জামায়াত আসলে কী চায়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, তার দল ক্ষমতায় গেলে শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি নেবে না, প্রয়োজনে রিকশায় চলাফেরা করবেন। এমনকি সরকারি প্লট কিংবা ফ্ল্যাট না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারই দলের একজন এমপি সংসদে সরকারি আবাসনে ব্যবহারের জন্য পর্দা, ওয়াশিং মেশিন আর মাইক্রোওয়েভ ওভেন চাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, সংসদের মতো এত জায়গায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে আলোচনা না করে ব্যবহার্য জিনিসপত্র চাওয়া কতটুকু যৌক্তিক। দলের এই বিপরীতধর্মী অবস্থানের কারণে অনেকের মনে প্রশ্ন, জামায়াত আসলে কী চায়?

বুধবার (১৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায়, ‘সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটে পর্দা, ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২) মো. মিজানুর রহমান।

নিজের বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে এসে মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা বাজেটের ওপর কথা বলছি। সম্পূরক বাজেটও এই মহান জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। মাননীয় স্পিকার, মাননীয় সংসদ সদস্যরা অনেক টাকার সম্পূরক বাজেটও পাস করেছেন। কিন্তু এই সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোয়, থাকার জন্য যেটা দেওয়া হয়েছে, তার দরজা–জানালার পর্দাটি এখন পর্যন্ত ঝোলানো হয়নি।’

স্পিকারকে উদ্দেশ করে মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা শুনেছিলাম যে আমাদের এই ফ্ল্যাটগুলোয় একটি করে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেনও দেওয়া হবে। এই পর্দা, মাইক্রোওভেন ও ওয়াশিং মেশিনগুলো আপনার মাধ্যমে পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।’

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যের এমন চাওয়ার বিষয়ে সংসদে সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি বলেন, যেখানে আবার বলা হয় যে, আমরা গাড়ি নেবো না, প্লট নেবো না— আমার কাছে মনে হয় যে, আসলেই যদি গাড়ি আর প্লট যখন তারা বাদ দিলো তখন ওনাদের বুকের ওপরে কত বড় পাথর চাপা দিয়ে বাদ দিতে হলো যে, মাইক্রোওয়েভ আর ওয়াশিং মেশিনের জন্য এই পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে যে, এই স্ট্যান্ডার্ড আর স্ট্রাচার আমাদেরকে মেনটেইন করা উচিত।”   

দোষের কিছু দেখছে না জামায়াত

জামায়াত এমপির পর্দা-মাইক্রোওভেন ও ওয়াশিং মেশিন চাওয়া দোষের কিছু না বলে মনে করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার মতে, সৎভাবে জীবন-যাপন সবাই করতে পারে না। জামায়াতের নেতারা আল্লাহ রাসূলের দেখানো পথেই সৎভাবে জীবন-যাপনের চেষ্টা করেন।

গোলাম পরওয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্লট-শুল্কমুক্ত গাড়ি নিয়ে যে কথাগুলো বলা হয়েছিল, সেগুলো ছিল একজন সংসদ সদস্যের সরকার থেকে পাওয়া ব্যক্তিগত সুবিধা। জামায়াতের কোনও সংসদ সদস্য এসব সুযোগ সুবিধা না নেওয়ার বিষয়ে এখনও একমত। অন্যদিকে জামায়াতের সংসদ সদস্য যে বিষয়গুলোর কথা সংসদে বলেছেন, সেগুলো কেবল এমপি থাকাকালীন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এটা তো আর ব্যক্তি সুবিধার জন্য না।

তিনি বলেন, ‘‘সংসদ সদস্যদের জন্য নির্মিত ওই সব হোস্টেলে থাকতে হলে চেয়ার-টেবিল লাইটের সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের প্রয়োজন হওয়াটা স্বাভাবিক। আমি নিজেও তো আগে সংসদ সদস্য ছিলাম। তখনও এ বিষয়গুলো ছিল। এখন এই বিষয়গুলো চাওয়াটা তো দোষের কিছু না।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘একদল আছে, যারা এসব বিষয় তুলনা করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের কাজই সমালোচনা করা। কথায় আছে না, যাকে দেখতে না পারি, তার চলন বাঁকা। এখন জামায়াতের বেলায়ও একই অবস্থা।’’

রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নাকি সুবিধাবাদী 

রাজনীতিবিদরা বলছেন, ভোটের জন্য জামায়াত রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। কারণ তাদের কথা এবং কাজের কোনও মিল নেই এবং তারা একটি সুবিধাবাদী দল।

জামায়াত এমপির পর্দা-মাইক্রোওভেন ও ওয়াশিং মেশিন চাওয়ার বিষয়টিকে নিচু মানসিকতার সঙ্গে তুলনা করেছেন ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘এগুলো খুবই নিচু মনের চিন্তা। এটা আসলে লজ্জার বিষয়। একজন সংসদ সদস্য জনগণের কথা না বলে সংসদে চুলা পর্যন্ত চাওয়া লাগবে!’’

