বাবার মৃত্যুর পর সরকারি কোয়ার্টারে থাকার সুযোগ হারাতে হয়। ভাড়ায় গাড়ি চালানো আবুল হোসাইন বাসা ভাড়া নিয়ে কষ্টে চালাতে থাকেন সংসার।
বড় ভাই যখন সংসারের চাকা সচল রাখতে ব্যস্ত , শাহাদাত ছুটছেন ক্রিকেটে নিজের স্বপ্নপূরণের পথে। বিকেএসপিতে ট্রায়াল দিয়ে টেকেননি। স্বপ্নটা চুরমার হতে বসার মুহূর্তে সুদীপ্ত দেব নামের একজনের আগমন । মা ও বড় ভাইকে বুঝিয়ে শাহাদাতকে তিনি ভর্তি করে দেন ইস্পাহানি ক্রিকেট একাডেমিতে।
২০১৩ সালে ইস্পাহানি একাডেমি থেকে দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট খেলেন শাহাদাত। আর্থিক অনটনে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি গ্রামে ফিরে যেতে চাইলেও শাহাদাতের জেএসসি পরীক্ষার কারণে কিছুদিন অপেক্ষা করেন তারা। ওই সময়েই চট্টগ্রাম জেলা দলে সুযোগ হয়। ওটাই শাহাদাতের জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’।
নিত্য অনটনের মধ্যেও শাহাদাত ক্রিকেট মাঠ ছাড়েননি। চালিয়ে গেছেন চেষ্টা । ফলশ্রুতি আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের বাংলাদেশ দলে সুযোগ । এখন মনেপ্রাণে চাইছেন দেশসেরা ক্রিকেটার হয়ে মা, বড় ভাই এবং আরেক ভাই সুদীপ্তর ঋণ শোধ করতে।
অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৫ যোদ্ধাকে নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ থাকছে শাহাদাত হোসাইনের একান্ত সাক্ষাৎকার−
বাংলা ট্রিবিউন: কিভাবে ক্রিকেটে এলেন?
শাহাদাত: ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল বড় ক্রিকেটার হবো। বিকেএসপিতে ভর্তির আগে দুই-এক মাস ক্যাম্প করেছিলাম । কিন্তু বিকেএসপিতে ভর্তি হতে পারিনি । ২০১৩ সালের শুরুর দিকে চিন্তা করলাম, আমাকে দিয়ে হবে না। আমাকে অন্যকিছু করতে হবে কিংবা ভাইয়ের সঙ্গে সংসারের হাল ধরতে হবে। কারন ২০১০ সালে আমার বাবা ক্যান্সারে মারা যান। তখন আমার বয়স ৮-৯ বছর। বাবা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের গাড়ি চালাতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর আমরা ভীষণ আর্থিক সমস্যায় পড়ে যাই। ভাই অনেক পরিশ্রম করে সংসার চালাচ্ছিল। ওই অবস্থায় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখাও ছিল কঠিন।
বাংলা ট্রিবিউন: তবুও এই যুদ্ধে কিভাবে জয়ী হলেন?
শাহাদাত: এলাকার অলিতে-গলিতে টেপ টেনিসের ক্রিকেট খেলার কারণে আমাকে চিনতো অনেকে। এলাকার এক বড় ভাই সুদীপ্ত দাস জানতে পারেন, আমি বিকেএসপিতে টিকিনি। উনিই আমাকে ২০১৩ সালের শেষদিকে একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন ভাইয়া-আম্মাকে বুঝিয়ে । সুদীপ্ত দা বলেছিলেন একাডেমিতে অনুশীলনে ভালো করলে জেলা কিংবা বিভাগীয় দলে সুযোগ হতে পারে।
বাংলা ট্রিবিউন: একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পরের পথটাও তো শুনেছি সহজ ছিল না?
শাহাদাত: বাবা মৃত্যুর পর আমাদের নামে বরাদ্দ সরকারি কোয়ার্টার থাকার সুযোগ হারিয়েছিলাম। ভাড়া বাসায় থাকার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিলো না। এক পর্যায়ে ঠিক হলো গ্রামের বাড়ি চলে যাবো। তারপরও আমার জন্যই আম্মু-ভাইয়া সরকারি কোয়ার্টারেই আরেকজনের বরাদ্দ বাসা কিছুদিনের জন্য ভাড়া নেন । এই সুযোগও চলে গেলো। তখন ভাইয়া বাড়ি ভাড়া নিলো । কিন্তু ভাইয়েরও খুব কষ্ট হচ্ছিলো খরচ চালাতে । সুদীপ্ত ভাই বললো, দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট আছে, তুই ওখানে খেলতে পারিস। ভাবলাম তিনটি ম্যাচ খেলি, ভালো খেললে হয়তো সুযোগ আসবে । আমার তখন জেএসসি পরীক্ষা ছিলো। পরীক্ষা দিলাম, আবার চট্টগ্রাম জেলার হয়ে সুযোগও পেলাম। তখন আরেকটা বাসা ভাড়া নেয় ভাইয়া, আমরা দুই পরিবার শেয়ার করে থাকতাম। এভাবেই ২০১৮ সাল পর্যন্ত আর্থিকভাবে খুব কষ্ট করে ক্রিকেটটা চালিয়ে গেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: পারিবারিক অনটন মানসিকভাবে নিশ্চয়ই খুব যন্ত্রনা দিয়েছে আপনাকে?
