মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের উদ্দেশে এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, জাতীয় ঐক্য গড়ার ক্ষেত্রে অসুবিধা একটি রাজনৈতিক দল। সরকার চাইলে যেকোনও মুহূর্তে ওই দলটিকে নিষিদ্ধ করতে পারে। জামায়াতের একাত্তর-পরবর্তী প্রজন্মও জাতীয় ঐক্য চায়। তারা ঐক্যের বাধা হোক, সেটি চায় না। ফলে, তারা নিজেরাই ঐক্য থেকে সরে দাঁড়াতে পারে।
এরপর জামায়াত নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এমাজ উদ্দিন সাহেবরা কোন্ উদ্দেশ্যে কার এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এ ধরনের আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিয়ে চলেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
ঘটনার রেশ নতুন মাত্রা লাভ করে বুধবার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের পর। তিনি বলেন, ফখরুল বলেন, এমাজউদ্দীন সাহেব যে বক্তব্য দিয়েছেন, এটা কোনও দলীয় সিদ্ধান্ত নয়। এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
এমাজউদ্দীন আহমদের ঘনিষ্ট সূত্রের দাবি, মঙ্গলবারের অনুষ্ঠানে তার বক্তব্য অনেক পোলাইট ছিল। তিনি সিদ্ধান্ত আকারে কিছুই বলেননি। বরং কিছু রাজনৈতিক দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াত নিজে থেকে সরে পড়বে, এমন চিন্তা থেকেই তার বক্তব্য ছিল।
এ ব্যাপারে বুধবার সন্ধ্যায় এমাজউদ্দীন আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি তো জামায়াতকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে হবে, এমন কিছুই বলিনি।
সূত্রের ভাষ্য, মঙ্গলবার এমাজউদ্দীন আহমদের বক্তব্য অনেকটাই সিদ্ধান্ত আকারে একটি দৈনিকের অনলাইনে প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি নিজে যোগাযোগ করে সংবাদটি সংশোধন করান। যদিও এরই মধ্যে জামায়াতের বিবৃতি আসে। তবে বুধবার বিএনপির মহাসচিবের সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। এই সংবাদ সম্মেলনের কারণে হতাশ হয়ে পড়েছেন এমাজউদ্দীন।
দেশের বিশিষ্ট এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর ঘনিষ্ট একজন জানান, এমাজউদ্দীন আহমদ শুরু থেকেই খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্যের অগ্রগতি নিয়ে কাজ শুরু করেন। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে জাতীয় ঐক্যে জামায়াতকে বাধা হিসেবে দেখা হয় এবং খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও এমাজউদ্দীন দুজনেই জামায়াত বিষয়ে বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান। এরপর জাতীয় ঐক্যের পুরো কাজে যুক্ত হন এমাজউদ্দীন ও জাফরুল্লাহ। এই কাজে যুক্ত হতে গিয়ে নিজের পেশাগত কাজে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন এমাজউদ্দীন। অন্যদিকে জাফরুল্লাহ প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালকে ধানমণ্ডি থেকে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয় ডিসিসি দক্ষিণ।
এ বিষয়ে বিএনপির একাধিক নেতার মন্তব্য চাইতে ফোন করা হলে তারা কোনও কথা বলতে রাজি হননি। তবে বুধবার রাত নয়টার দিকে পরিচয় উদ্ধৃত না করে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বাংলা ট্রিবিউনকে অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, এমাজউদ্দীন স্যার কি বিএনপির শত্রু নাকি? তিনি ছাড়া কে আছে বুদ্ধিজীবী বিএনপির পক্ষে কথা বলেন? বিএনপি নেতার ভাষ্য, এমানজউদ্দীন আহমদ একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, যাকে ইচ্ছা করেই বিএনপি দূরে ঠেলে দিল।
মহাসচিবের সংবাদ সম্মেলনের উদ্দেশ্যে এই নেতা বলেন, বিএনপি জামায়াতকে বাঁচাতে চাচ্ছে কেন। কার স্বার্থে? জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনি জোট। জামায়াত তো এনজিও মার্কা দল। আন্দোলনের শক্তি নয়। তাহলে কেন দলটিকে রক্ষা করার চেষ্টা?