তিনি বলেন, ‘‘জামায়াতের কথা আর কাজে যে অমিল, তা অনেক আগেই প্রমাণিত হয়েছে। জামায়াত আমির নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, সরকারি কোনও সুযোগ-সুবিধা নেবেন না। অথচ বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার পর তিনি সরকারি বাসায় উঠে সব রকমের সুযোগ সুবিধা নিচ্ছেন। এটা তো আসলে জনগণের সাথে প্রতারণা। নির্বাচনের আগে ভোট পেতে নানান রকমের কথা দিয়ে কোনও কথাই রাখেননি।’’

‘জামায়াত আমিরের প্লট-ফ্ল্যাট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি নিতে না চাওয়া ছিল কেবল নির্বাচনে জয়লাভের ট্রিকস’, বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেল। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘জামায়াত একটা সুবিধাবাদী দল। নিজেদের স্বার্থের জন্য তারা সবকিছু করতে পারে। মুক্তিযুদ্ধে যখন এদেশের মানুষ নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিল, তখনও তারা পাকিস্তানিদের সঙ্গে আঁতাত করেছিল কেবল নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের পথ খোঁজে।’’

সংসদের গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক

সংসদের অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় নিজেদের স্বার্থে ব্যয় করা একেবারেই অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, ‘‘দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক যে অবস্থা, ৩-৪ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। এরমধ্যে এক কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে। সেখানে সংসদে দাঁড়িয়ে সংসদ সদস্যদের এমন প্রত্যাশা বা আশা আকাঙ্ক্ষা একেবারেই অযৌক্তিক।’’

তিনি বলেন, ‘‘জামায়াতের কথা কাজের অসঙ্গতি স্পষ্ট। তাদের মধ্যে ক্ষমতার মোহ দেখা দিয়েছে। নির্বাচনের আগে জামায়াতের অবস্থান, আর এখনকার অবস্থান একেবারেই বিপরীত। সংসদ সদস্য জিনিসটা একটা অলাভজনক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা দরকার।’’ এটাকে অনেকে অর্থবিত্ত বাড়িয়ে তোলার মাধ্যম হিসেবে দেখছে বলেও মনে করেন এই রাজনীতিবিদ।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) রিপোর্ট অনুসারে, ১১তম সংসদের প্রথম ২২ অধিবেশনের (জানুয়ারি ২০১৯ থেকে এপ্রিল ২০২৩ পর্যন্ত) পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংসদীয় কার্যক্রমে প্রতি মিনিটে ব্যয় হয় গড়ে ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। দশম সংসদ (২০১৪-১৮) চলাকালে খরচ হতো প্রতি মিনিটে প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এই খরচে সংসদ সদস্যদের পারিশ্রমিক, কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, বিল-ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য পরিচালন‌ ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘‘সংসদে প্রতিদিন কথা বলতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ এরা জনগণের স্বার্থ বাদ দিয়ে নিজেদের স্বার্থ খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি আগেও বলেছি, সংসদ কোনও গালগল্প কিংবা ব্যক্তি স্বার্থ খুঁজে বেড়ানোর জায়গা নয়। এটা জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করার জায়গা। এখানে কেবল জনগণের সুখ-দুঃখ এবং দেশ চালানোর বিষয়ে কথা বলা উচিত।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘জামায়াতের কাজই হচ্ছে জনগণকে মিথ্যে প্রলোভন দেখানো। যারা নিজেদের লাভের জন্য দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের বিরোধিতা করে তারা সংসদে এমন কথাবার্তা বলবে, এটাই স্বাভাবিক। বিরোধীদল হিসেবে তারা কতটা ভূমিকা পালন করছে, তা জনগণ দেখছে।’’