প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হলেও কেন নয়াপল্টন ছাড়েননি রিজভী

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নিবেদিতপ্রাণ সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। বয়স ৭০ ছুঁই ছুঁই। ছাত্রজীবনে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের মধ্য দিয়ে ছাত্র রাজনীতি শুরু হলেও ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন বিএনপি ও জিয়া পরিবারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন একজন।

ছাত্র রাজনীতির শুরু থেকে এ পর্যন্ত দলের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে অসংখ্যবার জেল জুলুমের শিকার হয়েছেন তিনি। যৌবনের সোনালি সময়টুকুও বিসর্জন দিয়েছেন দলের জন্য। দুঃসময়ে নয়াপল্টনে দল ও দলের নেতাকর্মীদের পাশে একাই ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। দলের সুসময়ে অবশ্য তার সঠিক মূল্যায়নও পেয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হওয়ার পরও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে নয়াপল্টনের দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগের মতোই ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। এ নিয়ে কেউ কেউ অবশ্য হাস্যরস করে বলছেন, ‘‘নয়াপল্টনের রিজভী এখনও নয়াপল্টনে।’’ আবার অনেকে বলছেন, ‘‘নয়াপল্টনের মায়া ছাড়তে পারছেন না রিজভী।’’

বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন।

তিনি বলেন, ‘‘রুহুল কবির রিজভী ভাই একজন সংগ্রামী নেতা। দলের দুঃসময়ের কাণ্ডারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। তাই নয়াপল্টন কার্যালয়টি তার কাছে এক ধরনের ভালোবাসার জায়গায়। বিগত সরকারের সব রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেও কার্যালয় ছাড়েননি। ঠিক দলের সুসময়েও পল্টন কার্যালয়কে ভোলেননি। এক ধরনের আত্মিক সম্পর্কের কারণেই এখনও যাতায়াত করছেন।’’

বিএনপি কার্যালয়ে রিজভীর ৭৮৭ দিন বসবাস

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত একটানা ৭৮৭ দিন বিএনপির কার্যালয় নয়াপল্টনে একাই অবস্থান করেছিলেন অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। সে সময় বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাই গ্রেফতার হন। ওই বছর থেকেই রিজভী দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান করতে থাকেন।

দীর্ঘ ৭৮৭ দিন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বসবাসের বিষয়ে রিজভী বলেন, ‘‘আমি ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে কার্যালয়ে অবস্থান করছি। বিভিন্ন পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার একটা শঙ্কা দেখা দিচ্ছিল। ওই মুহূর্তে আমি অবস্থান নিয়েছিলাম। এরপর ম্যাডামকে জেলে নেওয়া হলো। তখন পার্টি অফিসের নিচ থেকে নেতাকর্মীদেরও ধরে নিয়ে যেতো। এভাবে চলছিল।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমি ব্রত নিয়েছিলাম, নেতাকর্মীরা অফিসে এসে কাউকে পাবে না, এ কথা যেন না বলে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার জন্যই থেকেছি। ম্যাডাম জেল থেকে বেরিয়েছেন। তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাসায় যাবো।’’

শেষবার রিজভীর নেতৃত্বে তালা ভেঙে কার্যালয়ে ঢুকেছে বিএনপি

২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশে পুলিশের সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরপর সমাবেশ পণ্ড হলে ওইদিন বিকাল থেকেই দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয় পুলিশ। ২৯ অক্টোবর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট বিএনপি কার্যালয়ের তিন দিকে ‘‘ডু নট ক্রস: ক্রাইম সিন” ফিতা টানিয়ে দিয়ে আলামত সংগ্রহ করে। এরপর থেকে সেখানে পুলিশের পাহারা বসে। যদিও পরবর্তীকালে তালা ঝোলানোর বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়।

দীর্ঘ আড়াই মাস পর রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি সেই তালা ভেঙে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশ করেন নেতাকর্মীরা। সেদিনের ঘটনা স্মরণ করে ছাত্রদলের এক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দীর্ঘ সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা ঝুললেও কেউ সেটা ভাঙার সাহস করেনি। রিজভী ভাইয়ের নির্দেশনায় সেদিন তালা ভেঙে আমরা অফিসে প্রবেশ করি। আমার কাছে সেটা কেবল প্রতীকী তালা ছিল। আসলে আমরা সেদিন ফ্যাসিস্ট হাসিনার শিকল ভেঙে দেশবাসীকে বিজয়ের বার্তা দিয়েছি।

জলাবদ্ধতা উপেক্ষা করে নয়াপল্টনে রিজভী

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বাদ যায়নি নয়াপল্টনসহ আশপাশের এলাকাও। এমনকি বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচেও ঢুকেছিল পানি। সেই পানি উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বন্যা পরিস্থিতিসহ সমসাময়িক বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন রুহুল কবির রিজভী। তার আগের দিন সড়কে জমা থাকা পানি মাড়িয়ে রিকশায় করে বাসায় ফেরেন তিনি।

রিজভীর দলীয় কর্মকাণ্ড এবং নয়াপল্টনে অবস্থানের বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘রাজনীতি করতে গিয়ে বারবার যেমন উনি কারাবরণ করেছেন, তেমনিই দলের দুঃসময়ে জীবনের কঠিনতম সময়গুলোও তিনি নয়াপল্টনে কাটিয়েছেন। এখনও দলের কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়মিত নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেন। দলের প্রতি তার যে ত্যাগ ও ভালোবাসা, তা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।’’