মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আসলে জামায়াতের অবস্থান কী?

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দলটির প্রথম সারির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তবে একাত্তরে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে দলটি।

জামায়াতের নেতারা বিভিন্ন সময় দাবি করেছেন, রাজনৈতিকভাবে তারা তখন পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে কোনো ধরনের ফৌজদারি অপরাধ বা গণহত্যার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল না।

সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন অবস্থানের কথা জোরালোভাবে জানিয়েছেন জামায়াতের মহিলা শাখার সভানেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নিসা সিদ্দিকা। তিনি বলেন, ‘একাত্তর সালে জামায়াত কোনও যুদ্ধ করেনি এবং যুদ্ধাপরাধও করেনি। যেটা চাপানো হচ্ছে, সেটা সম্পূর্ণ জুলুম।’

তার এই বক্তব্যের পর মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলটির নেতাদের বক্তব্য, রাজনৈতিকভাবে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল না, কিন্তু কোনো অপরাধের সঙ্গেও যুক্ত ছিল না। বিপরীতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন দলের নেতারা বলছেন, একাত্তরে জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

জামায়াতের বক্তব্য কী

নুরুন্নিসা সিদ্দিকা বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তার বক্তব্যে অনড় থাকার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই একাত্তরে জামায়াত কোনও অপরাধে যুক্ত ছিল না। আমি নিজেই সাক্ষী।’

তার দাবি, রাজনৈতিক কারণে জামায়াত দেশ বিভক্তি চায়নি। কিন্তু কোনো মানুষ হত্যা বা অপরাধের সঙ্গে দলটির সম্পৃক্ততার অভিযোগ ভিত্তিহীন। একই সঙ্গে তিনি রাজাকার বাহিনীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের লোকজনের সম্পৃক্ততার দাবি করেন। তার ভাষ্য, রাজাকারদের ৯২ শতাংশ ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং ৮ শতাংশ সাধারণ মানুষ।

নুরুন্নিসা বলেন, একাত্তরে তার বয়স ছিল ১৩-১৪ বছর। তখন তিনি নিজের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ছিলেন। তার দাবি, তিনি দেখেছেন রাজাকারদের কেউ লুটপাট করেছে, আবার কেউ অত্যাচার থেকে সাধারণ মানুষকে উদ্ধার করেছে।

তার মতে, জামায়াত তখন যা ছিল, এখনও তাই। মুক্তিযুদ্ধের পরিস্থিতি ভারত তৈরি করেছিল বলেও তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য, ভারত যেমন হায়দরাবাদ ও কাশ্মিরকে নিজেদের কব্জায় নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল, তেমনি বাংলাদেশকেও করদ রাজ্যে নিতে চেয়েছিল। এর প্রধান বাধা ছিল জামায়াত।

দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলনও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘একাত্তরে আমাদের অবস্থান ছিল রাজনৈতিক। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনও প্রমাণ নেই।’

জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলামকে খালাস দেওয়ার রায়েও এ বিষয়ে আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তার দাবি, ভারতকে খুশি রাখতে শেখ হাসিনা নিরপরাধ নেতাদের ফাঁসি দিয়েছেন। তাই জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

জামায়াতের প্রয়াত সাবেক আমির গোলাম আযমও একাধিকবার বলেছিলেন, জামায়াত পাকিস্তান ভাঙতে চায়নি; এটি সত্য। তবে কোনো ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত ছিল না। মূলত ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ছিল বলে তিনি দাবি করেছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রাজনীতি বিশ্লেষক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা জামায়াত রাজনৈতিক বিবেচনায় করেছিল। তার দাবি, দলটির অনেকেই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তারা এখনও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিস্তানপন্থী রাজনীতি ধারণ করেন।

তিনি বলেন, ‘জামায়াতের একজন এমপির এই ধরনের কথাকে স্বাভাবিক কথা হিসেবে দেখছি।’

প্রিন্সের মতে, এসব বক্তব্যের জবাব দেওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে জামায়াত কীভাবে দেশে রাজনীতি করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে এগিয়ে আসা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

লেখক ও চিন্তাবিদ সলিমুল্লাহ খান বলেন, নুরুন্নিসা সিদ্দিকা কী বলেছেন, তিনি তা শোনেননি। তবে তিনি যদি এমন কথা বলে থাকেন, তাহলে জামায়াতের নেতাদের যে বিচার হয়েছে, তা কীসের ভিত্তিতে হয়েছে; সেটি বিশ্লেষণ করলেই দলটির ভূমিকা বোঝা যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘একাত্তরের সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণের চেষ্টা’

মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভূমিকার জন্য জামায়াত এখনও অনুতপ্ত নয়—এমন অভিযোগ রয়েছে দলটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের। তাদের দাবি, কখনও ভারতের ষড়যন্ত্র, আবার কখনও ধর্মীয় চেতনার যুক্তি তুলে ধরে জামায়াত একাত্তরে নিজেদের অবস্থানকে সঠিক হিসেবে তুলে ধরতে চায়।

গণসংহতি আন্দোলনের সাবেক প্রধান সমন্বয়কারী ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একাত্তরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই জামায়াত গণহত্যায় যুক্ত হয়েছিল। তাঁর দাবি, দলটি সহযোগী সংগঠন তৈরি করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছে এবং এর ‘জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ’ রয়েছে।

তিনি বলেন, দেশবাসী ধারণা করেছিল জনগণের নতুন অভিযাত্রায় জামায়াত প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখবে। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ডে নতুন রাজনীতির সঙ্গে তারা যাচ্ছে না বলেই মনে হয়েছে। একাত্তরের বিষয় অস্বীকারের মধ্য দিয়ে দলটি নিজেদের পরিচয় আবার সামনে এনেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাকির মতে, জামায়াত নিজেদের বিতর্কিত অধ্যায় মুছে ফেলতে চায়। তবে কেউ অস্বীকার করলেই যাপিত ইতিহাস ধামাচাপা দেওয়া যাবে না।

বিএনপির অবস্থান

একসময় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র হলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বরাবরই মতবিরোধ রয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তারা একসঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনেও তারা একসঙ্গে রাজপথে ছিল। 

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দল দুটির মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতেও জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার সমালোচনা করছেন দলটির নেতারা। সংসদের ভেতর ও বাইরেও এ বিষয়ে তারা জামায়াতের সমালোচনা করছেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জামায়াত একাত্তরে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। এটি সর্বজনস্বীকৃত। তারপরও দলটির নেতা-নেত্রীরা নিজেদের দায়মুক্ত করতে নানা মন্তব্য করেন বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘যা দেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবে মানতে চায় না। বরং তাদের প্রতি ঘৃণার পরিমাণ আরও বাড়ে।’ জামায়াত যতদিন মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করার চেষ্টা করবে, ততদিন জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে বলেও উল্লেখ করেন বিএনপির এই নেতা।

একাত্তরের অর্ধশতাব্দী পরও মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের অবস্থান বদলায়নি। দলটির নেতারা রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে থাকার কথা স্বীকার করলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সেই অবস্থানকে ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যা হিসেবে দেখছেন।