সেরা দরটাই পেয়েছে বিসিবি: কাজী ইনাম আহমেদ

সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব পেয়েছে দেশের বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল গাজী টিভি। বিসিবির সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের মুখোমুখি হয়েছিলেন বিসিবির বিপণন ও বাণিজ্য পরিচালক কাজী ইনাম আহমেদ। কথা বলেছেন টিভি স্বত্ব নিয়ে বিসিবির পূর্বের সব তিক্ত অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্যে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো-

বাংলা ট্রিবিউন: নতুন করে অাগামী ছয় বছরের জন্যে টিভি স্বত্ব বিক্রি করেছে বিসিবি। এ নিয়ে বিসিবির পূর্বের অভিজ্ঞতা কী? আগে যারা স্বত্ব পেয়েছিলেন তাদের কাছ থেকে বিসিবির কী পরিমাণ আয় হয়েছিল?

কাজী ইনাম: ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টিভি স্বত্ব পেয়েছে গাজী টিভি। তবে এবারই প্রথম নয়। আগেও দু'বার স্বত্ব বিক্রি করেছিল বিসিবি। একবার ২০০০ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত। যেটা ছিল ওয়ার্ল্ড টেল আর ইএসপিএন স্টার স্পোর্টসের সঙ্গে। ওই সময় বিসিবির সঙ্গে তাদের চুক্তি ১১ মিলিয়ন ডলারের হলেও আয় হয়েছিল ৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। আরেকটা হয়েছিল ২০০৬ থেকে ২০১২ সালে। ওটা ছিল নিম্বাসের সঙ্গে। প্রোডাকশনসহ চুক্তি ছিল ৫৬ মিলিয়ন ডলারের। যার মধ্যে প্রোডাকশন খরচ ছিল ২০ মিলিয়ন। প্রোডাকশন খরচটা দিলেও স্বত্ব ফি'র মাত্র ৬ মিলিয়ন দিয়েছিল নিম্বাস।

বাংলা ট্রিবিউন: ২০১২ মওসুমের নিলামের অবস্থা কেমন ছিল? তখন কতটি প্রতিষ্ঠান নিলামে অংশ নিয়েছিল?

কাজী ইনাম: ২০১২ সালে তেমন সাড়া মেলেনি। মাত্র একটা দরপত্র পড়েছিল। কিন্তু তাদের অফার ভালো ছিল না। অফার ছিল মাত্র ৬ মিলিয়ন ডলারের। তবে পরে তারা অফারটাকে বাড়িয়ে ৯ মিলিয়ন ডলারের একটা অফার করেছিল।

বাংলা ট্রিবিউন: সেটা কয় বছরের জন্য?

কাজী ইনাম: সেটা ছিল চার বছরের জন্য। কিন্তু সেই চার বছরে মূল ইস্যুটা ছিল ভারতের সাথে খেলা। ভারতের সাথে সেবার খেলা ছিল ষোলো দিন। আমাদের এখন সামনের ছয় বছরে ভারতের সাথে আমাদের খেলা আছে এগারো দিন। অর্থাৎ আগে যা খেলা ছিল এখনও তাই আছে। তবে তখন অফার ছিল ৯ মিলিয়ন, আর এখন ২০।

বাংলা ট্রিবিউন: নতুন চুক্তিকে গত দুই বছরের সঙ্গে কিভাবে তুলনা করবেন?

কাজী ইনাম: ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কোনো সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি হয়নি। এসময় আমাদের খেলা ছিল শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। এ তিনটা দেশের খেলার সম্প্রচার স্বত্ব আমরা বিক্রি করেছি ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারে। সামনের তিন বছরে এই তিন দেশের সাথে যে সিরিজ তা আমরা এখন বিক্রি করছি ২.৪ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ প্রায় ১০ গুণ বেশি দামে। ওয়ার্ল্ডটেলের সাথে আমরা পেয়েছিলাম ৯-১০ মিলিয়ন ডলার। তবে নিম্বাসের কাছে সত্যিকার অর্থে পেয়েছি ৬ মিলিয়ন ডলার। আমাদের চুক্তি হয়েছিল ৫৬ মিলিয়নের। তারা প্রডাকশন খরচের ২০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু সম্প্রচার সত্বের মাত্র ৬ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল। অর্থাৎ গত ১৪ বছরে আমরা পেয়েছি ১০ প্লাস ৬ প্লাস আড়াই, অর্থাৎ ১৬ থেকে ১৭ মিলিয়ন ডলার। এখন সামনের জন্য আমরা পাবো ২০ মিলিয়ন ডলার।

