মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান স্বীকারের পাশাপাশি স্বাধীনতা-পরবর্তী তার শাসনামলের নির্মোহ ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতারা।
শনিবার (১৫ আগস্ট) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের ৫১তম বার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর পুরান পল্টনের মৈত্রী মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় তারা এ কথা বলেন।
সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দনের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন দলটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক এম এম আকাশ, ডা. দিবালোক সিংহ ও মঞ্জুর মঈন।
আলোচনা সভায় নেতারা বলেন, পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। ছয় দফা, পরবর্তী সময়ে ১১ দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে
তারা বলেন, কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির বিভিন্ন ধারা এবং আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয়তাবাদী ধারার প্রধান নেতা হিসেবে স্বাধীনতা আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হন।
তবে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক রূপান্তর, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি ও জনজীবনের নানা সমস্যার কারণে দলটির জনপ্রিয়তা কমতে থাকে বলে মন্তব্য করেন সিপিবি নেতারা।
তাদের ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধের পর যে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচনের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সিপিবি নেতারা বলেন, ওই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।
তারা বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং নিহতদের স্মরণ করা ঐতিহাসিক কারণেই জরুরি। একইসঙ্গে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সামরিক হস্তক্ষেপ ও অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের রাজনীতির বিরুদ্ধেও অবস্থান অব্যাহত রাখার কথা জানান তারা।
সভায় নেতারা বলেন, ইতিহাসকে কোনও ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক সম্পত্তিতে পরিণত করা উচিত নয়। বঙ্গবন্ধুর জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে ঐতিহাসিক ভূমিকা যেমন অস্বীকার করা যাবে না, তেমনি স্বাধীনতা-পরবর্তী তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্র পরিচালনা ও গণতন্ত্রের সংকোচনের ঘটনাবলিরও নির্মোহ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
তাদের মতে, ইতিহাসের প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকলেই অতীতের রাজনৈতিক ভুল ও বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব।
সিপিবি নেতারা বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সামরিক হস্তক্ষেপ, স্বৈরতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের ধারার অবসান ঘটানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ১৯৭৫ ও ২০২৪ সালসহ সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
সভা থেকে ইতিহাসের বিকৃতি ও দলীয় রাজনৈতিক বয়ানের ঊর্ধ্বে উঠে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সবাইকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা শোষণ, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।