সংসদে কি গুরুত্ব হারাচ্ছে বিরোধী দল 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিরোধী দলে থাকলেও শুরুর দিকে বিএনপির সাবেক মিত্র হিসেবে সংসদে তাদের আলাদা গুরুত্ব ছিল। বিরোধীদলীয় নেতা কোনও প্রস্তাব দিলে তা বিবেচনা করতো ট্রেজারি বেঞ্চ। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই সম্পর্কে এখন কিছুটা চিড় ধরেছে কিনা, এমন আলোচনা হচ্ছে। কারণ এখন যেকোনও ইস্যুতে কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, আসলে যেকোনও সংসদেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে প্রথম প্রথম একটু উদারতা দেখা যায়। ধীরে ধীরে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ থেকে তাদের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। বর্তমান সংসদের ক্ষেত্রেও এমন চিত্র ফুটে উঠেছে। সংসদ থেকে বিরোধীদলীয় সদস্যদের একাধিকবার ওয়াক আউটের ঘটনাও এর অন্যতম দৃষ্টান্ত।

বিশেষ করে সংসদীয় ৫০টি স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলকে একটিতেও ছাড় না দেওয়া, জ্বালানি সংকট ইস্যুতে বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার আহ্বানে ক্ষমতাসীন দলের সাড়া না দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণেই এই প্রশ্ন সামনে আসছে যে তাহলে কি সংসদে গুরুত্ব হারাচ্ছে প্রধান বিরোধী দল? বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিক ও বিশ্লেষকরা একেকজন একেক কথা বলছেন। কারও মতে, এখনকার বিরোধী দল তো সংসদ ও রাজপথ দুই জায়গায়ই সরব। এক্ষেত্রে সংসদীয় স্থায়ী কমটির বণ্টন নিয়ে যে সমস্যার কথা বলা হচ্ছে, সেটিও স্বাভাবিক বিষয়। কারণ জুলাই সনদ কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত এমনটিই হওয়ার কথা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজনীতি বিশ্লেষক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিরোধী দল গুরুত্ব হারাচ্ছে বলে মনে হয় না।কারণ তারা তো সংসদের ভেতরে-বাইরে সক্রিয়। আর সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে তাদের না রাখার বিষয়ে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, এটার ভিন্ন ব্যাখ্যাও আছে। জুলাই সনদ কার্যকর হলেই শুধু তারা সভাপতির পদ পেতে পারে। সেক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে আবার শর্ত দেওয়া হয়েছে—বিরোধী দল এ ধরনের সুবিধা পেতে হলে অবশ্যই সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দিতে হবে। যেহেতু সরকারি দল সংবিধান সংস্কারের দাবিতে অনড় এবং সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল নাম দেয়নি—তাই সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে ছাড় দেওয়া হয়নি।’’

সাইফুল হকের মতে, এটি বিএনপির একটি রাজনৈতিক কৌশল। তিনি বলেন, ‘‘বিরোধী দল সামনে সংসদে কতটা গুরুত্ব পাবে, সেটা তাদের ভূমিকা থেকেই স্পষ্ট হবে।’’

গুরুত্ব হারাচ্ছে বিরোধী দল?

আইন প্রণয়ন, বাজেট তদারকি এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাছাড়া সংসদের দৈনন্দিন কাজের চাপ সামলাতেও এ কমিটিকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এতে সরকার-বিরোধী দলের সদস্যরা যুক্ত থাকায় যেকোনও বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়।

তবে সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর সংসদে একে একে ১০টি স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে তোলেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। সেগুলো সংসদে পাস হয়। কিন্তু এর কোনোটিরই সভাপতি পদে  বিরোধী দলের স্থান হয়নি।

একপর্যায়ে বিরোধীদলীয় সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াকআউট করেন। এর আগেও এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বিতর্ক হয়। সংসদের ৩৯টি স্থায়ী কমিটি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত এবং ১১টি সংসদ-সংক্রান্ত। এখন পর্যন্ত ২৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদে ৫০টি কমিটির মধ্যে বিরোধী দল তাদের আসন সংখ্যা অনুপাতে ১০টিসহ মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কথা। তবে তারা এখন পর্যন্ত শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ পেয়েছে।

একই অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, ‘‘ক্ষমতাসীনদের আচরণের কারণে বিরোধী দলের সংসদে থাকার আগ্রহ কমে যাচ্ছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘ক্ষমতাসীন দল শতভাগ সভাপতি পদ নেবে, এই সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারে না। এটা সংবিধানে নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছা যদি সংসদের সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, এটাই স্বৈরাচার।’’

