প্রথম সারির নেতৃত্বের অবসান

জামায়াত এখন কোন পথে এগোবে?

জামায়াতের প্রথম সারির নেতৃত্বের অবসানমতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বের শীর্ষস্থান শূন্য হয়ে গেল। প্রথম সারির চার নেতার ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় বর্তমান নেতৃত্ব পুরোদস্তুর নতুন ও ভারপ্রাপ্তে পরিণত হলো। আদালতের আদেশে নির্বাচন কমিশনের স্থগিতাদেশ ওঠার আগ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্ব দিয়েই চলতে হবে জামায়াতকে।

এ পরিস্থিতিতে নেতা-কর্মীরা দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আগামী দিনের কর্মসূচি সম্পর্কে অনেকটাই অন্ধকারে। সুস্পষ্ট কোনও গন্তব্য তাদের সামনে নেই। দলের আগামী দিনের নেতৃত্ব কোন পন্থায় নির্ধারিত হবে, দলের ভবিষ্যৎ কী হবে এ নিয়েও রয়েছে নানান প্রশ্ন। আত্মগোপনে থাকায় এসব বিষয়ে দলটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য জানা যায়নি।

জামায়াতের সুহৃদ, কর্মী-সমর্থক ও তৃণমূল পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হলেও নেতৃত্বের সংকট জামায়াতে নেই। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত আমির ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের মাধ্যমে দল চলছে। নতুন করে গঠিত হয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ। নতুন সদস্য যুক্ত করা হয়েছে কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায়ও। এর বাইরে নতুন নির্বাচিত নেতৃত্ব ও নতুন নামের বিষয়টি পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে দলটির ভবিষ্যৎ।

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা জামায়াত সেক্রেটারি প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, মাওলানা নিজামীর ফাঁসি হলেও নেতৃত্বে কোনও সমস্যা হবে না। যেহেতু জামায়াতের নেতৃত্ব মেনে চলার বিধান রয়েছে এবং এটি মানা অপরিহার্য, সে কারণে নেতৃত্বে যিনিই থাকুন, সবাই তার কথা মেনে চলবে।

আরও পড়ুন: নিজামীর ফাঁসিতে পাকিস্তানের কান্না

কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী এক নেতার সহচর, পল্টন শাখা জামায়াতের কর্মী মো. ওবায়েদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের আড়ালে রাজনৈতিকভাবে জামায়াত নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে। তারা ইসলামের তরে শহীদ হচ্ছেন। শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের অনুপ্রাণিত করবে। তাদের মৃত্যুতে জামায়াত বিচলিত নয়।

নিজামীর ছোট ছেলে মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত নাদিম তালহা ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, জীবিত আমিরে জামায়াতের চেয়ে শহীদ আমিরে জামায়াত অনেক বেশি শক্তিশালী।

গণমাধ্যমে এক বিবৃতিতে দলটির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী জামায়াতের আমির হওয়ায় সরকার তাকে ফাঁসি দিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে নেতৃত্বশূন্য করতে চায়।

জানা যায়, জামায়াতের নায়েবে আমিরদের মধ্যে অধ্যাপক একে এম নাজির আহমাদ মারা গেছেন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দি অবস্থায় মারা যান নায়েবে আমির মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসূফ। মৃত্যু দণ্ডাদেশ পেয়েছেন সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আবদুস সোবহান।

আরও পড়ুন: মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে অনড় শেখ হাসিনা

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লার। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম ও মীর কাসেম আলী কারাবন্দি। বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। এর বাইরে সিনিয়র নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হয়েছেন। আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার সম্প্রতি মুক্তি পেলেও আত্মগোপনে রয়েছেন।

ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা মনির আহমাদ বলেন, নতুন নাম বা নির্বাচিত নেতৃত্বের বিষয়টি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কিছু জানা যায়নি।

এদিকে, মানবতাবিরোধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হওয়া সময়ের ব্যাপার বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বুধবার সচিবালয়ে নিজ দফতরে এক ব্রিফিংয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত নেতাদের বিচার হয়েছে এবং হচ্ছে। ওই রায়েই যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতাবিরোধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচারের কথা বলা হয়েছে। এখন পর্যায়ক্রমে এ প্রক্রিয়া শুরু হবে।

কুমিল্লা জেলার অন্তর্ভূক্ত জামায়াত সমর্থিত এক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম মনে করেন, মাওলানা নিজামীর ফাঁসিতে জামায়াত একজন প্রবীণ নেতা হারালেও দলের নেতৃত্বে প্রভাব পড়বে না।

তবে দ্বিমত রয়েছে সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ছেলে হাসান ইকবালের। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, জামায়াত একটি ব্যুরোক্রেটিক সংগঠন। দলে যারা বেশি অভিজ্ঞ, বেশি শিক্ষিত তারা চলে যাচ্ছেন, কিন্তু এক্ষেত্রে যারা নতুন আসবেন, তাদের অভিজ্ঞতা সাবেক নেতাদের চেয়ে কম।

বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের সেক্রেটারি ড. খলিলুর রহমানের ভাষ্য, কী হবে আর। জামায়াত একটি সংঘবদ্ধ সাংগঠনিক রাজনৈতিক দল। তারা নেতৃত্বশূন্য হবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তাদের কার্যক্রম ঠিক হয়ে হবে।নিষিদ্ধ হলে হয়তো নতুন নাম নিয়ে সামনে আসবে। এ নিয়ে আমি এখনও কিছু জানি না।

সিলেট দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, জামায়াতে নেতৃত্বশূন্যতা নেই। ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ ও সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান আছেন। নতুন নেতৃত্ব এখনই হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে জামায়াতের সহকারী প্রচার সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, কর্মপরিষদ সদস্য ডা. রিদওয়ানুল্লাহ শাহেদীসহ অন্তত কেন্দ্রীয় ৫ নেতাকে ফোন করা হলে তাদের সেল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন: নিজামীর ফাঁসির ‘টাইমিং’ ও ভারতের ভূমিকা

/এসটিএস/এমএসএম