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দলের অর্থনৈতিক কাঠামোয় স্বচ্ছতা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় গণতন্ত্রের চর্চার মধ্য দিয়েও প্রতিফলিত হবে।

পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোতে আমরা দেখেছি—ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, পরিবারতন্ত্র, পদ-পদবি বণ্টনে স্বজনপ্রীতি, অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব, দলের আর্থিক ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা, তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা, ভিন্নমত দমনের প্রবণতা এবং নেতৃত্বের জবাবদিহি না থাকা। ফলে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ কর্মীদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকে, আর নেতৃত্ব পরিবর্তন ও বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হয়ে পড়ে। পুরোনো ধরনের দলগুলোর ক্ষেত্রে কাউন্সিলের সময় পেছানো বা কাউন্সিল করতে না চাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হলো নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন করা। সময়মতো কাউন্সিল না হলে নেতৃত্বের বৈধতা, জবাবদিহি ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে সংশয় তৈরি হয়; সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ক্রমশ সীমিতসংখ্যক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই কাউন্সিল কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, এটি দলের গণতান্ত্রিক চর্চা ও সাংগঠনিক জবাবদিহির অন্যতম ভিত্তি।

দলের কাউন্সিল না করে পুনরায় আহ্বায়ক কমিটি ‘রিস্ট্রাকচার’ দলের অভ্যন্তরের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যেই প্রবণতা পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আছে। বিরোধীমতকে দমন করার পুরোনো প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছে এনসিপি। শুধু তাই নয়, দলের নেতৃত্ব নির্বাচনের আগেই এ ধরনের বড় ধরনের রদবদল এনসিপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নেতৃত্বের উদাসীনতাকে স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে এটি জাতীয় নির্বাচনি ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দলটির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনআস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে। যে দল নিজের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, তার পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা সম্ভব—সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

ওপরে বর্ণিত বিষয়সমূহের ব্যাপারে বারংবার পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানোর পরেও এনসিপি তার গতিপথ পরিবর্তন করতে আগ্রহী না হওয়ায় আমি জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে পদত্যাগ করছি। হয়তো আরও ব্যাখ্যা ও কারণ উপস্থাপন করা দরকার কিন্তু এই মূহুর্তে অবকাশ নেই। নিচে আমার রাজনৈতিক অভিমুখ উল্লেখ করছি।

বাংলাদেশের প্রয়োজন বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে ঐক্যের রাজনীতি

বাংলাদেশকে আজ নানা বিভাজনের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল এমন একটি রাজনৈতিক স্বপ্ন ও সম্ভাবনা তৈরি করা, যা মানুষকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করাবে না; বরং ভিন্নমত, ভিন্ন বিশ্বাস ও ভিন্ন পরিচয় সত্ত্বেও একটি অভিন্ন জাতীয় আকাঙ্ক্ষার জায়গায় ঐক্যবদ্ধ করবে। এনসিপি সেই সম্ভাবনা তৈরি করতে পারত। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক শক্তিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা ছিল—প্রচলিত রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে নতুন ধরনের রাজনীতি গড়ে উঠবে। কিন্তু সংকীর্ণ রাজনৈতিক হিসাব ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সেই সম্ভাবনা ক্রমশ  হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটি দলের কিংবা কয়েকজন নেতার সম্ভাবনা হারিয়ে যাওয়া মানে সেই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু নয়, মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া নয়।

আমাদের এখনও এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োজন, যার মূল লক্ষ্য হবে মানুষকে বিভক্ত করা নয়, ঐক্যবদ্ধ করা। এই ঐক্য কোনও বিশেষ মতাদর্শ, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা একক রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়; বরং এর ভিত্তি হতে হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের অভিযাত্রায় অভিন্ন অঙ্গীকার। 

এই ঐক্য গড়ে তুলতে হলে যারা নেতৃত্ব দেবেন, তাদের রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ, নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ নয়। ভারতবিরোধিতা করতে গিয়ে আমেরিকার পক্ষ নেওয়া, কিংবা আমেরিকাবিরোধিতা করতে গিয়ে চীনের স্বার্থের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মিলিয়ে ফেলা—কোনোটিই স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের রাজনীতি হতে পারে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হতে হবে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে; অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বা বিরাগের ভিত্তিতে নয়। ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করলে তার বিরুদ্ধে যেমন সোচ্চার হতে হবে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। এক দেশের ক্ষেত্রে আপসহীনতা আর অন্য দেশের ক্ষেত্রে নীরবতা—এটি বাংলাদেশপন্থা নয়; এটি দ্বৈত মানদণ্ড। প্রকৃত বাংলাদেশপন্থা হলো, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে বন্ধু-প্রতিপক্ষ নির্বিশেষে একই নীতি অনুসরণ করা।

একই সঙ্গে এই রাজনৈতিক শক্তিকে নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণকে কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নারীর স্বাধীন অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সমান নাগরিক অধিকারকে রাজনৈতিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
জাতীয় পুঁজির বিকাশ ও সুরক্ষা, দেশীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের প্রসার, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং দেশের সম্পদ ও নীতিনির্ধারণে জনগণের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নেও এই শক্তিকে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা মানে শুধু বিদেশি প্রভাবের বিরোধিতা নয়; দেশের ভেতরেও এমন সব ক্ষমতাকাঠামো ও স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, যা জনগণের অধিকার ও অর্থনৈতিক  সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে।

মানুষ তরুণদের পিছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাশা নিয়ে, যারা পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর পুনরাবৃত্তি করবে না; বরং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতির পথ তৈরি করবে। 

গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নগুলো এখনো নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের অপেক্ষায় আছে।

বাংলাদেশের তরুণদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন একটি দল গঠন করা নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য নির্মাণ করা, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজনই রাজনীতির চালিকাশক্তি হবে না; মতাদর্শের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন লক্ষ্যকে তা গ্রাস করবে না; আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের ঊর্ধ্বে কোনও বিদেশি শক্তির অবস্থান থাকবে না। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তরুণ সমাজ যদি আবার সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ নেয়, তবে তা হতে হবে অতীতের কোনও দলের পুনরাবৃত্তি নয়—বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের নতুন প্রচেষ্টা।

আমি এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। যারা আমার সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে চান সবাইকে আহ্বান করছি, যোগাযোগ করুন। আমি আপনাদের সঙ্গে নিয়েই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরির প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে চাই।