রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর কাদের, কেন এত ক্ষোভ?

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেয়ালচিত্রে কালি দেওয়ার ঘটনায় আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে এ ঘটনায় রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম আয়াসসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনাটিকে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণ হিসেবে দেখছে পুলিশ। আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার আগে এ ধরনের কর্মকাণ্ড উসকানিমূলক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। তবে ঘটনাটির সঙ্গে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত উসকানির কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিশিষ্টজনেরা বলছেন, রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্র মোছার চেষ্টা মূর্খতার বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যথাযথ ধারণা না থাকা এবং গুজব ও উগ্রপন্থীদের প্ররোচনা থেকে এমন কর্মকাণ্ডের জন্ম হতে পারে। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করছেন, আলোচনায় আসার উদ্দেশ্যেও এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, রবীন্দ্রনাথের ওপর কাদের এবং কেন এত ক্ষোভ?

রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্র মোছার নেপথ্যে

গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এরপর ফুটপাতের দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দেয়ালচিত্র আঁকা হয়।

গত শুক্রবার ‘জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে এসব সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ছবি আঁকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সত্যজিৎ রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ‘পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব’ আখ্যা দিয়েও তাঁদের দেয়ালচিত্র আঁকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে।

কেউ কেউ বলেন, বাংলাদেশে জ্ঞানী-গুণী মানুষের অভাব নেই। শিল্পকলার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সামনে দেয়ালচিত্র আঁকার ক্ষেত্রে কাদের ছবি থাকবে, তা নিয়ে আলোচনা করা উচিত ছিল। তাদের দাবি, বাংলাদেশের বিরোধিতা করা রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্র কোনোভাবেই শিল্পকলার সামনে স্থান পাওয়া উচিত নয়।

আবার কেউ কেউ অভিযোগ করেন, যারা ভারতীয় আধিপত্যের কাছে নিজেদের গোলাম হিসেবে সমর্পণ করেছেন, তারাই ভারতীয়দের এ দেশে জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এরপর শনিবার দুপুরে শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে এক নারীকে কালি দিতে দেখা যায়। এ সময় একজন পুলিশ সদস্য তাকে বাধা দেন। ওই নারী বলেন, তারা ‘ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ’ জানাতে এসেছেন। পুলিশি বাধার মুখে আয়াসের নেতৃত্বে তারা স্লোগান দেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে আয়াসসহ চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আয়াসসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। কোন ধারায় বা অভিযোগে মামলা করা হবে, তা পরে জানানো হবে।

আসন্ন দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাজধানীজুড়ে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ৬ অক্টোবর ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দীন আহমদ এবারের দুর্গাপূজাকে পুলিশের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পাশাপাশি পোশাকধারী ও সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েনের কথাও জানান তিনি।

রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনাটি নিছক প্রতিবাদ, নাকি এর মাধ্যমে সামাজিকভাবে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন গোয়েন্দারা। বিশেষ করে ধর্মীয় উৎসবের আগে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি বিকৃত করার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

উল্লেখ্য, গত ৫ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও সত্যজিৎ রায়সহ ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকা হয়। এর কয়েক দিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

‘জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি পৃথিবীর সম্পদ’

রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্র মোছার চেষ্টা এবং তাতে কালি দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. আব্দুন নূর তুষার। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘এটা কোনও রাজনীতি না। এটা কোনও রাজনীতির মধ্যেই পড়ে না। ইচ্ছা করে মানুষের মনে বিদ্বেষ জাগ্রত করার প্রক্রিয়া। এটাকে রাজনীতি বলা হয় না। জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি পৃথিবীর সম্পদ, যেটা কোনো ভৌগোলিক বাউন্ডারির মধ্যে থাকে না। সেখানে এরা বাংলা ভাষাভাষী। এদের অধিকাংশের জন্ম বাংলায়। আর রবীন্দ্রনাথ আমাদের জাতীয় সংগীত লিখেছেন। মানে এইগুলো কোনো কাজের মধ্যেই পড়ে না।’

এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবি, সত্যজিতের ছবি, বিদ্যাসাগরের ছবি নিয়ে এই প্রলাপ ও বিলাপের কারণ এরা ভাষা সংস্কৃতিহীন রাজনীতি করে। এদের চাই বিরোধ আর বিবাদ। এদের আইকন নাই। কবি নাই। চিত্রকর নাই। চিত্র নির্মাতা নাই। এদের সবচেয়ে বড় আইকনদের উচ্চতা বেগুনবৃক্ষের চেয়েও কম। এদের জন্য সেগুনবাগিচা না, বেগুনবাগিচা দরকার।’

‘দেয়ালচিত্র মোছার চেষ্টা মূর্খতার প্রকাশ’

রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্র মোছার চেষ্টা মূর্খতা ছাড়া আর কিছু নয় বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক যে আমরা এই রকম একটা সামাজিক অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছি। সমাজটাকে আমাদের অনেকভাবে পরিশুদ্ধ করতে হবে, পরিশীলিত করতে হবে। অন্ধতার শক্তিকে আলোর শক্তি দিয়েই মোকাবেলা করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘কোনো রকম একটা মৌলিক যে শিক্ষা, এই শিক্ষাটা পায়নি এরকম মানুষের সংখ্যা কম নয়। তারাই গুণী ব্যক্তিদের কদর করতে জানে না। এই কাজগুলো আমাদের সবার জন্য, সমাজের জন্য কলঙ্কজনক। আমাদের দেখতে হবে, এই রকম মানসিক অধঃপতন কেন জন্ম নেয়।’

মফিদুল হক আরও বলেন, ‘আমাদের আসলে একটা সাংস্কৃতিক লড়াই করতে হবে এবং মানুষের মনকে পরিশুদ্ধ করে দেয় এমন কাজ করতে হবে। আজ এই কাজ যারা করেছে, তাদের নিন্দা জানাই। কিন্তু এই কাজ যদি সমাজে হতে পারে, এই বাস্তবতা কারা তৈরি করছে, সেটা খুব বিবেচনা করার আছে এবং সেখানে আমাদের অনেক কিছু করার আছে। এই রকম পশ্চাদপদ চিন্তা আমাদের সমাজ থেকে দূর করতে হবে।’

ক্ষতিগ্রস্ত হলে আবার আঁকা হবে দেয়ালচিত্র

শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে গুণী ব্যক্তিদের দেয়ালচিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুনরায় আঁকার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।

তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ফুটপাত দখলমুক্ত করে সেখানে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য গুণী ব্যক্তিদের দেয়ালচিত্র আঁকা হয়েছে। কেউ যদি তা মুছে ফেলার চেষ্টা করে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রয়োজনে পুনরায় সেখানে দেয়ালচিত্র আঁকবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোন পরিপ্রেক্ষিতে এমন ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ড হয়েছে, তা জানা নেই। তবে আমি সবার উদ্দেশে বলব, গুণী ব্যক্তিদের সম্মান করতে জানতে হবে। এ দেশের জন্য, এ দেশের ভাষা-সংস্কৃতির জন্য যাদের অবদান আছে, তাদের অবজ্ঞা বা অসম্মান করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

‘আলোচনায় আসতেই এমন কর্মকাণ্ড’

রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্র মোছার চেষ্টা ও তাতে কালি দেওয়ার ঘটনাকে আলোচনায় আসার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘এদের কোনও সংগঠিত দল নেই, কোনও সমর্থকও নেই, এদের কিছুই নেই। সাধারণত একেবারেই গুরুত্বহীন একটা চরিত্র। তারা একটু আলোচনায় আসার জন্য এগুলো করে এবং তারা জানে, এদের ধরে নিয়ে যাবে, পরে আবার ছেড়েও দেবে। দেখবেন, খুব শিগগিরই ছাড়াও পেয়ে যাবে।’

মাসুদ কামাল বলেন, ‘আমি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলি, এইটা যারা করেছে, তারা অবশ্যই অন্যায় করেছে। ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরেও তারা মানুষের গায়ে হাত দিয়েছে, মেয়েদের গায়ে হাত দিয়েছে। ওই সমস্ত ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, শেষমেশ যাদের গায়ে হাত দিয়েছে, তাদেরই পুলিশ গ্রেফতার করছে। তো তারা এখান থেকে প্রশ্রয় পেয়েছে। প্রশ্রয় পেয়ে আজকে এটা করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে যে মেয়েটি কালি লেপন করেছে, সে বলছে রবীন্দ্রনাথ নাকি বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর অনেক বছর পরে বাংলাদেশের জন্ম। রবীন্দ্রনাথ যখন মারা যান, তখন তো পাকিস্তানেরও জন্ম হয়নি। নিতান্ত মূর্খ না হলে এমন কেউ করত না। আপনি দেখবেন, ওই মেয়েটা যখন কথা বলছিল, সে মোবাইল দেখে দেখে বলছিল। মানে এগুলো একেবারেই গুরুত্বহীন চরিত্র। এই গুরুত্বহীন চরিত্রগুলো শুধু আলোচনায় আসার জন্য এগুলো করছে।’

জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিক বলেন, ‘দেখবেন, এরা আবার ছাড়া পাবে। আবার আরেকটা ইস্যু দিয়ে একই রকম আচরণ করবে। তো আমার ধারণা, এদের কোনো পাত্তাই দেওয়া উচিত না। এদের উপেক্ষা করতে পারলে সবচেয়ে ভালো। কিন্তু উপেক্ষা তো করা যায় না। এদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নিলে দেখবেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এদের তো কেউ কিছু বলে না। না বলার কারণে এরা এই ধরনের প্রশ্রয় পায়।’