প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলার ঘটনা ছিল পরিকল্পিত: কায়সার কামাল

বিএনপির সমাবেশ পণ্ড করতে সরকারদলীয় অঙ্গ সংগঠনের নেতারা পরিকল্পিতভাবে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা করেন বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

সোমবার (৩০ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের দক্ষিণ হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। ‘রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বসহ সারা দেশের বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ আটক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের’ দাবিতে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

কায়সার কামাল বলেন, ‘সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আপনারা (সাংবাদিকরা) সবাই অবগত আছেন। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনা করা বাংলাদেশের সংবিধানসিদ্ধ একটি মৌলিক অধিকার। কোনও সংগঠনে যোগদান ও রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনও একজন নাগরিকের স্বেচ্ছাধীন বিষয়। এ রূপ অধিকার পালনে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের কোনও বাহিনীর বাধা দান, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের, অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করার অধিকার নেই। অথচ বর্তমান অবৈধ সরকার তার ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে দেশের সর্ববৃহৎ ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূলের অপচেষ্টায় লিপ্ত।’

তিনি বলেন, ‘নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশ অনুষ্ঠানের কর্মসূচি দিল। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে ঢাকায় সভা-সমাবেশের ক্ষেত্রে ডিএমপি কমিশনারের অনুমতির আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবু সমাবেশের বিষয়টি বিএনপির পক্ষ থেকে ডিএমপি কমিশনারকে বেশ আগেই লিখিতভাবে জানানো হয়। কিন্তু অতীতের মতো এই সমাবেশ বানচালের লক্ষ্যে ক্ষমতাসীন দল পুলিশকে ব্যবহার করে তথাকথিত অনুমোদনের নামে নানা ছলচাতুরী করতে থাকে।’

সমাবেশের আগের রাতে তথাকথিত ককটেল উদ্ধারের নাটক সাজানো হয় মন্তব্য করে কায়সার কামাল বলেন, ‘সমাবেশের এক সপ্তাহ আগে থেকে সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। দেওয়া হয় মিথ্যা মামলা। পথে পথে হয়রানি করা হয়। এমনকি সমাবেশের আগের রাতে তথাকথিত ককটেল উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে এবং বিভিন্ন পুরোনো মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে মহাসমাবেশের দিন ১ হাজার ২০০ জনের বেশি বিএনপি নেতাকর্মীকে কারাগারে পাঠানো হয়।’

লিখিত বক্তব্য তিনি বলেন, ‘শত বাধা, মামলা-হামলা উপেক্ষা করে লাখ লাখ জনতা বিএনপির মহাসমাবেশে যোগ দেন। এতে হতবিহ্বল হয়ে ক্ষমতাসীন দল সেই পুরোনো খেলায় মেতে উঠে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে বানচালের জন্য পুলিশ ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগ কাকরাইল মোড়ে বিএনপির সমাবেশে আসা নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমন করে। একইসঙ্গে সরকারের আজ্ঞাবহ পুলিশ বাহিনী সরকারি দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে গুলিবর্ষণ, সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ, টিয়ার শেল নিক্ষেপ করতে করতে নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশ বানচালে লিপ্ত হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে যোগ হয় আওয়ামী লীগের পাল্টা সমাবেশে লগি-বৈঠা নিয়ে আসা আওয়ামী ক্যাডাররা। তাদের আক্রমণে যুবদল নেতা শামিম মোল্লা নিহত হন। একজন পুলিশ কনস্টেবলও নিহত হন। পুলিশের টিয়ার শেলে গুরুতর আহত সিনিয়র সাংবাদিক রফিক ভূঁইয়া পরদিন মৃত্যুবরণ করেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু সাংবাদিক গুরুতর আহত হন।’

বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক বলেন, ‘শুধু ২৮ অক্টোবরের ঘটনা নিয়ে ডিএমপির অধিভুক্ত বিভিন্ন থানায় ২৮টি মামলা হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। পুলিশ কনস্টেবল মো. আমিরুল হক নিহত হওয়ার ঘটনায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ১৬৪ জনের নাম উল্লেখ করে সহস্রাধিক অজ্ঞাত বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পল্টন থানায় হত্যা মামলা করেছে পুলিশ। অথচ যুবদল নেতা শামিম মোল্লা, সিনিয়র সাংবাদিক রফিক ভূঁইয়ার হত্যা নিয়ে কোনও মামলা হয়নি।’

ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে সার দেশের ১৭ জন আইনজীবীকে। অন্যান্য নেতাকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত। বিএনপি নেতাদের বাসায় না পেয়ে তাদের স্বজনদের ধরে আনা হয়েছে। তথাকথিত ক্রাইম জোন ঘোষণা করে বিএনপি অফিস বন্ধ করে রাখা হয়েছে, যাতে বিএনপি তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে।’

তিনি বলেন, ‘দায়ের করা মামলাগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পুলিশ কনস্টেবল মো. আমিরুল হক নিহত হওয়ার ঘটনায় পল্টন থানায় দায়ের করা মামলা থেকেই এর প্রমাণ মিলবে। এই মামলায় বিএনপির মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, অঙ্গ সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় নেতাসহ দেশের জেলা ও থানা পর্যায়ের ১৬৪ জন নেতাকে আসামি করা হয়েছে। এটা অবিশ্বাস্য যে, পুলিশ এই বিপুল সংখ্যক নেতাদের নাম, ঠিকানা, পিতা-মাতার নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেছে। পূর্ব প্রস্তুতি ও পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া এটা কখনোই সম্ভব না।’

বিএনপির মতো একটি জনপ্রিয় দলকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে প্রমাণের জন্য তথাকথিত সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডে সঙ্গে বিএনপির জাতীয় নেতা ও অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতাদের আসামি করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অসংখ্য নেতাকর্মীকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে, যাতে যে কাউকে এই সব মামলায় যখন-তখন গ্রেফতার করা যায়। প্রধান বিচারপতির বাসভবনে কথিত ভাঙচুরের ঘটনাটিও এই নাটকের অংশ, যেন বিএনপি নেতাকর্মীরা বিচার বিভাগ থেকে কোনও ন্যায় বিচার না পান। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। তা না হলে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে কথিত ভাঙচুরের ঘটনায় আমাদের দায়িত্বশীল পাঁচ জন সিনিয়র আইনজীবী সদস্যকে কেন আসামি করা হবে? আমরা এই নীলনকশা প্রণয়নকারীদের প্রতি ধিক্কার জানাই।’

তিনি যোগ করেন, ‘২৮ অক্টোবর পুলিশ আওয়ামী লীগের যৌথ হামলায় বিএনপির মহাসমাবেশ পণ্ড করার ঘটনাটি ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একের পর এক মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দায়ের, বিএনপি মহাসচিবসহ অন্যান্য নেতাকে গ্রেফতার, রিমান্ড গ্রহণ, বিএনপি অফিসকে তালাবদ্ধ করে রাখা– এ সবই বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করার নীল নকশার অংশ। যাতে বিএনপি এই অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে চলমান এক দফার আন্দোলন থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। আমরা বিশ্বাস করি, গণতন্ত্রের এই লড়াই অব্যাহত থাকবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সরকারি দল ও তাদের যথেচ্ছ ব্যবহৃত সরকারি বাহিনীর এমন অপতৎপরতার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। একইসঙ্গে তথাকথিত রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বসহ সারা দেশের বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ আটক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি ও দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।