বাংলা ট্রিবিউন: এর মধ্যে প্রডাকশন কস্ট নেই?

কাজী ইনাম: না নেই। প্রডাকশন কস্ট আলাদা করলে হবে ৩৫ মিলিয়ন ডলার।

বাংলা ট্রিবিউন: নিম্বাসের সঙ্গে সম্প্রচারের চুক্তি কত টাকার ছিল?

কাজী ইনাম: নিম্বাসের সঙ্গে সম্প্রচার সত্ব নিয়ে চুক্তি হয়েছিল ৩৬ মিলিয়ন ডলারের। সেখানে পেয়েছি মাত্র ৬ মিলিয়ন ডলার।

বাংলা ট্রিবিউন: এখন অনেকে বলেছিল অস্ট্রেলিয়ান একটা কোম্পানি আপনাদের সাথে কথা বলেছিল..। যারা আপনাদের ৫০ মিলিয়ন ডলার সত্ব দেওয়ার কথা বলেছিল। এটা কি ঠিক?

কাজী ইনাম: অস্ট্রেলিয়ান ওই কোম্পানিকে তো আমরাই নিযুক্ত করেছিলাম, আমাদের অ্যাডভাইজ দেওয়ার জন্য।

বাংলা ট্রিবিউন: তারা কত অফার করেছিল?

কাজী ইনাম: তারা আসলে কোনো অফার করেনি। তারা একটা গবেষণা সংস্থা। তারা অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড, ইংলিশ ক্রিকেট বোর্ড ও আই‌‌‌সিসির জন্য তারা গবেষণা করে বের করে ফিফা বা ক্রিকেটের গ্লোবালি কোনো একটা খেলার সম্প্রচার সত্ব কত। তারা যা করছিল ওটা ছিল একাডেমিক রিসার্চ। তারা আসলে আমাদের বোঝাতে চেয়েছিল যে আমাদের এই বাংলাদেশের খেলা যখন ইংল্যান্ড বা ভারতে দেখানো হয়েছিল, সেই সময় ব্রডকাস্টারদের কত আয় হয়েছিল। সেটা ছিল নিম্বাসের সময়। ওই সময় বাংলাদেশের প্রতিটা খেলা ইংল্যান্ড ও ভারতে দেখানো হয়েছিল। তখন সেখানে আয় ছিল। এখন স্টার স্পোর্টস শুধু বাংলাদেশের সাথে ভারতের খেলাটা দেখাতে চাচ্ছে। অন্যগুলো দেখাতে চাচ্ছে না। আমাদের খেলা যদি পৃথিবীর সবখানে দেখানো হয়, তাহলে সেই ব্রডকাস্টারের রেভিনিউ হতে পারে ৪৯ মিলিয়ন। এটা ৫৫ বা ৫১'ও হতে পারে। আমাদের এখান থেকে যে ব্রডকাস্টাররা এখন নিয়েছে, সে তো এখন অন্যান্য ব্রডকাস্টারকেও দেবে। সেই ব্রডকাস্টারেরও তো নিশ্চয়ই একটা লাভ থাকবে। সেই ব্রডকাস্টাররা আবার কেবল অপারেটরদের দেবে। এভাবে যদি দেখেন তবে সেটা ৪৯-৫০ হতে পারে। সেটার মধ্যে অনেক রিস্ক ফ্যাক্টর আছে।

বাংলা ট্রিবিউন: এখন আপন‌‌‌ারা নগদ পাচ্ছেন ২০ মিলিয়ন?

