সব হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে ৭ জানুয়ারির ভোট বর্জনে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। দলটি ‘সর্বজনীন ভোট বর্জনে’র আহ্বান জানিয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, ‘আমরা বলতে চাই, এই একদলীয় বাকশালী সরকারের সময় ফুরিয়ে এসেছে। তাই তাদের অন্যায় ও অবৈধ হুমকিকে পরোয়া করার আর কোনও কারণ নেই। সার্বজনীন ভোট বর্জনের মাধ্যমে চলমান আন্দোলনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও অংশগ্রহণ একদলীয় শাসনের কবল থেকে বাংলাদেশের মানুষ শিগগিরই মুক্তি পাবে এই প্রত্যাশা আমরা ব্যক্ত করছি।’
শুক্রবার (৫ জানুয়ারি) গুলশানে মঈন খানের বাসভবনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির আরও দুই সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
মঈন খান বলেন, ‘আমরা আজ গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রতি এই আহ্বান জানাবো, আপনারা এই জনপ্রিতিনিধিত্ববিহীন বর্তমান যে সরকার সেই সরকারের কোনও হুমকি-ধমকি অথবা তাদের কোনও ভয়-ভীতিতে চিন্তিত হবেন না। আপনারা সাহসিকতার সঙ্গে সেই সরকারের প্রদত্ত ভয়ভীতির মোকাবিলা করুন, যে বা যারা আপনাকে ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধ্য করতে চায় তাদের চিহ্নিত করুন।’
‘আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানাতে চাই— ভাতা কার্ড জব্দ করে কিংবা ভাতা বন্ধ করে কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধ্য করে কোনও অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত হবেন বা হচ্ছেন; ভবিষ্যতে তাদের আইনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে’, যোগ করেন বিএনপির এই নেতা।
তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন, আজ থেকে অল্প কয়েক মাস আগে এক উপনির্বাচনে ৫৩ সেকেন্ডে ৪৭টি ভুয়া ভোটের সিল মারা হয়েছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে আজ আমরা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করার হুমকি, ভাতা কার্ডধারী অসহায় মানুষের জীবনজীবিকাকে হুমকিতে ফেলা কিংবা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোস্টাল ভোট অথবা অন্য কোনও ভূমিকায় তাদের অবতীর্ণ করিয়ে নির্বাচনে প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এর প্রত্যেকটি আইনগত অপরাধ। বিশেষত যারা আমাদের দরিদ্র ট্যাক্সপেয়ারের যে অবদান সেই অবদান থেকে রাষ্ট্রীয় ভাতা ও বেতন পাচ্ছেন তারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র থেকে এই সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। এটা দল ও ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোনও অনুদান নয়। অতএব ভাতা কার্ডের বিনিময়ে বাংলাদেশের কোনও নাগরিককে ভোট দিতে বাধ্য করা সম্পূর্ণ বেআইনি।’
বিএনপির একটি উদারনৈতিক শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দল উল্লেখ করে আবদুল মঈন খান বলেন, ‘বিএনপিকে নিয়ে অনেক গল্প সরকার সাজিয়েছে, অনেক মিথ্যা ঘটনা তারা সৃষ্টি করে তার দায়-দায়িত্ব বিএনপির ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছে। আমরা জানি অতীতে হয়তো এমন একটি বিশ্ব পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল… আপনারা জানেন। আফগানিস্তানের একটি চিত্র ছিল, তখন হয়তো সরকারের এই সব গাল-গল্প অনেককে মিথ্যাভাবে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু আজকের পৃথিবী আলাদা। আজকে সরকার নতুন করে যদি সেই ২০১৪ এর ফর্মুলা অ্যাপ্লাই করে, বিএনপি এই শান্তিপূর্ণ উদারনৈতিক দলের কোনও মিথ্যা ভাবমূর্তি দেশে বা বিদেশে প্রচার করতে চায় বা চাইছে, কিন্তু তাদের সেই প্রচেষ্টা ইতিমধ্যে ব্যর্থ হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার ভাবছে ৭ জানুয়ারি তাদের জয়লাভের দিন। আমি বলবো, ৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের পরাজয়ের দিন। কারণ সেদিন তারা বাংলাদেশের নতুন করে অপমৃত্যু ঘটাবে।’
স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘এর আগেও ঘটেছে যে, আমাদের আন্দোলনকে বিপথগামী করার জন্য, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য সরকার নিজেই বেশ কিছু ঘটনা ঘটিয়ে তার দায় আমাদের ওপর চাপানো চেষ্টা করেছে। এখনও সেই অপচেষ্টা চলছে। আপনারা ক‘দিন আগে দেখেছেন যে, কেউ কিছু জানে না। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হলো যে— হাসপাতালগুলোতে একটা নির্দিষ্ট দিনে রেডি রাখার জন্য যাতে তারা চিকিৎসা করতে পারে। ঠিক ওইদিন একেবারে ঢাকা মহানগরীর ভেতরে বেশকিছু গাড়িতে আগুন ধরে গেলো এবং বেশ কিছু লোক সেখানে মারা গেলো। কোনও তদন্ত ছাড়াই সেদিন পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হলো যে— যারা অবরোধ করেছে, তারাই এটা করেছে। গোটা ব্যাপারটা একটা অপরাধের কথা, একটা অনুমান নির্ভর একটা কথা বলা… তারপরে সেই কাজটা ঘটানো এবং ঘটিয়ে তার দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানো। এটা এখন থেকে নয়, বহু বছর ধরে সরকার এই অপকৌশল চালিয়ে আসছে। তারা বিরোধী দলের আন্দোলনটাকে বিপথগামী করার জন্য অপকৌশল চালিয়ে যাচ্ছে।’
এসময় উপস্থিত স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘দেখুন হরতাল মানে কী? আমাদের প্রতিবাদ। আমাদের নেতা-কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে যতখানি সম্ভব তারা করবে। আজকেও খবরে কাগজে এসেছে, সহিংসতায় দুজন মারা গেছে… এটা প্রতিদিন ঘটছে। এখন ওদের (সরকার) একটা মাত্র লক্ষ্য আমাদের নেতা-কর্মীদের ওপর যেভাবে হোক দায় চাপানো। আমরা সেটা হতে দেবো না। আমরা জনগণের কাছে আবেদন জানিয়েছি, আপনারা হরতাল পালন করুন, এই নির্বাচন বর্জন করুন। সেজন্য আমাদের নেতা-কর্মীরা সেভাবে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করবে। উদ্দেশ্য আমাদের প্রতিবাদটা জাতির কাছে জানালাম, বিশ্বের কাছে জানালাম এবং জাতিও আজ এর প্রতিবাদ করছে।’
এছাড়াও ইতিমধ্যে ৭ জানুয়ারি ভোট বর্জনে শনিবার ভোর ৬টা থেকে ৪৮ ঘণ্টার হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো।