স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি

বিএনপি অপেক্ষায়, এগিয়ে জামায়াত, আ.লীগ নেতাদের অংশগ্রহণে ধোঁয়াশা

সম্ভাব্য রোডম্যাপ অনুযায়ী আগামী দুই-তিন মাস পর অনুষ্ঠিত হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। নির্দলীয় হলেও এ নির্বাচনে এক ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ আছে। কারণ এতে জয়-পরাজয়ের ওপর সরকার ও বিরোধী দলের প্রেস্টিজ ইস্যু জড়িত। তাই নিজ দলের প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে সব পক্ষই। স্থানীয় সরকারের চারটি স্তর—সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউপি নির্বাচন। এসব স্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এরই মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের অঘোষিত প্রচারণা শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একাধিক প্রার্থী সরব। যদিও তাদের প্রার্থিতা এখনও ঘোষণা করা হয়নি। তবে দলের অভ্যন্তর থেকে যোগ্য প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।

অপরদিকে জাতীয় নির্বাচনের পরপরই স্থানীয় নির্বাচনে দল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীদের নাম প্রকাশ করেছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত। উন্নয়ন ফোরামের নামে ইতোমধ্যে তারা প্রচারণাও শুরু করেছে। নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতারাও অংশগ্রহণ করতে পারেন বলে জানা গেছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যেও এমন আভাস মিলেছে।

অপরদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) বসে নেই। তারাও পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছে।

রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগের যেসব নেতার নামে মামলা আছে, তারা কীভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবেন। আবার যাদের নামে মামলা নেই, কিন্তু নির্বাচনে দাঁড়ালে তাদের মামলায় জড়ানো হয় কিনা? দেশের নির্বাচনের অতীত ইতিহাস সামনে রেখে এমন আলোচনাও সামনে এসেছে। নির্বাচনকে ঘিরে অতীতের মতো মামলা-হয়রানি যুক্ত হলে— সেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে, নাকি আইওয়াশে পরিণত হবে?

তফসিলের আগে প্রার্থী চূড়ান্ত করবে না বিএনপি

বিএনপির সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে প্রার্থী ঘোষণা করবে না দলটি। তবে আগামী দুই মাসের মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করবে দলের হাইকমান্ড। এক্ষেত্রে অতীতে দলের জন্য ত্যাগ ও গণমুখী নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে দলীয় অবস্থান থাকবে জিরো টলারেন্স। এ বিষয়ে দলের মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য করেছেন।

প্রার্থী ঘোষণার দৌড়ে এগিয়ে জামায়াত

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যেখানে অন্যান্য রাজনৈতিক দল প্রার্থিতা নিয়ে ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করেছে, সেখানে আগাম প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, এরই মধ্যে বেশিরভাগ সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে দলটি।

অনেকে ইতোমধ্যে নিজের ছবি সংবলিত ব্যানার-পোস্টার সাঁটিয়ে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন। উন্নয়ন ফোরামের নামে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র প্রার্থী হিসেবে গণসংযোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ড করছেন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে দলটি থেকে আলোচনায় আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র-ছাত্রী সংসদের ভিপি সাদিক কায়েম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়েও ব্যাপক প্রচারণা হচ্ছে।

এছাড়া চট্টগ্রাম সিটিতে মেয়র পদে চূড়ান্ত প্রার্থী দলটির মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর শামসুজ্জামান হেলালী।

আর সিলেট সিটিতে তিন জনের নাম কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পাঠিয়েছে স্থানীয় সংগঠন। তারা হলেন—সিলেট জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, সিলেট মহানগর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম এবং জেলা নায়েবে আমির মাওলানা লোকমান আহমদ।

দলীয় সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে তাদের বেশিরভাগ এলাকাতেই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের অধিকাংশ প্রার্থীই চূড়ান্ত। দল যাকে যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করছে, তাদের সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে প্রচারণাও শুরু করেছেন।

