আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে বৃহস্পতিবার (৭ জানুয়ারি) বিএনপি সঙ্গ ত্যাগ করায় ইসলামী ঐক্যজোট ধর্মভিত্তিক দলগুলোর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর নেতাদের মতে, দলটি সরকারের ষড়যন্ত্রের শিকার। তাদের বিএনপির সঙ্গত্যাগের সিদ্ধান্ত অপরিণামদর্শী। যদিও ইসলামী ঐক্যজোটের নেতারা সিদ্ধান্তে অটল। তারা আগামী দিনে একটি রাজনৈতিক জোট করারও চিন্তা করছেন। এদিকে, ইসলামী ঐক্যজোটের শরিক দল নেজামে ইসলাম পার্টির (নে.ই পার্টি) ভাগ্য এখনও অনিশ্চিত। দলটির চেয়ারম্যান আব্দুর রকিব খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে নতুন ইসলামী ঐক্যজোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ও বিএনপিত্যাগী ইসলামী ঐক্যজোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী। ২০ দলীয় জোট ত্যাগ ও নতুন দল গঠিত হলেও নেজামে ইসলাম পার্টির ভবিষ্যৎ কী হবে—এ নিয়ে সুস্পষ্ট কোনও বক্তব্য নেই এই দুই নেতার।
ধর্ম
ইসলামী ঐক্যজোট সরকারের পাতানো ফাঁদে পা দিয়েছে বলে মনে করেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইসলামী ঐক্যজোট ২০ দলীয় জোটে ছাড়ায় কোনও প্রভাব পড়বে না। তারা সরকারের প্ররোচণায় সুযোগ-সুবিধার আশায় জোট ছেড়েছে। ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী জোট ছাড়ার পক্ষে ছিলেন না।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ বলেন, তারা (ইসলামী ঐক্যজোট) ইসলামের স্বার্থে জোট ছেড়ে আসে তাহলে ভালো। তবে এমন যদি হয় সুবিধা, মূল্যায়ন পাওয়া নিয়ে বিরোধে বের হয়ে আসে তবে সেটি কোনও মূল্য নেই।
এ সব বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
মার্চে নির্ধারিত হবে ‘নে.ই. পার্টি’ ভাগ্য
ইসলামী ঐক্য জোটে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। যদিও নিবন্ধনের আগে চারটি ধর্মভিত্তিক দল নিয়ে গঠিত হয় ইসলামী ঐক্য জোট। দলগুলো হলো—(১) খেলাফতে ইসলামী, (২) নেজামে ইসলাম পার্টি, (৩) ফরায়েজি আন্দোলন ও (৪) ওলামা কমিটি।
জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে ইসলামী ঐক্য জোটে ত্যাগ করেছে ফরায়েজি আন্দোলন। ওলামা কমিটিও দীর্ঘ দিন ধরেই নিষ্ক্রিয়। বর্তমানে ইসলামী ঐক্য জোটে মধ্যে তৎপর রয়েছে খেলাফতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির।
নেজামে ইসলাম পার্টির চেয়ারম্যান হলেন অ্যাডভোকেট আব্দুর রকিব ও মহাসচিব মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী। একইসঙ্গে দুজনই ইসলামী ঐক্যজোটের নির্বাহী কমিটিতেও আছেন। মাওলানা লতিফ নেজামী নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ও অ্যাডভোকেট রকিব ভাইস চেয়ারম্যান।
বৃহস্পতিবার ইসলামী ঐক্যজোট আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি-জোটের সঙ্গ ত্যাগ মেনে নেননি অ্যাডভোকেট আব্দুর রকিব। যদিও ত্রি-বার্ষিক জাতীয় কনভেনশনে অ্যাডভোকেট আব্দুর রকিবের অনুপস্থিতিতে্ই তাকে ইসলামী ঐক্যজোটের ভাইস চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। এছাড়া, ত্রি-বার্ষিক জাতীয় কনভেনশনে আগে মঙ্গলবার লালবাগে মজলিশের শূরার বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন তিনি।