একই কথা বলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার স্বৈরতন্ত্র কায়েম করছে। সংসদীয় কমিটিতে একচেটিয়া নিজেদের লোক বসিয়ে এটি তারা প্রমাণ করেছে। এর বাইরেও তারা বিরোধী দলকে নানাভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। তারা তাদের খেয়াল খুশিমতো সব কিছু করছে।’’ তার মতে, বিরোধী দল গুরুত্ব হারাচ্ছে না। বরং সরকারের পক্ষ থেকে এমনটি চলতে থাকলে বিরোধী দল সংসদের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। এতে সংসদ কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্নও সামনে আসছে।’’

এক্ষেত্রে বিরোধী দলের করণীয় কী জানতে চাইলে তুষার বলেন, ‘‘সংসদ ও রাজপথে যতটুকু স্পেস আছে, ততটুকুই কাজে লাগাবেন তারা।’’

গুরুত্ব পায়নি বিরোধীদলীয় নেতার চিঠি?

দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ১৪ আগস্ট জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার অনুরোধ জানিয়ে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে চিঠি দিয়েছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি এর অনুলিপি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সচিবালয়কেও দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সাড়া পায়নি বিরোধী দল।

এ বিষয়ে সংসদে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বিরোধীদলীয় এমপিরা। অবশ্য ক্ষমতাসীনরা বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। তাদের মতে, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই এই বিষয়টি নিয়ে তারা স্বাভাবিক অধিবেশনেই আলোচনা করার পক্ষে মত দেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিরোধীদলীয় নেতা সংকট উপলব্ধি করেই এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। গত এপ্রিলেও সমস্যা সমাধান হয়েছে সরকার ও বিরোধী দলের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করায়, তখন সুফল মিলেছে। সে কারণেও সদিচ্ছা থেকে এ চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা একলা চলো নীতির কারণে এটি আমলে নেয়নি।’’ 

ক্ষমতাসীনদের অবস্থান

সংসদীয় কমিটি নিয়ে বিরোধী দলের অসন্তোষ এবং কমিটির শীর্ষ পদে না রাখায় সংসদে তাদের গুরুত্ব কমছে কিনা, এ নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর ১০টি সংসদীয় কমিটি গঠনের দিন বিরোধী দলের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘বিরোধী দলের সদস্যদের আসনের অনুপাতিক হারে সভাপতি দেওয়া যাবে না, এটা কোথাও নেই। আবার দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই। অতীতের ইতিহাসেও নেই। আর বিরোধী দলকে ১০টি সভাপতি দেওয়ার বিষয়েও আানুষ্ঠানিক কোনও আলোচনা হয়নি।’’

তিনি বলেন, ‘‘জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিএনপি সেখানে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতি আসনের সংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলকে দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ বিষয়ে আমরা এখনও অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে, সংবিধান সংশোধিত হলে—তারপর কমিটিগুলো তখন পুনর্গঠন করা হবে। আনুপাতিক হারে বিরোধী দল সভাপতি পাবে।’’

তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী দল কোনও সহযোগিতা করছে না। এটা সাংঘর্ষিক। তিনি আরও বলেন, ‘‘যদি সংবিধান সংশোধনীর জায়গায় সংস্কার বলতে তাদের আরাম লাগে, তাহলে তা-ই বলুক। কিন্তু সংশোধনী হিসেবে সংসদীয় ভাষায় এখানে অ্যামেন্ডমেন্টটা গৃহীত হতে হবে।’’ তিনি অহেতুক সমালোচনা না করে বিরোধী দলকে গঠনমূলক দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানান।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলকে শীর্ষ পদ না দেওয়া এবং জ্বালানি ইস্যুতে বিরোধীদলীয় নেতার চিঠি গুরুত্ব না পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব বণ্টনের একটি নীতিমালা আছে। সেখানে তাদের সভাপতি পদে দিতেই হবে—এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তারপরও বিএনপি যেহেতু জুলাই সনদে সই করেছে, সেহেতু এর ধারা কার্যকর হলে অবশ্যই বিরোধী দল সভাপতি পদ পেতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দিতে হবে। এখন তারা যদি নিজেদের অবস্থানে অটল থাকে, তাহলে তো সরকারের কিছু করার নেই।’’ আর জ্বালানি সংকট নিয়ে বিশেষ অধিবেশনের আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার চিঠির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘এ বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। তাই সরকার আলাদা করে অধিবেশন ডাকার প্রয়োজন অনুভব করেনি।’’ বিরোধী দল গুরুত্ব হারাচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নে সেলিমা রহমান বলেন, ‘‘এ ধারণা মোটেই সঠিক নয়।’’