সাতক্ষীরার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত ও বিতর্কিত একটি নাম গাজী নজরুল ইসলাম। তার রাজনৈতিক জীবনে এসেছে নানা মোড়। তরুণ বয়সে তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সশস্ত্র শাখা গণবাহিনীর সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর ও কালীগঞ্জের একাংশ) আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। তবে সম্প্রতি এক তরুণীর সঙ্গে তার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নৈতিক স্খলনের অভিযোগে তিনি আবারও আলোচনায় আসেন। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে।
এরইমধ্যে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমকে পৃথক চিঠি দিয়েছে জামায়াত। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার স্পিকারকে দেওয়া চিঠিতে বলেছেন, গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে পরিচালিত সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, গত ২২ জুলাই জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি তার অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দাখিল করা হলো।
চিঠির অনুলিপি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
এরপর থেকেই তার রাজনৈতিক উত্থান, অতীত কর্মকাণ্ড এবং বছরের পর বছর ধরে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে নতুন করে জনমনে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গণবাহিনী থেকে জামায়াতে
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে গাজী নজরুল ইসলাম জাসদের সশস্ত্র শাখা গণবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে সময় তিনি শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী নৌ পুলিশ ফাঁড়ি থেকে অস্ত্র লুট এবং ১৯৭৪ সালে মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের হরিনগর গ্রামে এক পুলিশ সদস্য হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে তিনি গণবাহিনী ছেড়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি দলটির প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠেন এবং সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রেখেছিলেন।
শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্য সোলায়মান কবির অভিযোগ করেন, গাজী নজরুল ইসলাম এমপি থাকাকালে ভূমি দখল, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
গাজী নজরুল ইসলাম আশাশুনি ও শ্যামনগর এলাকার বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করেন বলেও অভিযোগ করেন বিএনপির এই নেতা। তার ভাষ্য, সাবেক এই এমপির ছেলে শ্যামনগরের আটুলিয়া ইউনিয়নে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বালু উত্তোলন করছেন, যা ওই এলাকার বন্যা ও অন্যান্য পরিবেশগত দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কবির আরও দাবি করেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে গাজী নজরুল ইসলাম এমপি থাকাকালে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম হয়েছে। এ ছাড়া, দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৭ সালে যৌথ বাহিনী তাকে গ্রেফতার করেছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে, গাজী নজরুল ইসলাম নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিলেও, স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারি গেজেটে তার নাম নেই বলে জানা গেছে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি।
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, গাজী নজরুল ইসলাম নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করলেও তিনি প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি।
তার ভাষ্য, সাতক্ষীরার কোনো মুক্তিযোদ্ধাই তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সাক্ষ্য দিতে পারেননি।
সম্প্রতি তরুণীর সঙ্গে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর শ্যামনগরে স্থানীয় বাসিন্দারা গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। মিছিলটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে উপজেলা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশে গিয়ে শেষ হয়।
বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতে গাজী নজরুল ইসলামের ছবি ও প্রতীকী ঝাঁটা ছিল। তারা ‘ছি ছি নজরুল, লজ্জায় বাঁচি না’, ‘হই হই রই রই, বট বাহিনী গেলি কই?’ এবং ‘শ্যামনগরে হবে না, বট বাহিনীর ঠিকানা’—এমন স্লোগান দেন।
বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আসা অংশগ্রহণকারীরা বলেন, তাকে ভোট দিয়ে তারা প্রতারিত হয়েছেন। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
সুন্দরবন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ বলেন, তিনবারের সাবেক একজন সংসদ সদস্যকে ঘিরে এমন ঘটনা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার বাইরে।
মানবাধিকারকর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শ্যামনগর উপজেলা ও সাতক্ষীরা জেলা পর্যায়ের জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তারাও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।