এর আগে গত ২৯ মে এক ইফতার অনুষ্ঠানে পরবর্তী নির্বাচনের পর মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও দেশের অগ্রগতির লক্ষ্যে আগামী ৫ বছরের জন্য একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন বি. চৌধুরী। ওই প্রস্তাবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘জাতীয় সরকার গঠিত হলে নির্বাচনের পরে দেশে কোনও সহিংসতা, আগুন জ্বালানো, অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচার হবে না।’
বিকল্প ধারার সভাপতির এই প্রস্তাবের পর ২ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)’র আলোচনায় সভায় বিষয়টি আরও আনুষ্ঠানিকতা পায়।
যুক্তফ্রন্ট সূত্র জানায়, বি চৌধুরীর জাতীয় সরকারের প্রস্তাব একান্ত ব্যক্তিগত। জোটে বিষয়টি নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। বরং বহুদিন আগে জেএসডি সভাপতি আসম রব এ বিষয়ে প্রথম মুখ খুলেছিলেন।
যুক্তফ্রন্টের শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমত জাতীয় সরকারের গঠনের প্রস্তাব নির্বাচনের পর। আর আগামী নির্বাচনে যেকোনও দলই যদি দেড় শতাধিক আসনে বিজয়ী হয়, তাহলে কেন জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষে থাকবে? নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এড়ানোর লক্ষ্যে যদি জাতীয় সরকার গঠন করা হয়, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতির কী হবে? এখন যে সারাদেশে মানুষ হত্যা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে—এসব কি খারাপ পরিস্থিতি নয় বলে প্রশ্ন রাখেন দুই নেতা।’
যুক্তফ্রন্টের আরেক নেতার মন্তব্য, ‘বর্তমান সমস্যার কথা না বলে হঠাৎ ন্যাশনাল সরকারের কথার মানে কী? কথা হতে পারে বিএনপির সঙ্গে। আপনি একরাম হত্যার বিচার না চেয়ে ন্যাশনাল সরকারের কথা বললেন। বিএনপিকে বলা যেতে পারে নির্বাচনে জিতে গেলে কোয়ালিশন সরকারের কথা। এটা করা সম্ভব।’
আরেকজন নেতা জানান, মাদকবিরোধী অভিযানে কক্সবাজারের একরাম হত্যার বিষয় নিয়ে যুক্তফ্রন্টে কোনও আলোচনা হয়নি। বরং কক্সবাজারে গিয়ে একরাম হত্যার বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও সেখানে একটি সমাবেশ করার প্রস্তাব রাখা হলেও সেটি যুক্তফ্রন্টে গৃহীত হয়নি।
যুক্তফ্রন্টের মুখপাত্র ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বি চৌধুরীর জাতীয় সরকারের প্রস্তাব তার নিজস্ব। এটি নিয়ে জোটে কোনও আলোচনা হয়নি। ফলে, জাতীয় সরকারের প্রস্তাব যুক্তফ্রন্টের নয়। এটি বি চৌধুরী নিজেও বলেছেন, তিনি প্রস্তাব রেখেছেন যুক্তফ্রন্টসহ সবার কাছেই।’
যুক্তফ্রন্টের ভেতরে বি চৌধুরীর জাতীয় সরকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বি চৌধুরীর পক্ষের বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, আগামী নির্বাচন-পরবর্তী অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য তারা জাতীয় সরকারের কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বন্ধে এরচেয়ে ভালো কোনও পথ নেই। বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীদের প্রধান অংশটি মনে করছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের পর ‘জাতীয় সরকারের ধারণা’ অভিনব ও গণতন্ত্রবিরোধী। এতে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনি ধারা ব্যাহত হবে বলে মনে করছেন তারা।
জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী ঘরানার বুদ্ধিজীবী ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এড়ানোর জন্য জাতীয় সরকার গঠিত হলে ভালো। এতে প্রায় ১০ হাজার মানুষের প্রাণ বেঁচে যাবে। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, সহিংসতা হবেই। আর এই থেকে মুক্তি পেতে ৫ বছরের জন্য জাতীয় সরকার পদ্ধতি ভালো।’
যদিও ভিন্নমত পোষণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ রকম কোনও চিন্তা আমাদের নেই। জাতীয় সরকার! কিসের জাতীয় সরকার? জাতীয় সরকার ব্যবস্থাকে পরিষ্কার করার জন্য নিজেদের আরও সুদৃঢ় অবস্থানে আসা উচিত। জাতীয় সরকারের মতো হালকা কথাবার্তা বলার সময় এখন?’
এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘জাতীয় সরকার মানে যাদের কোনও সমর্থন নেই, তাদের কয়েকজনকে নিয়ে জাতীয় সরকার, হ্যাঁ? ওসব কথা অর্থহীন। বি. চৌধুরী নিজের দলের দিকে তাকিয়ে দেখলেই তো পারেন, দলটাকে আরও সুদৃঢ় করুন তিনি। জাতীয় সরকার এভাবে হবে না, এখন কী জন্য জাতীয় সরকার?’ বলে প্রশ্ন করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
দেশের এমন অবস্থা হয়নি যে, জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে মন্তব্য করে এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আর মানুষ যদি মারা যায়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শক্তিশালী করুক, তাতে জাতীয় সরকার আসবে কেন?’
এ বিষয়ে যুক্তফ্রন্টের এক নেতার ভাষ্য, ‘দুটি বড় দল ভোটে নির্বাচিত হচ্ছে। এখন সরকার যেভাবে আগামী নির্বাচনকে ভণ্ডুল করতে তৎপর, তাতে বিএনপির সঙ্গে থাকা ছাড়া কোনও উপায় নেই। আর এমন যদি হয়, বিএনপি যদি ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষমতা দেখায়, তাহলে তো আমাদেরই তাদের পেছনে ঘুরতে হবে।’
এদিকে, বি চৌধুরীর প্রস্তাব নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করেনি বিএনপি।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা এখনও আলোচনা করিনি। এটা মহাসচিব আরও ভালো বলতে পারবেন। আমি জানি না।’ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্যাংককে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি। বি চৌধুরীকে ফোন করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানান।