বিএনপিতে হাইব্রিড কারা, কীভাবে দলে ঢুকছেন তারা 

বরিশালে সাংগঠনিক সভায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলে অনুপ্রবেশকারী ও হাইব্রিডদের ঠেকানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। নেতাকর্মীদের তিনি বলেন, ‘‘গত ১৭ বছর নির্যাতন, গুম, হত্যা ও মামলার মধ্যেও তৃণমূল নেতাকর্মীরা দলকে টিকিয়ে রেখেছেন। সেই ত্যাগের মূল্যায়ন করেই দলকে এগিয়ে নেওয়া হবে। কোনোভাবেই হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশকারীদের বিএনপিতে জায়গা দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে।’’ রাষ্ট্র ক্ষমতার পাঁচ মাসের মাথায় সরকারপ্রধানের মুখ থেকে এ ধরনের বক্তব্যকে স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরকার গঠনের পর সব সময় এক ধরনের সুবিধাবাদী শ্রেণির উত্থান ঘটে। তখন তারা ক্ষমতাসীন দলে ভেড়ার চেষ্টা করেন। তখন তাদের অপকর্মের দায়ভার সরকারকেই নিতে হয়। প্রধানমন্ত্রী হয়তো সেই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে নেতাকর্মীদের সতর্ক করতেই এমনটি বলে থাকতে পারেন।

এ বিষয়ে লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে তো এ ধরনের ধারা প্রচলিত আছে। তবে দেশে সুশাসন নিশ্চিত হলে এমনটি হওয়ার কথা নয়। এ বিষয়গুলোতে সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের আরও সতর্কতা দরকার। বিশেষ করে টেন্ডার বণ্টনসহ সরকারি বরাদ্দ নিয়ম অনুযায়ী করলে এমনটি হওয়ার কথা নয়। কারণ অনৈতিক সুবিধা লাভের জন্যই একশ্রেণির লোক ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেন। আবার স্বার্থ ফুরালে কেটে পড়েন। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয় বিবেচনা করে এমন নির্দেশনা দিয়ে থাকতে পারেন।’’

আগের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না, বাড়ছে নবাগতদের সংখ্যা

নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন দলের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী দলটিতে যোগ দিয়েছেন। অথচ নির্বাচনের আগেও এ নিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে দলটির হাইকমান্ড। ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর গুলশানের দলীয় কার্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচন সামনে রেখে দলে যোগদানের হিড়িক পড়েছে।’’ এরপরই দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে নতুন করে কাউকে দলে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

তবে নির্বাচনের পর সে নিয়মে যেন ভাটা পড়েছে। দলে নবাগতদের যোগদানের হার দিন দিন বাড়ছে। রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রামে এনসিপি ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে সম্প্রতি সবচেয়ে বড় যোগদানের ঘটনা ঘটেছে গোপালগঞ্জে। গত ৩ জুন জেলার সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের ১২০০ নেতাকর্মী গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবরের হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির এক নেতা জানান, কতিপয় অসাধু নেতা নিজেদের অনৈতিক কার্যক্রমকে শক্তিশালী করার জন্য বহিরাগতদের নিয়ে দল ভারী করছেন—যা ভবিষ্যতে দলের জন্য বোঝা হতে পারে।

সরকারপ্রধানের এমন সতর্কতার কারণ কী?

রাজনৈতিক নেতারা মনে করেন, কতিপয় সুবিধাবাদী ব্যক্তি সব সরকারের সময়ই নিজেদের ক্ষমতার কাছাকাছি দেখতে অভ্যস্ত। তাদের কাছে দলীয় আদর্শ বলে কিছু নেই। তাই কতিপয় সহযোগী নিয়ে তারা ক্ষমতাসীন দলে যোগদান করেন। তাদের লক্ষ্য থাকে সরকারি পরিত্যক্ত জায়গা, জলমহাল ও বালুমহাল দখলসহ টেন্ডার বাগিয়ে নেওয়া। তাদের দাপটের সঙ্গে অনেক সময় মূল নেতাকর্মীরা পেরে উঠতে পারেন না। তবে এটাও ঠিক, কতিপয় সিনিয়র নেতাই ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করার জন্যই এমনটি করে থাকেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘যারাই ক্ষমতায় আসেন, তাদের নেতাকর্মীদের মূল লক্ষ্যই থাকে দলের নাম ভাঙিয়ে সরকারি সুবিধা আদায় করে নেওয়া। তখন নিজেদের মধ্যেও স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে। এতে নিজ দলের প্রতিপক্ষকে মোকাবিলায় তারা ভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের এনে নিজের শক্তিমত্তা জাহির করেন। যেহেতু দীর্ঘদিন পর বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, সেহেতু দলটির নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের আচরণ অস্বাভাবিক নয়। সে দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রীর এমন সতর্কতা ও নির্দেশনার অবশ্যই প্রাসঙ্গিকতা আছে।’’

প্রধানমন্ত্রী আসলে কাদের হাইব্রিড বলছেন, কী ব্যাখ্যা বিএনপির?

দলের অভ্যন্তরে হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সতর্কতা নিয়ে বিএনপিতেও আলোচনা হচ্ছে। দলটির নেতাদের দৃষ্টিতে মূলত স্বার্থান্বেষীরাই সব সময় ক্ষমতাসীন দলে আসতে চায়। তখন তারা অপকর্ম করলে তার দায়ভার পড়ে দলের ওপর। বিএনপিতে এমন ধারা চললে দল অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই অনুপ্রবেশকারীরা দলে কোনও স্থান পাবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখা হবে। দলটির হাইকমান্ড মনে করে, এই অনুপ্রবেশকারীরাই দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, বিশৃঙ্খলা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল সৃষ্টির চেষ্টা করছে, যা সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর। তাই প্রধানমন্ত্রীর সতর্কতাকে অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

এ বিষয়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘দল ক্ষমতায় থাকলে তো অসাধু চক্রের আবির্ভাব ঘটে। তখন নতুন করে দলে যোগদানকারীদের হার বাড়তে থাকে। প্রধানমন্ত্রী মূলত তাদেরকেই হাইব্রিড হিসেবে বিবেচনা করেছেন। বিশেষ করে বিগত দিনে নির্যাতিত বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর যাতে অনুপ্রবেশকারীরা কর্তৃত্ব খাটাতে না পারে, সে বিষয়ে ইঙ্গিত করেছেন তিনি। এটি অবশ্যই বিএনপিকে আমলে নিতে হবে।’’

জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সরকার গঠনের আগে ও পরে বিএনপি হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা জানিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী আবারও আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—যা দলের জন্য সতর্কবার্তা। আশা করি সারা দেশের নেতাকর্মীরাই বিষয়টি আমলে নেবেন।’’