বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আটকে আছে যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্র

চূড়ান্ত আন্দোলনের সময় ও সরকারবিরোধী যুগপৎ কর্মসূচির যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের সম্পর্কে শীতলবস্থা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে ‘অনানুষ্ঠানিক’ বৈঠকে উভয়পক্ষের নেতারা মিলিত হলেও বিষয়টি নিয়ে আশানুরূপ অবস্থায় পৌঁছাতে পারছেন না তারা। উপরন্তু, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র অন্তত চার জন সদস্যের সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রশ্নে দ্বিমত অবস্থান ব্যক্ত করায় রূপরেখার যৌথ ঘোষণার বিষয়টি পিছিয়ে যেতে পারে। গত কয়েক দিনে বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এ বিষয়গুলো উঠে আসে।

গণতন্ত্র মঞ্চের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনের যৌথ রূপরেখার ঘোষণা নিয়ে বিএনপি ইতোমধ্যে দুই দফা ইউটার্ন নিয়েছে। প্রথম দফায় উভয়পক্ষের লিয়াজোঁ কমিটি মিলে ‘সরকার ও শাসন ব্যবস্থা বদলের লক্ষ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের সাত দফা’ চূড়ান্ত করা হয়। এরপর গত ১৩ এপ্রিল বিএনপির পক্ষ থেকে আকস্মিকভাবে ২৭ দফাকে কেন্দ্র করে যৌথ ঘোষণার প্রস্তাব আনা হয়। এরপর দ্বিতীয় খসড়ার কাজ শুরু করেন মঞ্চের নেতারা।

গত ৮ মে রাতে মঞ্চের তরফে দ্বিতীয়বারের মতো ৩৫ দফা সংবলিত যৌথ ঘোষণাপত্র দেওয়া হয়। সেই দফা নিয়ে আলোচনা উঠতেই বিএনপির সিনিয়র তিন-চার জন নেতা বেঁকে বসেন। বিশেষ করে সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রশ্নে তারা বিভিন্ন বিষয় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে তুলে ধরেন।

বিএনপিতে আবারও লেফট উইং- রাইট উইং দ্বন্দ্ব

গণতন্ত্র মঞ্চের একাধিক শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জানান, মঞ্চের পক্ষ থেকে দুই বার খসড়া প্রস্তাব দেওয়ার পর বিএনপির পক্ষ থেকে একটি কাঠামো তৈরি করার কথা ছিল। এরইমধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে সে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে, দলের ডানপন্থি অংশের নেতারা কোনোভাবেই সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রশ্নে ৩৫ দফার সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করছেন না।

গণতন্ত্র মঞ্চের একজন নেতা দাবি করেন, পরপর দুই বার বিএনপির পক্ষ থেকে আশানুরূপ কোনও অবস্থান ব্যক্ত না করায় বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা মঞ্চের একাধিক নেতার কাছে বিলম্বিত হওয়ার ব্যাপারটিকে ‘দুঃখজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

সিনিয়র কয়েকজন নেতার বিরোধিতা নিয়ে মঞ্চের দুইজন নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দুই লিয়াজোঁ কমিটির সাত দফা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দেখতেও চাননি। এমনকি ওই খসড়া রূপরেখা যেন কম সংখ্যক দফার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে— সে বিষয়টি স্বয়ং ‘তারেক রহমানকে উদ্ধৃত’ করে বলা হয়েছিল। আদতে দেখা গেলো, সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনের লক্ষ্যে বেশ কিছু উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন বিএনপির সিনিয়র কয়েকজন নেতা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক সাইফুল হক বলেন, ‘এখনও কেন হচ্ছে না— তার কারণ আমি নিশ্চিত না। বিএনপির মধ্যে কী ভাবনা আছে, তাও আমি নিশ্চিত না। যদিও আমরা অনেক কালক্ষেপণ করেছি। মানুষের প্রত্যাশা ছিল— যৌথ ঘোষণাপত্র অনেক আগেই তৈরি হবে। ইতোমধ্যে আমরা বলেছি— কমিটমেন্ট ছিল মার্চে, পরে এপ্রিলে দেওয়ার, এখন মে মাসও শেষ হচ্ছে। যৌথ ঘোষণাপত্র হচ্ছে আমাদের সরকারবিরোধী আন্দোলনের ভিত্তি।’

সাইফুল হকের ভাষ্য, ‘যৌথ ঘোষণাপত্র হচ্ছে রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তি। যেটা সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করবে, যেখানে মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা হবে। দেশে ফ্যাসিবাদী শক্তির যেন আর উত্থান না হয়, সেদিকটি বিবেচনায় রেখে যৌথ ঘোষণা কর্মসূচি আকারে তৈরি করার জন্য মানুষের সামনে কমিটমেন্ট আছে।’

