সম্প্রতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে বেশ কিছু শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় ধারালো অস্ত্রের মহড়া দেখা গেছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকদের মধ্যেও বেড়েছে উদ্বিগ্নতা। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করেছেন কেউ কেউ। মূলত ক্ষমতাসীন বিএনপির ছাত্রদল ও প্রধান বিরোধী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২ আগস্ট থেকে থেমে থেমে এ ধরনের সংঘাত অব্যাহত আছে। ঢাকা, জগন্নাথ, রাজশাহী, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশালের বিএম কলেজের পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত হলেও এখনও অস্থিতিশীল পুরান ঢাকার বখশীবাজারে অবস্থিত মাদরাসা-ই আলিয়া। সর্বশেষ শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে আবাসিক হলে প্রবেশ করতে চাইলে পুলিশের বাধার মুখে পরেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।
এমন অভিযোগ করে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা জানান, বহিরাগত ছাত্রদলের কর্মীরা তাদের সিট দখল করে নিয়েছে। পুলিশের ব্যারিকেডের কারণে অনেকে স্নাতক প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বলেন, শিবিরের অবৈধ দখলদারত্ব থেকে হল উদ্ধার করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
সরকারের ৬ মাসের মাথায় দুটি প্রধান ছাত্র সংগঠনের এমন মারমুখী অবস্থানের পেছনে আসলে কোন বিষয়টি কাজ করছে? কোনও তৃতীয় শক্তির ইন্ধন আছে? এই অস্থিরতা কতদিন চলবে? ছাত্র সংসদে শিবিরে একক আধিপত্য ছাত্রদল সহ্য করতে পারছে না? ক্ষমতার বাইরে থাকলেও আবাসিক হলে শিবিরের নিয়ন্ত্রণ থাকার পেছনে শক্তি কী? এমন প্রশ্নও সামনে আসছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতা বলেন, আসলে ৫ আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন ওয়েলফেয়ার রাজনীতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। যে কারণে বিগত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সংগঠনটি অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। যেখানে ছাত্রদল কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়াও কৌশলে আবাসিক হলগুলোতে শিবির নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে। অথচ মূল সংগঠন বিএনপি সরকারে থাকলেও ছাত্রদল সে অর্থে অনেকটা পিছিয়ে আছে। তাই তারা স্বভাবতই ক্যাম্পাসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে। এতে করে প্রয়োজনে সংঘাতের দিকে যেতে পারে ছাত্রদল। আর ছাত্রদল মারমুখী হলে শিবির বসে থাকবে, তা ভাবার অবকাশ নেই। তাই এ সময়ে ক্যাম্পাস অশান্ত হোক— সরকার চায় কিনা সেটাও দেখার বিষয়।
জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং রাজনীতি বিশ্লেষক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিষয়টি পরিষ্কার। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলীয় ছাত্র সংগঠন নিজেদের আধিপত্য জাহিরের জন্যই পরিকল্পিতভাবে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। কারণ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারে সুবিধা নিয়ে এবং নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে আবাসিক হলগুলোতে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ছাত্রশিবির। তখন ছাত্রদল কিছুটা শান্ত থাকলেও এখন আবার নিজেদের ক্ষমতা জাহির করতে চায়। এ কারণে ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। দুই সংগঠনের এমন শক্তি প্রদর্শনের লড়াইয়ে চিড়েচ্যাপ্টা হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা— যা জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে কাম্য ছিল না।
তিনি মনে করেন, এমনটি চলতে থাকলে এর রেশ সারা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর পড়বে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
হল ও ছাত্র সংসদে নিয়ন্ত্রণ নেই, কীভাবে ফিরতে চায় ছাত্রদল?
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ছাত্রলীগবিহীন ক্যাম্পাসে সক্রিয় হওয়া ডান-বাম সব সংগঠনই জুলাইয়ের শক্তি। তাই বিশেষ কোনও ছাত্র সংগঠন প্রকাশ্যে হল দখল করার মতো সুযোগ পায়নি। তাছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের ছাত্র সংগঠনকে বাড়াবাড়ি করা থেকে নিবৃত করে রেখেছে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল। বিশেষ করে অতীতের ধারাবাহিকতার কথা চিন্তা করলে সংগঠন হিসেবে ছাত্রদলের দিক থেকে এমন উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কঠোর মনোভাব থাকায় তারা তা করতে পারেনি। তাছাড়া তখন বৈষম্যবিরোধী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে এ ব্যাপারে হুঁশিয়ারি ছিল। যদিও তখন থেকেই ছাত্রদল বলে আসছিল, আসলে সাধারণ শিক্ষার্থীর আড়ালে শিবির নিজেদের পরিচয় গোপন করে হলে অবস্থান নিয়েছে।
অন্যদিকে দিকে ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও দেখা গেছে শিবিরের জয়জয়কার। যেখানে ছাত্রদল প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারেনি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ ও গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে জয় পেয়েছে শিবির। শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এজিএস পদে জয়লাভ করেছে ছাত্রদল। আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিপি পদে স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে নির্বাচন করে নির্বাচিত হন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও জুলাই আন্দোলনে সময় বৈষ্যম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আবদুর রশিদ জিতু। পরে অবশ্য জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনি বিএনপিতে যোগদান করেন। যদিও তার ছাত্র সংসদে জিএস ও এজিএসসহ বেশিরভাগ পদই শিবির প্যানেলের। এমন বাস্তবতায় সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে নিজেদের বলয় ফিরে পেতে চায় ছাত্রদল। এ ক্ষেত্রে তারা কোন প্রক্রিয়ায় এগোবে— এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক করেছে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের এক নেতা জানান, সংগঠনটি ক্যাম্পাসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ চায় ঠিকই। তবে তাদের অভিভাবক সংগঠন বিএনপি এ মুহূর্তে ক্যাম্পাসকে সহিংস দেখতে চায় না। তাই ছাত্রদল আগামী দিনে সাধারণ শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চায় ছাত্রদল।
এ বিষয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবু হুরায়রা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘অতীতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে হল দখলসহ সব ক্ষেত্রে আধিপত্য বজায় রেখেছিল। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রদল সহাবস্থানের রাজনীতি করে আসছে। আর ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে আমরা ক্যাম্পাসকে শান্তিপূর্ণ রাখার চেষ্টা করছি। তারপরও ছাত্রশিবির নানাভাবে উসকানি দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চায়। তবে ছাত্রদল ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই কারও ফাঁদে পা দেবে না। আমরা সৃজনশীল কর্মসূচির মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যেতে চাই।
শুধু কি আধিপত্য বিস্তার নাকি অন্য কিছু?