শাহাদাত: এমনও হয়েছে অন্যের কাছ থেকে চার হাজার টাকা ধার করে নিয়ে আমাকে ব্যাট কিনে দিয়েছে ভাই । ওই ব্যাট দিয়ে আমি জেলা পর্যায়ে খেলেছি। ধার-দেনা ৬-৭ মাস ধরে একটু একটু করে পরিশোধ করেছে ভাই । আমাকে একটুও বুঝতে দেয়নি তার কষ্টটা । তবুও আমি বুঝতাম। মাঝেমাঝে মনে হতো, সব ছেড়ে দিয়ে রোজগারে নামি । আমার এ জায়গায় আসার পেছনে বড় অবদান আমার বড় ভাই আর সুদীপ্ত ভাইয়ের।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার নিজের কোনও ক্রিকেট সরঞ্জাম ছিল না, কিভাবে জোগাড় করেছেন সব ?
শাহাদাত: সব সুদীপ্ত ভাইয়ের অবদান। উনি চট্টগ্রাম মেডিকেলে চাকরি করেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার লিগও খেলেন। তার কথা বলতে গিয়ে আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে! উনি যা করেছেন, তার কিছুই আসলে দূরের কেউ করবে না। ওনার মতো ভালো মানুষ হতে চাই। বোর্ড থেকে পেয়েছিলাম কেবল ট্রলি ব্যাগটা । বাকি সব এই ভাই দিয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৫ ক্যাম্পে ওনার সবকিছু দিয়ে ক্যাম্প করি। উনি চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন অন্যের সরঞ্জাম নিয়ে ।
শাহাদাত: তাদের খুশিটা আমি বলে বোঝাতে পারবো না। তাদের মুখে হাসি দেখতে পেরে আমি মাঝেমাঝে রাতে কাঁদি। বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা তো কিছুই দেখে যেতে পারলো না! মাঝেমাঝে ভাবি, যে আমি এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ছিলাম আর সেই আমি বিশ্বকাপ খেলছি, তাও বাইরের দেশে গিয়ে, শরীরে চিমটি কেটে দেখি সত্যি তো! পরিবারের মনের অবস্থা আসলে বোঝানো যাবে না।
বাংলা ট্রিবিউন: অনূর্ধ্ব-১৭ সালে ক্যাম্প থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার পর মনের অবস্থা কী ছিল?
শাহাদাত: অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে আমাকে অনূর্ধ্ব-১৫ দলে দেওয়া হয়েছিলো। অনেক কোচও বলেছিলেন, আমাকে দিয়ে হবে না। অনেক এলাকার মানুষ বলেছে, এসব খেলে লাভ নেই। এর চেয়ে ভালো অন্য কাজ করো, পরিবারকে সাহায্য করো। তবে আমি সবসময় চিন্তা করতাম ভালো সময় আসবেই, ক্রিকেট ছাড়বো না । একবার এশিয়া কাপে খারাপ করে শ্রীলঙ্কা সিরিজ থেকে বাদ পড়ি। ওই সময় আমি জাতীয় লিগে সুযোগ পাওয়ায় নিজের ভুলগুলো শুধরে নিতে পেরেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করার জন্য আপনি কতটা প্রস্তুত?
শাহাদাত: প্রসেসের মধ্যে থাকলে যেকোনও কন্ডিশনেই ব্যাটিং করা কঠিন নয়। যে যত মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবে-এই ধরনের উইকেটে সে ততো বেশি খেলার সুযোগ পাবে। টপ অর্ডার যেকোনও দিন ভেঙে পড়তেই পারে। যেদিন ভেঙে পড়বে, সেদিনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। দলের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটিং করতে হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: মাহমুদউল্লাহকে কেন অনুসরণ করেন?
শাহাদাত : দলের সঙ্কটে মাহমুদউল্লাহ ভাই দলের হাল ধরেন। তার মতো ক্রাইসিস মোমেন্টের খেলোয়াড় হতে চাই। আমার ব্যাটিং পজিশনও মাহমুদউল্লাহ ভাইয়ের মতো । তার মতো আমিও অফ স্পিনার। তাকে অনুসরণ করেই আমার এগিয়ে যাওয়া।
প্রোফাইল
নাম : শাহাদাত হোসেন
ডাকনাম : দীপু
জন্ম: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০০২
জন্মস্থান : চট্টগ্রাম
উচ্চতা: ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি
পড়াশুনা : এইচএসসি প্রথম বর্ষ (এমএস কলেজ)
প্রথমক্লাব : ইস্পাহানি ক্রিকেট ক্লাব
বর্তমানক্লাব : কলাবাগান ক্রিকেট একাডেমি
ব্যাটিংস্টাইল : ডানহাতি
বোলিং স্টাইল: ডানহাতি অফ স্পিনার
প্রিয়শট : কাভার ড্রাইভ
প্রিয়মানুষ: আম্মা-ভাইয়া
প্রিয়ক্রিকেটার : মাহমুদউল্লাহ ও বিরাট কোহলি
প্রিয়বন্ধু : ভাইয়া।
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত : অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় ম্যাচে ৫১ রান।
ছবি- সাজ্জাদ হোসেন।