জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে যে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, সেখানে কিছুতেই ‘হ্যাঁ’কে জিততে দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ‘দ্য ডেইলি স্টার কনফারেন্স হলে’ ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিনির্ধারণে আদিবাসী জনগণের প্রত্যাশা’ শীর্ষক জাতীয় পর্যায়ে গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম। আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি।
মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হ্যাঁ’, ‘না’ ভোট— এটা হলো অপ্রয়োজনীয়, প্রতারণাপূর্ণ। সেখানে কিছুতেই ‘হ্যাঁ’ ভোটকে জিততে দেওয়া হবে না। যারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে, তারা ইতোমধ্যে হেরে গেছে বলে উল্লেখ করেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
তিনি বলেন, তার প্রমাণ জনগণের ওপরে যদি ছেড়ে দিত, তারা বুঝে গেছে এটা “হ্যাঁ”–এর পক্ষে যাবে না। তার জন্য সরকারি টাকা খরচ করে প্রশাসনকে অর্ডার দিয়ে সবকিছু করা হচ্ছে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সব সময় বঞ্চিত করেছে। এর অন্যতম কারণ, তাদের কণ্ঠস্বর দুর্বল।
গণঅভ্যুত্থানের পর নয়া বন্দোবস্তের কথা বলা হলেও বাস্তবে সমাজের প্রতিটি স্তরে বৈষম্য এখনও বিরাজমান বলে উল্লেখ করে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি বলেন, দেশ পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল জনগণের কথায়, জনগণের ইচ্ছায়। সংস্কারের কথা বলে দেশকে পেছনে নেওয়ার জন্য স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি উঠেপড়ে লেগেছে।
বাসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, পৃথিবীতে বহু দেশ আছে যাদের জনসংখ্যা ৩০ লাখেরও কম । অন্যদিকে বাংলাদেশের আদিবাসীদের জনসংখ্যা ৩০ লাখের বেশি। নির্বাচনের সময় সাধারন জনগন সাধারনত ভয়ের মধ্য থাকে কারন ভোট প্রদান করার আগে বা পরে তারা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নিপীড়নের শিকার হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানেও অনেক দুর্বলতা রয়েছে। সেখানে আদিবাসীদের অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছে, সাধারণ জনগণের কথা উপেক্ষিত করা হয়েছে। আমি একজন নাগরিক। আমার নাগরিক সুরক্ষা প্রদানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র বারংবার প্রতারনা করে যাচ্ছে। আমি মনে করি আদিবাসীদের বঞ্চিত রেখে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব না।
গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান ও ঢাকা ১২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী তাসলিমা আখতার বলেন, বাংলাদেশ কিন্তু একক জাতির রাষ্ট্র না। তারপরও বাংলাদেশের সংবিধানে বাকি জাতিগোষ্ঠীর কথা বলা হয়নি। দেশের আদিবাসী জনসংখ্যা ৪০ লাখের বেশি অথচ সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম। তিনি বলেন স্বাধীনতার সময় থেকে ২৪-এর গণঅভ্যূত্থান পর্যন্ত সকল জাতিসত্তার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু সেই ইতিহাস কতটুকু সংরক্ষিত আছে? আজকে আদিবাসীদের অধিকারকে বারবার অস্বীকার করা হচ্ছে। যারা ক্ষমতায় যায় তারা আদিবাসীদের অধিকারের কথা ভুলে যায়। আগামীর সংসদে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব খুবই নগন্য বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনের পরবর্তীতেও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। বাংলদেশের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে বুঝা যায় দেশের আদিবাসী জনগণ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে। রাষ্ট্র তাদের নাগরিক সুরক্ষা দিতে পারে নি। অন্যদিকে পার্বত্য চুক্তিকে বাতিল করার জন্য উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাহাড়ে সামরিক নীতি প্রয়োগ করে সেখানকার আদিবাসীদের ওপর দমন-পীড়ন করা হচ্ছে। এছাড়াও সমতলের আদিবাসীদের উপরও বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী কর্তৃক দমন-পীড়ন চলমান রয়েছে। বাংলাদেশে মানবাধিকার কমিশন থাকলেও তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। তিনি ভবিষ্যতেও যেন মানবাধিকার কমিশনে আদিবাসী সদস্য রাখা হয় সেই দাবি জানান।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহ সাধারণ সম্পাদক গজেন্দ্রনাথ মাহাতো বলেন, আমাদের আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন চলমান রাখতে হবে। আজকের তরুনরাই আগামীর দিনে আন্দোলনে যুক্ত হবে বলে এ আহবানও জানান তিনি।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে সতেজ চাকমা সাম্প্রতিক বাংলাদেশের আদিবাসীদের ওপর ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আদিবাসী জনগণের নিম্নোক্ত ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন—
১. পরিচয়ের স্বীকৃতি: আগামীর সংবিধান সংস্কারে আদিবাসীদের ভিন্ন ভিন্ন জাতি সমূহের পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং সামষ্টিক পরিচিতি হিসেবে আদিবাসী’পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা জরুরী।
২. ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি: আদিবাসীদের সমস্যার গোড়া ভূমি সমস্যার সমাধানে সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন ও পাহাড়ে ভূমি সমস্যার সমাধানের জন্য পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন পুনর্গঠন ও সক্রিয় করা জরুরি।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে অঞ্চলটিকে বেসামরিকীকরণসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৪. চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল: প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারী চাকুরিতে আদিবাসীদের জন্য পূর্বে বরাদ্দকৃত ৫ শতাংশ কোটা পুনববর্হাল করা।
৫. সংসদে আদিবাসীদের জন্য আসন সংরক্ষণ: সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তির জন্য এবং আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণে সংসদের উচ্চ কক্ষ ও নিম্নক্ষে আদিবাসীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা।
৬. সব আদিবাসীর মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু: বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল আদিবাসী জাতিসমূহের নিজ নিজ ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু করে সেগুলো প্রচার ও প্রসারে মনোযোগী হওয়া।
সভায় বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি টনি চিরানের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন- বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কার্যনির্বাহী সদস্য রিপন বানাই, মানবাধিকার কর্মী ত্রিজিনাদ চাকমা। সভার মূল আলোচনার শেষে অংশগ্রহণকারী যুব ও ছাত্র প্রতিনিধিরা মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।