এনসিপিও বসে নেই

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারাও বিভিন্ন জায়গায় আগাম প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, উত্তরে যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলামের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন জায়গায় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নিয়ে ইসির ব্যাখ্যা

এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। এ বিধিমালা কার্যকর হলে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ যেকোনও দলের কর্মী সমর্থকরা অংশ নিতে পারবেন বলে জানা গেছে।

গত ১০ জুন এই বিধিমালা প্রণয়ন কমিটির সভাপতি ও নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘কোনও দল বাদ দেওয়ার মতো কোনও বিধান আচরণবিধিতে রাখা হয়নি। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য যে কেউ অংশ নিতে পারবেন।’’

এ বিষয়ে গত ১৫ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর কাছে বিএনপি বা সরকারের মনোভাব জানতে চান স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তবে এর কোনও সুস্পষ্ট বক্তব্য দেননি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ প্রশ্নের উত্তর তিনি পাশ কাটিয়ে যান।

কী হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন আওয়ামী লীগ নেতারা?

পাঁচই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকেই নিষিদ্ধ রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তারা অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় যে কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এমন বক্তব্যের পর আলোচনা হচ্ছে, তাহলে কি আওয়ামী লীগের পদবিধারী নেতারাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন? সে ক্ষেত্রে তো নারায়ণগঞ্জের সেলিমা হায়াত আইভীর মতো বহু প্রার্থী সামনে আসতে পারেন। তখন সরকার বিষয়টিকে কীভাবে দেখবে? তাদের স্বাভাবিকভাবে নির্বাচন করতে দেওয়া হবে নাকি, মামলার আসামি হিসেবে হয়রানির মুখে রাখা হবে? এ নিয়েও সুনির্দিষ্ট কোনও ব্যাখ্যা নেই।

জানতে চাইলে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় যে কেউ অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নিরপরাধ কেউ প্রার্থী হতে চাইলে তো না করা যাবে না। আর কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকার কথা নয়। কেউ যদি জনগণের কাছে ঘৃণিত হয়, সেটা ভোটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত হবে। কিন্তু প্রার্থী হিসেবে তার নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব ইসিকেই নিতে হবে। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন করতে হলে সব প্রার্থীকেই সমান নজরে দেখতে হবে।’’

এ বিষয়ে গত ৯ জুন সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি জানান, আওয়ামী লীগের নির্দোষ নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে রকম কোনও সমস্যা নেই। মানে কেউ যদি নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তিনি যদি আওয়ামী লীগেরও হন, কারণ এটা নির্দলীয়। তার মতে, সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায়, প্রচারণার সময় আওয়ামী লীগের দলীয় বক্তব্য সামনে আনলেই শুধু সমস্যা হতে পারে।

ভালো নির্বাচন নাকি আইওয়াশ?

অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতাসীন দলগুলোর বিরুদ্ধে। তবে এবার নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুলও ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। বলেছেন, নির্বাচন হবে নিরপেক্ষ। দলের কাউকেই অন্যায় করার সুযোগ দেওয়া হবে না। ভোটের মাঠে আসলে সরকারের এমন অবস্থান ঠিক থাকে কিনা, এ নিয়েও এক ধরনের অনিশ্চয়তার কথা বলছেন কেউ কেউ। আবার ক্ষমতাসীন দলের নেতারা মনে করেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একটি ভালো নির্বাচন হোক, সেটা আমরা চাই। আওয়ামী লীগের কেউ প্রার্থী হতে চাইলে সরকার কীভাবে দেখবে, সেটাতো বলতে পারবো না। তবে আমরা মনে করি, গুরুতর  অপরাধী না হলে যে কেউ অংশগ্রহণ করতে পারে। প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।’’

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবশ্যই ভালো হবে। দলগতভাবে ইতোমধ্যে যোগ্য প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটি।’’ তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাদের অবস্থান কী হবে, সেটি ইসিই ভালো বলতে পারবে।’’