সরকারের ৬ মাসে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অভিযোগ ১১ দলের

অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকারের ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা। তাদের দাবি, সরকারের ছয় মাসের শাসনে অব্যবস্থাপনা বেড়েছে এবং সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

রবিবার (২৩ আগস্ট) বিকালে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের ২৯ মিন্টো রোডের বাসায় ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে নেতারা এসব কথা বলেন।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সন্ধ্যায় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।

ব্রিফিংয়ে নেতারা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ১১ দল ঐক্যবদ্ধভাবে লংমার্চ সফল করবে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নসহ নানা সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারের ১৮০ দিনে অব্যবস্থাপনার কারণে জনভোগান্তি বেড়েছে। তাদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকারের ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

নেতারা বলেন, দেশে চাঁদাবাজির ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। সার সংকটে কৃষকরা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। এসব সমস্যা স্বীকার না করে সরকার জনগণকে প্রতারণা করছে। তাদের অভিযোগ, সরকারের ১৮০ দিনই অব্যবস্থাপনায় কেটেছে এবং দেশ পরিচালনায় সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই। বিরোধীদলের পক্ষ থেকে জ্বালানি সংকট নিরসনে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।

পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে নেতারা বলেন, গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রেস ব্রিফিংয়ের ঘটনায় ভারত সরকারকে যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকার ব্যর্থ হয়েছে। দিল্লিতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তারা। তাদের বক্তব্য, যেকোনও দেশের সঙ্গে পারস্পরিক মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক চায় ১১ দল।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন নেতারা। তাদের দাবি, বিরোধী মতের ছাত্রসংগঠন ও ছাত্রসংসদের নেতাদের দমন-পীড়ন করা হচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ সংকুচিত করা হচ্ছে। সরকার নজিরবিহীনভাবে দলীয়করণ করছে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে দলীয় লোক নিয়োগ দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও দলীয়করণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।

নেতারা আরও বলেন, সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় মানছে না এবং জনগণের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না। সরকার জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ১১ দল তার উপযুক্ত জবাব দেবে।

দেশবাসীকে লংমার্চে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, এটি একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন। এতে কোনও ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বাধা এলে তা প্রতিহত করে সামনে এগিয়ে যাওয়া হবে।

নেতারা জানান, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের সূচনা পর্বে রাজধানীতে জনসমাবেশ হবে। লংমার্চের পথে বিভিন্ন পয়েন্টে পথসভা করা হবে। পরে ধারাবাহিকভাবে সারাদেশে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করা হবে।

তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। নেতারা বলেন, সরকার গঠনের ছয় মাস পার হলেও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এ কারণেই তারা আন্দোলনে নেমেছেন।

তারা বলেন, সংবিধান সংস্কার কিংবা গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার যেন এদিক-সেদিক না করে। সংবিধান সংস্কার না করে সরকার সংশোধনের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা সরকারের জন্য ভালো পরিণতি বয়ে আনবে না।

নেতারা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কথাও তুলে ধরেন। তাদের ভাষ্য, মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাসের সংকটে কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানও তাদের আন্দোলনের অন্যতম দাবি।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাগপার সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।

এছাড়া উপস্থিত ছিলেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, এবি পার্টির মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়্যুম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, জাগপার মহাসচিব অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মুখপাত্র মো. নাজমুল ইসলাম তালুকদার এবং এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুল্লাহ আল মামুন রানাসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা।