প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ নিয়ে বিভিন্ন দলের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

জুলাই সনদ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। এতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মনে করে দলগুলো। বিশেষ করে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে এক ধরনের প্রতারণা বলে আখ্যায়িত করেছেন কেউ কেউ। আবার অনেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মওলানা মামুনুল হক বলেন, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে করার ঘোষণা দিয়ে এবং একই প্রশ্নের মধ্যে আলাদা আলাদা চারটি অংশ রেখে গণভোটকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে। এর মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতিও ঝুঁকিতে পড়েছে।

তিনি বলেন, দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট একত্রে অনুষ্ঠিত হলে জনগণের মনোযোগ বিভ্রান্ত হবে। গণভোটের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো মানুষ যথাযথভাবে বুঝে মত প্রকাশ করতে পারবে না। এতে গণভোটের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বিঘ্নিত হবে।

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকার যদি জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও স্বতন্ত্র গণভোটের গণদাবি পূরণ না করে—তবে সেটি হবে আমাদের জন্য হতাশাজনক এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আদর্শ ও স্বীকৃতিকে ঝুঁকিতে ফেলার দুঃখজনক পদক্ষেপ।

তিনি আরও বলেন, শীঘ্রই আমরা দলীয় ফোরাম ও আন্দোলনরত ৮ দলীয় জোটের বৈঠক করে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানাবো।

খেলাফত মজলিস

খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ বলেন, উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ বাস্তবায়ন আদেশ জারির সিদ্ধান্ত ইতিবাচক এবং জন অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশ। এটি জনগণের কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের প্রত্যাশা পূরণে একধাপ অগ্রগতি। একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের সিদ্ধান্তে জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন হয়নি। এ সিদ্ধান্ত যথার্থ নয়। কারণ এতে সনদ বাস্তবায়ন ঝুঁকিপূর্ণ হবে। একই দিনে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। 

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারবে কিনা সে প্রশ্নও রয়েছে। এতে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে আরও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তার মতে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক হলে গণভোট জাতীয় নির্বাচনের আগেই করা সম্ভব।

ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টি 

ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক সংসদ সদস্য এম এ আউয়াল বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একইদিনে গণভোট বাস্তবায়ন অনেক কঠিন। জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় এই কঠিন কাজ যেন সরকার শেষ করতে পারে সে জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে। 

আমরা মনে করি, একইদিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন, উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক ভোটের হিসেবে আসন নির্ধারণ অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য সমাধান। সার্বিক বিচারে এই ঘোষণাকে আমরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখি।

বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ

বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে সংকট থেকে উত্তরণে কোনও দিক নির্দেশনা নেই। এটি গত ২৮ অক্টোবর ঐকমত্য কমিশনে দেওয়া তার পক্ষপাতমূলক প্রস্তাবনার পুনরাবৃত্তি মাত্র। আর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একইদিনে করার যে প্রস্তাবনা দিয়েছেন তা শুধু অসাংবিধানিক নয়, অবাস্তবও বটে। কারণ, অনেকগুলো বিষয় নিয়ে হ্যাঁ-না ভোটের মাধ্যমে মতামত গ্রহণ করা একটি অবাস্তব প্রস্তাব। এর মধ্য দিয়ে ভোটারদের মতামত গ্রহণ করা অসম্ভব, যা এক ধরনের প্রতারণা।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গণভোটের প্রস্তাব ও উচ্চকক্ষের প্রস্তাবনাও অপ্রয়োজনীয়। এর মধ্যদিয়ে শুধু আর্থিক ব্যয় বাড়বে না, সরকার পরিচালনায় সংকট তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে। আর সংবিধান সংক্রান্ত যেকোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র অধিকার সার্বভৌম সংসদের।
সরকার চট্টগ্রামের পতেঙ্গার লালদিয়ায় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান এপিএম-এর সঙ্গে ৩০ বছরের জন্য লিজ দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা শুধু জাতীয় স্বার্থবিরোধী নয়, এই সরকারের এক্তিয়ার বহির্ভূত।

বিবৃতিতে তিনি অবিলম্বে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা এবং অবাধ ও ভোট সুষ্ঠু করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)র কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে নতুন কিছুই নেই। এতে জাতির আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনও ঘটেনি। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে যে কথা বলেছেন, তা ঐকমত্য কমিশনের দেওয়া প্রস্তাব ভিন্ন কিছু নয়। ভাষণে সনদ বাস্তবায়নে আদেশ, একই দিনে জাতীয় সংসদ ও গণভোটের যে কথা বলা হয়েছে, তাতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের পরিবর্তে অনৈক্য বেড়ে গিয়ে দেশ এক দীর্ঘমেয়াদি সংকটে নিপতিত হতে পারে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শপথ নিয়েছেন, সংবিধান মেনে চলা এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ করবেন বলে। আমাদের সংবিধানে আদেশ জারি বা গণভোটের কোনও বিধান নেই। রাষ্ট্রপতি শুধু অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে সংবিধান পরিপন্থি কাজ করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে গণভোট ও আদেশ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তাতে দলগুলোর নোট অব ডিসেন্টের উল্লেখ নেই। অথচ প্রধান উপদেষ্টা ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যে সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন তাতে নোট অব ডিসেন্ট উল্লেখ ছিল। কিন্তু আজ যে আদেশ ও যেভাবে গণভোটের কথা বলা হয়েছে, তাতে নোট অব ডিসেন্ট না রাখাটা ড. ইউনূসের নিজের সঙ্গে নিজের এবং রাজনৈতিক দল ও জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল। সরকার ও ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলের ওপর কোনও কিছু চাপিয়ে দিতে পারে না। ঐকমত্য কমিশনে যেসব বিষয়ে সব দল একমত হয়েছে সেগুলো নিয়েই হতে হবে জুলাই সনদ। আর সংবিধান সংশোধনের একমাত্র এখতিয়ার শুধু নির্বাচিত জাতীয় সংসদের। 

তিনি আরও বলেন, একটা সময় পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮০ দিন জাতীয় সংসদ দ্বৈত সত্তা নিয়ে চলবে। অর্থাৎ একইসঙ্গে সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করার যে কথা বলা হয়েছে, এটাও সংবিধান পরিপন্থি এবং এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনও ঐকমত্য হয়নি। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে গণভোট সম্পর্কে দেশবাসীর ধারণা খুবই খারাপ। তাই আমরা মনে করি উচ্চকক্ষ, গণভোট ইত্যাদি শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, দেশের অর্থের অপচয়ের একটা পদক্ষেপ মাত্র।

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, গোটা দেশ-জাতি আজ তাকিয়ে আছে সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে। ফলে আদেশ, গণভোট, উচ্চকক্ষ ইত্যাদি বিষয় বাদ দিয়ে দ্রত নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ও তফসিল ঘোষণার জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান রইলো।