মাহফুজের বয়ানে জুলাই আন্দোলন যেভাবে গণ-অভ্যুত্থানের দিকে মোড় নেয় 

চব্বিশের জুলাই গণআন্দোলন নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।   

বুধবার (১৫ জুলাই) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে তিনি ‘পনেরো থেকে সতেরোই জুলাই, যেভাবে আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানের দিকে মোড় নিলো’ শীর্ষক পোস্টে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। 

মাহফুজ আলমের ফেসবুক পোস্টটি নিচে হুবুহু তুলে ধরা হলো—  

“১৪ই জুলাই রাত দশটায় স্বপ্ন বিল্ডিং-এ মিটিং শেষে আমরা বের হচ্ছি। কেউ বাসায় চলেও গেছে ততক্ষণে। ক্যাম্পাস দিয়ে বাসায় যেতে যেতে রাজাকার স্লোগান শুরু। আবারও সবাই একত্রিত হয়ে ক্যাম্পাসে আসলাম। রাতে অবস্থান করার পরিকল্পনা থাকলেও সম্ভব হলো না। অবশ্য শাহবাগের দিকে ব্যারিকেড দিয়েছিল শিক্ষার্থীরা। 

“রাতে বাসায় গিয়ে ছাত্রলীগের প্রোগ্রামের খবর পাওয়ার পর নাহিদকে কল দিলাম। ওকে না পেয়ে বাকের আর আসিফকে কল দিলাম। ওদের কলে পেয়ে কথা বললাম। রাত তিনটা-চারটায় পাল্টা প্রোগ্রামের ঘোষণা দেয়া হলো।  

“দুপুরে সংঘর্ষ শুরু হলো। মধুর ক্যান্টিনের দিক থেকে বের হয়ে এফবিএসের সামনে থেকে হেলমেট পরা সন্ত্রাসীরা ইট ছুড়ে মারলো। আমরা তখন সূর্যসেনের ক্যাফেটেরিয়া আর এফবিএসের মাঝখানে। আশেপাশে ইট এসে পড়লো। 

“হল পাড়া, কলাভবন, মহসিন হলের দিকে ছাত্রলীগ। আমরা মল চত্বর দিয়ে বের হয়ে আবারও ভিসিতে রিগ্রুপ করার চেষ্টা করলাম। অ্যাডভোকেট তারেক স্লোগান দিলো। তখনই বড় হামলাটা হলো। আমরা ফুলার রোড দিয়ে সবাই বের হচ্ছি। হুড়াহুড়িতে একজনের উপর আরেকজন পড়ে যাচ্ছে।  

“ফুলার রোডের ওখানে আরেকবার রিগ্রুপের চেষ্টা করলাম। সম্ভব হলো না। এসএম হলে শিক্ষার্থীরা আটকে পড়েছে জেনে সাংবাদিক সমিতির সাদিকে কল দিলাম। ওদের পরে উদ্ধার করা হলো।  আহত শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে কেউ পলাশি, কেউ ঢামেকের দিকে গেলো। 

“আমি, নাহিদ, আসিফ, বাকের এবং অন্যরা বিকালে বুয়েটের ক্যান্টিনে বসলাম। রাতে ছাত্রলীগকে হল থেকে বের করে দেয়ার পরিকল্পনা শুরু হলো। আকরামের সাথে কথা হলে ও বললো মেয়েদের হল থেকে শুরু হোক। ১৬ই জুলাই রাতের মধ্যেই অধিকাংশ হল ছাত্রলীগমুক্ত হলো। 

“এদিকে পরের দিন (১৬ই জুলাই) প্রোগ্রামের প্রস্তুতি শুরু হলো। ওইদিন সাদিক সায়েন্স ল্যাব, কাঁটাবন এবং আরও কয়েকটি পয়েন্টে শিবিরের ছেলেদের সাথে সমন্বয় করলো। শহীদ মিনারের কর্মসূচি রাজুতে নিয়ে যেতে চাইলেও সম্ভব হয়নি।  রাতে শহীদুল্লাহ হলের সামনে প্রতিরোধ ও সংঘর্ষ শুরু হলো। আমি নাসির ভাই, আসাদসহ কাঁটাবন থেকে রিকশা নিয়ে চানখারপুল মোড়ে গেলাম। নাসির ভাইয়ের হাতে ছিল ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। উনি পুলিশের চোখ এড়িয়ে আমার কাঁটাবনের বাসায়  এসেছেন। 

“পরের দিন গায়েবানা জানাযা কর্মসূচির পরিকল্পনা হলো। আখতার ইমামতি করার কথা থাকলেও ও গ্রেফতার হয়ে যাওয়ায় তারেক রেজা ইমামতি করলো। শিবিরের ছেলেরা ৬টা কফিন নিয়ে আসলো। ওইদিন সকাল থেকে টিএসসি ও ভিসি চত্বরের সামনে বামপন্থি ছাত্রসংগঠনের ছেলেরা সক্রিয় ছিল। 

“দুঃখজনকভাবে ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করায় ঢাবি শিক্ষার্থীরা অনেকেই ছিল না। আমরা যারা ছিলাম আক্রান্ত হলাম, আহত হলাম। ছাত্রলীগ আর পুলিশের মাঝে আটকা পড়লাম। মল চত্বরে আসিফ পরেরদিন কর্মসূচির নাম দিতে বললো। অনেকগুলো নাম আলোচিত হলো। পরবর্তীতে কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষিত হলো। 

“ক্যাম্পাস থেকে আবার বের হচ্ছি, তখন নাহিদ মহসিন হলের সামনে বসা। ওকে বললাম, সরকারের কারও সাথে বৈঠক হলে চাপ আসবে। তার আগেই পরবর্তী প্রোগ্রাম ঘোষণা করে দিও। নাহিদ আর আসিফ সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিল।  

“নাহিদের সাথে গুম হওয়ার আগে শেষ দেখা। এরপর তার সাথে দেখা হলো গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। নাসির ভাই নাহিদের সাথে ছিলেন। উনি কল দিয়ে বললেন নাহিদ দেখা করতে চায়। আমি মেডিকেলের প্রেসক্রিপশন হাতে আমার বোনকে সাথে নিয়ে বের হলাম, যাতে আমাদের পুলিশ গ্রেফতার না করতে পারে। নাহিদের জন্য একটা কর্মসূচির পরিকল্পনা লিখে নিয়ে গেলাম। শিরীন আপা সেখানে আলাদাভাবে নাহিদকে সেইফ রাখার চেষ্টা করেছিলেন।” 

পোস্টের শেষে মাহফুজ আলম ‘পুনশ্চ’ দিয়ে লেখেন, “এটা আমার গল্প। প্রত্যেকেরই নিজস্ব জুলাই আছে। আপনাদের গল্পও বলেন। জুলাইকে দল, নেতা আর গোষ্ঠীর উর্ধ্বে জনগণের করে তোলেন।”