বৈঠক সূত্র জানায়, সেখানে অ্যাডভোকেট আব্দুর রকিব জোট ভাঙ্গা নিয়েও কোনও আপত্তি জানাননি। বৈঠকে অ্যাডভোকেট রকিব বৃহস্পতিবার জামায়াতে ইসলামীর নেতা নিজামীর রায়কে কেন্দ্র করে হরতাল ও সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করে ত্রি-বার্ষিক জাতীয় কনভেনশনের তারিখ পেছাতে প্রস্তাব করেন। এছাড়া বুধবার নেজামে ইসলাম পার্টির বৈঠকও ২০দলীয় জোট ছাড়ার সরাসরি ঘোষণা না দিয়ে একলা চলার কথা বলার প্রস্তাব করা হয়।
জানা গেছে, ইসলামী ঐক্যজোট আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি-জোটের সঙ্গ ত্যাগ কারার পর বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান সাংবাদিকদের জানান, নেজামে ইসলাম পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুর রকিব বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন। সেই সংবাদ সম্মেলনে রকিব নিজেকে ইসলামী ঐক্যজোটের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ঘোষণা করে ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে থাকার কথা জানান। এর ফলে ইসলামী ঐক্যজোটের ভাঙনের ইঙ্গিত থাকলেও পরিষ্কার হয়নি নেজামে ইসলাম পার্টির ভবিষৎ।
এ প্রসঙ্গে মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী বলেন, নেজামে ইসলাম পার্টির ভাঙেনি। আগামী মার্চে দলের কাউন্সিল রয়েছে। যদি কোনও পরিবর্তন আসে, তবে তা কাউন্সিলের মধ্য দিয়েই হবে। তবে এ বিষয়ে জানতে অ্যাডভোকেট আব্দুর রকিবের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ধর্মভিত্তিক দল নিয়ে ঐক্য করবে ইসলামী ঐক্যজোট
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (৭ জানুয়ারী) ইসলামী ঐক্যজোটের ত্রি-বার্ষিক জাতীয় কনভেনশনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ছেড়ে ইসলামী ঐক্য গড়ার কথা বলেন ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী।
ভোগবাদী রাজনীতি ত্যাগ করে সব দল এক হলেই ঐক্য সম্ভব বলে মনে করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ। তিনি বলেন, ইসলামি রাজনীতির জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ক্ষমতা আর সুবিধা পাওয়ার আশায় যারা থাকে তাদের নিয়ে ঐক্য হবে না। বরং এ সবের জন্য বারবরা ভাঙন ধরছে ধর্মভিত্তিক দলগুলোয়।
ইসলামী ঐক্যজোটের রাজনৈতিক এলায়েন্সকে গুজব বলে মন্তব্য করেন জমিয়তে উলোমায়ে ইসলামের নির্বাহী সভাপতি মুফতি ওয়াক্কাস। তিনি বলেন, রাজনৈতিক এলায়েন্স গুজব, এগুলো হবে না।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, তারা (ইসলামী ঐক্যজোট) এখন আলাদা হয়েছে তাই অন্যদেরও আলাদা করে ঐক্য করতে চাচ্ছে। কিন্তু তাদের মতো অন্যরা সরকারের পাতা ফাঁদে পা দেবে না।
ঐক্যের রূপরেখা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইসলামী ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,সব ইসলামী দল, আলেমরা ও ইসলামমনস্ক লোকদের সমন্বয়ে একটি সংগঠিত, সমন্বিত ইসলামী শক্তি গড়ে তোলা অপরিহার্য। এ বিষয়ে কনভেশনে আমি বলেছি। সামনের দিনগুলোয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্যে ধর্মভিত্তিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তিত্বসহ সর্বস্তরের ইসলামি শক্তির সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করব।
/সিএ/এসটিএস/এমএনএইচ/
/আপ-এএ/