বিএনপি ও মঞ্চের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, বিএনপিতে আবারও ‘রাইট উইং’ ও ‘লেফট উইং’ বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে প্রকটভাবে। রাইট উইং বা ডানপন্থি অংশের নেতাদের সংখ্যা কম হলেও তারা প্রভাবশালী। দ্বিতীয়ত, সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে লক্ষ্যে শুরু থেকে বিএনপির যে দুয়েকজন নেতার ভূমিকা ছিল বেশি—তাদেরকে ক্রমান্বয়ে সে প্রক্রিয়া থেকে কৌশলে সরিয়ে রাখার চেষ্টা অব্যাহত আছে।

গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম একজন নেতার ভাষ্য, ‘সমস্যার জায়গাটা খুবই অভ্যন্তরীণ। বিএনপিতে কারা কমান্ডে থাকবে, কারা লিড দেবে— সেই সমস্যা আবারও সামনে এসেছে।  ফলে, এই সমস্যার সমাধান করতে হলে তারেক রহমানকে সরাসরি ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি উদ্যোগ না দিলে যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্রের উদ্যোগও থমকে যেতে পারে’— বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন এই নেতা।

মঞ্চের আরেক নেতা বলেন, ‘বিএনপি যৌথ রূপরেখার ঘোষণাপত্র নিয়ে পাবলিকলি কমিটমেন্ট করেছে। তারা এটা থেকে দূরে সরে গেলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিএনপি। গণতন্ত্র মঞ্চও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্বাস ভঙ্গ হবে, তারা রাজনৈতিকভাবে আইসোলোটেড হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন নেতার দাবি, কেবল বিএনপির মধ্যেই সমস্যা নয়, গণতন্ত্র মঞ্চের একজন সিনিয়র নেতাও ঘোষণাপত্র নিয়ে উৎসাহ না দেখানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।

যৌথ ঘোষণাপত্র কি আলোর মুখ দেখবে?

বিএনপির নির্ভরযোগ্য একজন দায়িত্বশীল উল্লেখ করেন, ‘গণতন্ত্র মঞ্চ আন্তরিকভাবে রাষ্ট্রের সংস্কার চায়। তারা ৯০ দশকে তিন জোটের রূপরেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করেছেন। বিগত ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে মনোনয়ন প্রদানের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। সে কারণে গণতন্ত্র মঞ্চ শুরু থেকেই বিএনপিকে জানিয়েছে— সরকারবিরোধী আন্দোলনের যৌথ রূপরেখা যেন সব বিরোধী দলকে একসঙ্গে নিয়ে ঘোষণা করা হয়।’

রবিবার (২১ মে) সন্ধ্যায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যৌথ ঘোষণাপত্রের কাজ চলমান আছে। বিএনপি একটি বড় দল, সে হিসেবে নেতাদের মধ্যে বিরোধিতা থাকা বাস্তবসম্মত। আশা করা যায়, আগামী স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টির সমাধান আসবে।’

জানতে চাইলে গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘আমরা কাজ করছি। আশা রাখি, অচিরেই সব দল, বিরোধী জোটগুলোর পক্ষ থেকে যৌথ ঘোষণাপত্র আসবে।’

বিএনপির প্রভাবশালী একজন দায়িত্বশীল মনে করেন, ‘যৌথ ঘোষণাপত্র অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েনি। নিশ্চিতভাবেই আলোর মুখ দেখবে। তবে, বিষয়টি আটকে আছে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের বোঝাপড়ার জায়গায়। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নিজের হিসাব-নিকাশ ও নেতাদের পারস্পরিক বোঝাপড়া ঠিক নেই, বলে বিলম্বিত হচ্ছে।’

এ বিষয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক সাইফুল হক বলেন, ‘আমি আশাবাদী হতে চাই। ড্রাফট কমিটি, লিয়াজোঁ কমিটিসহ সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আমাদের যেভাবে আলোচনা হয়েছে, তাতে মনে করি অতিদ্রুত তারা তাদের দিক থেকে প্রস্তাব তৈরি করবেন।’

‘এরপর সব বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা সম্পন্ন করে জনগণের সামনে ঘোষণাপত্র হাজির করবে। এতে করে আন্দোলন নতুন মাত্রায় গতি পাবে। মানুষের মধ্যে আশা তৈরি হবে, রাজনৈতিক ভিত্তি আরও স্পষ্ট হবে। আমরা তো কেবল সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন করছি না— আমরা চাই গোটা রাষ্ট্র, সংবিধানের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন।’  উল্লেখ করেন সাইফুল হক।

প্রসঙ্গত, যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে জানতে চেয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ফোন করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন:

বিএনপিতে অনুশোচনা, আন্দোলনের সময় নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব

বিএনপির ইউটার্ন: যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে বিরোধ, ক্ষুব্ধ যুগপৎ-সঙ্গীরা