নির্বাচনি মাঠ হোক আর যেকোনও প্রতিযোগিতা হোক—লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড শব্দবন্ধ খুবই উচ্চারিত হয়। কোনও পক্ষ নিজেদের সুযোগ-সুবিধা অন্যদের তুলনায় কম বোধ করলে, কারোর প্রতি পক্ষপাতিত্ব আছে বোধ করলে এই শব্দগুলো ব্যবহার করে। আসলে এর মানদণ্ড কী? কখন কোনও ফিল্ড লেভেল প্লেয়িং কিনা, সেটা কী দিয়ে নির্ধারিত হয়? এটা নির্ধারণ করেইবা কে? জামায়াত ইসলামীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বিচ্ছিন্নভাবে আসন্ন নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নেই বলার চেষ্টা করলেও প্রধান উপদেষ্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের জন্য সমান থাকবে। এটা নিয়ে তিনি কোনও সমস্যা দেখছেন না।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে নির্বাচনি প্রেক্ষাপটে এমন একটি পরিবেশকে বোঝায়—যেখানে সব রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটার সমান সুযোগ, অধিকার ও নিরাপত্তা পান। কোনও পক্ষকে বিশেষ সুবিধা বা বৈষম্য তৈরি না করে নির্বাচন যেন স্বাধীন, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক হয়।
নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন পর্যবেক্ষক, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের যে কয়েকটা প্রধান উপাদান পাওয়া গেছে, তার মধ্যে অন্যতম প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা। তারা বলছেন, যখন দলনিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, সব দলের জনসভা ও প্রচারণায় সমান নিরাপত্তা, প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ক্ষেত্রে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে, তখন মোটামুটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলা যেতে পারে।
এমনকি তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সমান প্রচারের কথাটাও বলেছেন। যেখানে সব দলের প্রচারণা ও বক্তব্য প্রচারে সমান সুযোগ পাবে, সাংবাদিকদের হয়রানি না করা, অবাধ কাভারেজ নিশ্চিত হবে এবং ভুয়া তথ্য বা প্রচারণার অপব্যবহার রোধে ব্যবস্থা থাকবে।
পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব যেন দৃশ্যমান না হয় ও সব দলের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ করা হয়, সে বিষয়েরও উল্লেখ করেন তারা।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ মানে সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ, ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, যাতে ভোটাররা স্বাধীনভাবে তাদের পছন্দ প্রকাশ করতে পারেন। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ, কার্টার সেন্টার প্রধান মানদণ্ড বলতে নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন নির্বাচন আইন, সব দলের জন্য সমান নিয়ম ও আইন প্রয়োগে পক্ষপাত না থাকাকে বুঝিয়ে থাকে। একইসঙ্গে আইন থাকলেও যদি বাস্তব প্রয়োগ অসম হয়, তাহলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই বলে ধরা হয়।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে করণীয় ও আদৌ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু হয় কিনা, প্রশ্নে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কারও প্রতি পক্ষপাত না করাটাকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলা হয়। নির্বাচন উত্তর, নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশন এমনকি গণমাধ্যমও পক্ষপাতদুষ্ট হলে এটা ব্যাহত হতে পারে। ফলে নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংস্থাগুলোকে এই সময়টাতে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, যাতে কোনও প্রার্থী নিজেকে বৈষম্যের শিকার না মনে করে ‘’
তিনি বলেন, ‘‘পারফেক্ট লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে হয়তো কিছু হয় না। আমরা সবসময়ই বলি— বড় ধরনের কোনও অভিযোগ তোলা যায়, এমন পরিস্থিতি হতে না দিলে সেটাকে সবার জন্য সমান সুযোগের জায়গা বলে মনে করা হয়।’’
রবিবার (১১ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইয়ার ইয়াবস। এরপরে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘‘প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের জন্য সমান থাকবে। এটা নিয়ে উনি কোনও সমস্যা দেখছেন না। তিনি বলেছেন, এটা তেমন কোনও সমস্যা হবে না। প্রেস সচিব বলেন, ‘‘আমরা মনে করি খুব ভালো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে এবং সবাই তাদের ইলেকশনের বিষয়ে যতগুলো অপরচুনিটি আছে, সবাই সেটাকে ইউজ করছেন এবং সবাই আইনসিদ্ধভাবে তাদের কাজগুলো করছেন। আমরা মনে করি, ছোট দল ও বড় দল—সবাই একটা সমান লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাচ্ছেন এবং সে অনুযায়ী তারা তাদের কাজগুলো করছেন। ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হচ্ছে এবং সেই সময় আপনারা দেখবেন, সবার জন্য এই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সমান।’’
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকার অভিযোগ কাদের
১০ জানুয়ারি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের চিফ ইলেকশন অবজারভার ইয়ার ইয়াবস নেতৃত্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ গণমাধ্যমে বলেন, “নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে আমাদের এখন পর্যন্ত আত্মবিশ্বাস নেই। একটি বিশেষ দলকে সুবিধা দিতে সিগন্যালিং করা হচ্ছে। এতে মানুষের কাছে ভিন্ন বার্তা যায়। বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলকে জানিয়েছি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে তারা নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করবেন।’’
এর ঠিক আগের দিন ৯ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির বৈঠক শেষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘‘আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বিদ্যমান নেই বলে বর্তমান পরিস্থিতিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব নয়।’’
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আক্ষরিক অর্থে দেওয়া যাবে না। আমরা মনে করি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করতে পেরেছি। আমাদের প্রায় ৩০০ ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটি কাজ করছে। আমরা বলেছি, কোনও অভিযোগ থাকলে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে দিতে পারেন, ইউএনও’র কাছে বা ডিসির কাছে অভিযোগ দিতে পারেন। তাদের ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার আছে। এমনকি আমাদের কাছেও যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেন, আমরা যার যার এলাকায় তদন্ত কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেবো। সেখানে আইনি পদ্ধতিতে উভয়পক্ষকে শোনা হবে। শুনে তিন দিনের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন প্রস্তুত হবে এবং সেই সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে নির্বাচন কমিশন।’’
আব্দুর রহমানেল মাছউদ আরও বলেন, ‘‘এখন তারা বলতেই পারেন এবং তাদের পলিটিক্যাল স্ট্যাটিসটিকস থেকে অভিযোগ করতেই পারেন। আমরা আমাদের মতো করে চেষ্টা করছি। এভরিথিং ইজ ওকে। ইসি কি মনে করছে যে এখন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আমরা বলেছি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এনশিওর করার জন্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া প্রত্যেক আসনভিত্তিক ইলেকটোরাল কমিটি আছে। তাদের কাছে অভিযোগ করুক। সেখানে যদি সমাধান না পেয়ে থাকে, আমাদের সেটা জানাক। এখন আমরা মনে করি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আলহামদুলিল্লাহ অনেকটা ভালো। জামায়াতে ইসলামীর জোট বলেন বা বিএনপির জোট বলেন, এ পর্যন্ত কিন্তু খুব বড় ধরনের কিছু (ব্যত্যয়) হয়েছে বলে আমরা মনে করি না।’’