কাজী ইনাম: আমরা ক্যাশ পাচ্ছি ২০ মিলিয়ন। আমাদেরকে গবেষণার নামে তারা অনেক সংখ্যা দেখিয়েছিল। এটা তারা মূদ্রাস্ফীতি হিসাব করে দেখিয়েছিল। এখন মূদ্রাস্ফীতি অত হবে কিনা সেটা আমরা জানিও না। এটা একটা গোপনীয় তথ্য ছিল আমাদের পরিচালকদের ভেতর। দুর্ভাগ্য যে কেউ একজন সেটা বাইরে যেভাবে প্রকাশ করেছে, তাতে দর্শক ও শুভাকাঙ্ক্ষিরা ভুল তথ্য পেয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: এতে বিসিবির আয়ে কোনো ক্ষতি হচ্ছে না?

কাজী ইনাম: না। আপনি এভাবে চিন্তা করে দেখেন, যেখানে গত ১৪ বছরে আমাদের আয় ১৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি না, যেখানে গত ২ বছরে যে তিনটা সিরিজ আমরা আড়াই মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করতে পেরেছি, সেখানে একই তিনটা সিরিজ থেকে আমরা পাবো আড়াই মিলিয়ন ডলার। পুরো প্রক্রিয়াটাই স্বচ্ছ। আমরা সব মিডিয়াকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম যারা এক বছর প্রচারে ছিল। আমরা সকল দেশি-বিদেশি মার্কেটিং এজেন্সি ও ব্রডকাস্টারকে দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু দরপত্র বিক্রি হয়েছিল সাতটি। আন্তর্জাতিক বড় মাপের সনি, স্টার, টেন সবাই কিনেছে। দুর্ভাগ্য যে তারা কেউ ইন্টারেস্ট দেখায়নি।

বাংলা ট্রিবিউন: কেন দেখায়নি? আগে তো টেন স্পোর্টস, ইএসপিএন এরা তো মুখিয়ে থাকতো বাংলাদেশের রাইটস নেওয়ার জন্য।

কাজী ইনাম: স্টার স্পোর্টসের কথাই ধরুন, তাদের আইসিসি আছে, তাদের ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া আছে, তাদের ক্যালেন্ডার ইতিমধ্যেই পরিপূর্ণ। আমাদের খেলার সাথে অনেক জায়গাতে তারা আটকে যাচ্ছে। আবার সনির ফোকাস মূলত আইপিএল-এ। টেন স্পোর্টসেরও ৫টা বোর্ড আছে। চুক্তিটা ২০১২ সালে করলে হয়তো পারা যেত। তবে সেবার আন্তর্জাতিক ব্রডকাস্টারদের কেউ দরপত্রই কেনেনি। এবার চূড়ান্তভাবে দুজন বিড করেছিল। আর গাজী টিভির নির্ধারিত মূল থেকে একটু বেশি দিয়েই স্বত্ব কিনে নেয়। আর আমরা যে প্রাইসটা পেয়েছি, সেটা আসলে এখনকার বাজারদর হিসেবে সেরা।

বাংলা ট্রিবিউন: তো, এখানে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে বিসিবির পরিচালকের লাভ কী?

কাজী ইনাম: হয়তো কোনো ভুল বুঝাবুঝি হয়ে থাকতে পারে। আমাদের জানা মতে একটা পত্রিকায় এ বিষয়টি এসেছিল। আর আমাদের বিসিবি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, যদি কোনো পরিচালক মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলে, তবে তিনি যেন অন-রেকর্ড কথা বলেন।

বাংলা ট্রিবিউন: আমরা বরাবরই দেখেছি যে ঘরোয়া টিভি সত্ব বরাবরই উপেক্ষিত।

কাজী ইনাম: আমরা ডমেস্টিকটাকে আলাদাই রেখেছি। এখন যদি কেউ কিনতে চায়, তবে সেটার জন্য আবার টেন্ডার দিব। এর জন্য আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টাও থাকবে।