সাধারণত আধিপত্যবিস্তার নিয়ে ছাত্রদল-শিবিরের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও এর নেপথ্যে অন্য হিসাব-নিকাশ দেখছেন অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতারা। তারা মনে করেন, দুই সংগঠনই ছাত্র রাজনীতিতে অতীতের ধারা ফিরিয়ে আনতে চায়। বিশেষ করে অবৈধভাবে গেস্টরুম ও সিট বাণিজ্যের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় তারা মরিয়া। তাছাড়া ক্যাম্পাসের উন্নয়ন কাজে নিজেদের ভাগ বসাতে প্রতিপক্ষকে সহ্য করতে চায় না। তাই একপক্ষ আরেক পক্ষকে প্রতিহত করার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে। যে কারণে তারা সহিংস হয়ে উঠেছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
এ বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ছাত্রদল-শিবিরের চলমান সংঘর্ষের মূলত ক্যাম্পাসগুলোতে একচেটিয়া দখল এবং ভাগ বাটোয়ারার দ্বন্দ্ব। এই সংঘর্ষের সঙ্গে শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থের কোনও সংযোগ নেই। এটাকে শুধুমাত্র দুই দলের সংঘর্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’’
তিনি বলেন, ‘‘লড়াইটা সন্ত্রাস বনাম গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস রক্ষারও।শিক্ষা ও ছাত্রস্বার্থ-বিরোধী এই সংগঠনগুলো সন্ত্রাস-দখলদারত্ব ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। ঠিক তেমনই গণতান্ত্রিক চিন্তার শিক্ষার্থীদেরও সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব মুক্ত গণতান্ত্রিক শিক্ষাঙ্গন প্রতিষ্ঠার লড়াই করা ছাড়া কোনও সুযোগ নেই৷ সন্ত্রাস-দখলদারত্বের বিরুদ্ধে লড়াই না করলে এর অবসান হবে না। প্রতিনিয়ত, প্রতি মুহূর্তে এই লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। আমরা বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে বারবার দেখেছি লীগ-দল-শিবির মুখে যাই বলুক না কেন, তারা বারবার শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস করেছে। আর দলবাজ প্রশাসন সব সময় এসবের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। নির্বিকার থেকেছে।’’
তিনি মনে করেন, শিক্ষা ও ছাত্র স্বার্থবিরোধী এসব ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাসী রাজনীতির বিরুদ্ধে দেশের ছাত্র সমাজের রাজনীতি সচেতনতা, ঐক্যবদ্ধতা এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
কী চান অন্যরা
ছাত্রদল-শিবিরের চলমান সহিংসতা নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে একই ধরনের উদ্বিগ্নতা বিরাজ করছে। দেশের শিক্ষাঙ্গনে এমনটি চলতে থাকলে অ্যাকাডেমিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনটি মনে করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি মুনতাসীর মাহমুদ। তিনি মনে করেন, এর দায় ছাত্রদল-ছাত্রদল ও শিবির এড়াতে পারে না। দুই পক্ষেরই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ ক্যাম্পাস দেখতে চায়। কিন্তু ছাত্রদল তা মানছে না। তাই তারা ছাত্রশক্তিসহ ভিন্নমতালম্বীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। মূলত তারা অবৈধভাবে ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া। তবে ছাত্রদল বা শিবির যারাই পেশিশক্তির ব্যবহার করতে চাইবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করবেন।’’
জানতে চাইলে ইসলামী ছাত্রশিবিরে কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক নোমান হোসেন নয়ন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এক্ষেত্রে শুধু শিবিরই দায়ী নয়। ক্ষমতাসীন দলের সংগঠন হিসেবে ছাত্রদলকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘ছাত্রশিবির সব সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবে।’’