এই নেতার মত, এমাজউদ্দীন আহমদ বিএনপিকে সাজেশন দেন। তার মঙ্গলবারের বক্তব্যকে সাজেশন হিসেবে নিলেই হয়। আমি সংবাদ সম্মেলনে থাকলে বলতাম, যে এমাজউদ্দীন আহমদ আমাদের বুদ্ধিজীবী, তিনি তার অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। বিএনপির সিনিয়র নেতারা তাকে নিয়ে মন্তব্য করে জামায়াতকে রক্ষা করার চেষ্টা দেখালেন। কিন্তু কেন? তার মন্তব্যকে নিয়ে বক্তব্য দিয়ে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো। তারও তো প্রতিদ্বন্দ্বী আছে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি আসম আবদুর রব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জাতীয় ঐক্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনেই গড়ে তোলা প্রয়োজন। ফলে, জাতীয় ঐক্যগঠনের পেছনে যে বাধাগুলো রয়েছে, সেগুলোকে দূর করাটাও প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাধা দূর করার কথাই তো বলেছেন এমাজউদ্দীন আহমদ।
এমাজউদ্দীন আহমদের ঘনিষ্ট সূত্রটি জানায়, আগামী দু-একদিনের মধ্যে খালেদা জিয়ার সঙ্গে জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের মন্তব্য নিয়ে কথা বলবেন এমাজউদ্দীন আহমদ। খালেদা জিয়া সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্যের ডাক দেওয়ার পর এমাজউদ্দীন ও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মুখ্য ভূমিকা পালন করছিলেন। এরই মধ্যে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার বৈঠক ঠিক হয়েছে।
এমাজউদ্দীন আহমদ জানান, কাল থেকে অনেকটাই আনুষ্ঠানিকভাবে ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ায় তিনি এখন কতটা সক্রিয় থাকবেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি ম্যাডামের সঙ্গে দুই-একদিনের মধ্যে দেখা করে কথা বলব। দেখি কী হয়। এর বেশি কিছু বলতে পারব না।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, জঙ্গিবাদ প্রশ্নটিকে সরকার রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে। এ কারণে আইএস অস্বীকার করে জামায়াতকে দোষারোপ করা হচ্ছে। বৈশ্বিকভাবে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি হলেও সরকার দেখানোর চেষ্টা করছে যে, এই সমস্যাটি দেশীয়। এক্ষেত্রে সরকার জামায়াতকে টার্গেট করেছে। বিএনপি বুঝতেই পারছে না, যে নির্বাচনি জোটটিকে সরকার নষ্ট করতে চাইছে।
বিএনপির একনেতা বলেন, এক্ষেত্রে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে নেগোশিয়েট করতে পারে। বলতে পারে নির্বাচনের সময় জোট হবে। এখন হবে না। জোট ভেঙে দিতে পারে বিএনপি। কিন্তু এই রাজনীতিও করতে ব্যর্থ হলো দল। এমাজউদ্দীন আহমদ এক্ষেত্রে কাজটি ঠিকঠাকভাবে এগিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু তাকে বাধার মুখে পড়তে হলো।
এমাজউদ্দীনের ঘনিষ্ট সূত্রটি জানায়, বিগত বিএনপির কাউন্সিলের আগে এলডিপি ও বিকল্পধারাকে বিএনপির মধ্যে একীভূত করতে কথাবার্তা চূড়ান্ত করেছিলেন এমাজউদ্দীন ও খন্দকার মাহবুব হোসেন। কিন্তু বিএনপিতে জামায়াতঘনিষ্ট নেতারা খালেদা জিয়াকে বুঝিয়ে একীভূত প্রক্রিয়া ঠেকান।
বিএনপির একাধিক সূত্র দাবি করেছে, এখন এমাজউদ্দীন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক্ষেত্রে এমাজউদ্দীন আহমদকে বোঝাতে পারেন খালেদা জিয়া।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এমাজউদ্দীন আহমদ মন্তব্য করতে নিজের অনাগ্রহের কথা জানান। তার ঘনিষ্ট এক অধ্যাপক জানান, স্যার সক্রিয় হবেন নাকি নিষ্ক্রিয় হবেন, বিএনপির মহাসচিব বুঝিয়ে দিয়েছেন। এখন তো খালেদা জিয়া বিবেচনা করবেন। বিএনপির সঙ্গে থেকে তিনি নিঃসঙ্গ হয়েছেন। তার বয়সও হয়েছে। এই বয়সে এই ধরনের অবস্থা মানসিকভাবে তাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
আরও পড়তে পারেন: বৃহস্পতিবার খালেদার বাসায় যাচ্ছেন কাদের সিদ্দিকী
/এমএনএইচ/