ভালো নেই মুস্তাফিজ!

 

প্রত্যাশা ছিলো অনেক। কিন্তু বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) প্রত্যাশাটা স্পর্শ করতে পারেননি মুস্তাফিজুর রহমান। শনিবার বরিশাল বুলসের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ে তার দল ঢাকা ডায়নামাইটস।

নিজের পারফরমেন্স নিয়ে বিশেষ কোনও দুশ্চিন্তা না থাকলেও, মুস্তাফিজের মন খারাপ দল ছিটকে যাওয়ায়। ক্রিকেট থেকে আপাতত কিছুদিন দূরে থাকতে ২০ তারিখ নিজ বাড়ি সাতক্ষীরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবেন মুস্তাফিজ। তার আগে রবিবার কথা বললেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে। নিজের বিপিএল অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে এক বাক্যে বললেন, ‘মোটামুটি! খুব ভালো না। আবার খারাপও না।’

বিপিএল শুরু করার দিন, গত ২ ডিসেম্বর কুমিল্লার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সুসংবাদটা শুনেছিলেন মুস্তাফিজ। পুরো বাংলাদেশকে গর্বিত করে সেদিনই তিনি জায়গা করে নেন আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে দলে। কিন্তু এ খবর খুব বেশি শিহরণ তুলেনি তার ভেতর। শুধু বলেছিলেন, ‘ভালো লাগছে।’

 

রবিবার দুপুরে সেই কথাটা আবার বললেন মুস্তাফিজ। শুধু যোগ করলেন, ‘এই জায়গাগুলো অর্জন করা যতটা সহজ, রক্ষা করা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। আমি আমার এই সফলতা ধরে রাখতে চাই।’

 

এ দিন মুস্তাফিজের কাছে জানতে চাওয়া হলো কুমার সঙ্গাকারা সম্পর্কে। শ্রীলঙ্কান এই কিংবদন্তী বিপিএলে মুস্তাফিজের দল ঢাকা ডায়নামাইটসের অধিনায়ক ছিলেন। সাঙ্গাকারাকে নিয়ে মুস্তাফিজের দর্শনটা এ রকম- ভালো ক্রিকেটার হতে হলে ভালো মানুষ হতে হবে। মাঠের মতো বড় হতে হয় মাঠের বাইরেও। মুস্তফিজের এই উপলব্ধিটাই প্রমাণ করে শ্রীলঙ্কার গ্রেট কুমারা সাঙ্গাকারার সঙ্গে কতটা ভালো সময় কেটেছে তার।

 

মুস্তাফিজ বললেন, ‘টিমমেট হিসেবে সাঙ্গাকারা অনেক হেল্পফুল। মানুষ হিসেবেও তিনি চমৎকার। আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। কোনও ভুল হলেই শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বড় খেলোয়াড় তো এমনিতেই হয় না। সব দিকে ভালো হলেই কেবল বড় খেলোয়াড় হওয়া যায়!’

 

পাঠকরা হয়তো ভিমড়ি খেতে পারেন মুস্তাফিজ এমন গভীর কথাও বলতে পারেন! হ্যাঁ বিপিএল মুস্তাফিজকে আরও পরিণত করেছে। ক্রিকেট এবং ক্রিকেটের বাইরের মুস্তাফিজ এখন আগের চেয়ে একটু বেশিই পরিণত।

সাঙ্গাকারা বিশেষ কোনও পরামর্শ দিয়ে গেছেন কিনা জানতে চাইলে মুস্তাফিজ বলেন, আলাদাভাবে তেমন কোনও পরামর্শ দেননি। বোলিংয়ের সময় পরিস্থিতি বিবেচনা করে হয়তো কিছু বলেছেন। এর বাইরে আলাদা করে কিছু বলেননি।’

 

সব মিলেয়ে মুস্তাফিজের বিপিএল চমৎকার কাটতে পারতো, যদি না তার দল ঢাকা ডায়নামাইটস টুর্নামেন্ট থেকে বাদ হয়ে যেত। দল বাদ পড়ে যাওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে বিপিএলটা ভালোভাবে কাটিয়েও আক্ষেপে পুড়তে হচ্ছে মুস্তাফিজকে। বিপিএলে কাটানো সময় নিয়ে মুস্তাফিজ বলেন, ‘সবার সঙ্গে অনেক দুষ্টুমি করেছি। সাঙ্গাকারা আমাকে অনেক পছন্দ করতো; আমার সঙ্গে অনেক দুষ্টুমি করেছে। আসলে আমি সবার ছোট তো…! টুর্নামেন্টে আমরা ভালো ক্রিকেট খেলতে পারলে সময়গুলো আরও ভালোভাবেই যেত।’

 

সামনে ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের এশিয়া কাপ। এছাড়া মার্চে ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। এই ভাবনা নিয়েই মূলত বিপিএল আয়োজন। যা ক্রিকেটারদের কাজে লাগবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তবে মুস্তাফিজ এভাবে ভাবেননি। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে বোলিং করা তার ধাঁচে নেই। নির্দিষ্ট দিনে ব্যাটসম্যানদের উপর নিজের স্বাভাবিক অস্ত্রগুলো প্রয়োগ করেন মুস্তাফিজ।

 

শনিবার যেমন করেছেন ব্যাটিং দানব ক্রিস গেইলের বিপক্ষে। সফলও হয়েছেন। বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়েছেন নিজের প্রথম বলেই।

 

শনিবার ক্রিস গেইল মোট ১৯টি বল খেলেন। মুস্তাফিজর বল খেলেছেন মাত্র একটি এবং সেই এক বলেই মুস্তাফিজের কাছে হেরেছেন গেইল। মুস্তাফিজের বিষাক্ত স্লোয়ার বুঝে উঠার আগেই ব্যাটিং দানবের স্ট্যাম্প ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়! বিপিএলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্যই বোধহয় হয়ে গেছে সেটি!

 

কি পরিকল্পনা ছিল গেইলকে নিয়ে। প্রশ্নটা শুনেই কিছুটা বিরক্তির সুরে মুস্তাফিজ বললেন, ‘আমি কোনও পরিকল্পনা করে বোলিং করি না। চেষ্টা করেছি। শেষ পর্যন্ত হয়ে গেছে। আমি খুব খুশি। গেইল অনেক বড় খেলোয়াড়। তার উইকেট অনেক মূল্যবান ছিল। তাই ভালো লেগেছে। আসলে দল হারলে এইসব পারফরম্যান্সের কোনও মূল্য থাকে না।’

 

১০ ম্যাচে ১৪ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি বোলারের তালিকায় দশম স্থানে মুস্তাফিজ। পুরো টুর্নামেন্টেই ব্যাটসম্যানদের দেখা গেছে মুস্তাফিজের বোলিংয়ে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে খেলতে। রংপুর রাইডার্সের ব্যাটসম্যান জহিরুল ইসলাম কোনও প্রকার দ্বিধা না করেই বলেছেন, ‘আমি ব্যাটিংয়ে থাকতে ভেবেছি, মুস্তাফিজের বল যেন খেলা না লাগে। আমি খুব কাছ থেকেও বুঝতে পারিনি মুস্তফিজ কিভাবে গ্রিপ ধরে।’

 

শুধু দেশি নয়; বিদেশি অনেক ক্রিকেটারই মুস্তফিজের ভয়ঙ্কর ডেলিভারিগুলোর জয়গান করেছেন। বিষয়টি ভেবে কেমন লাগে জানতে চাইলে মুস্তাফিজ বলেন, ‘এগুলো শুনলে বা দেখলে ভালোই লাগে। এবার বিপিএলে অনেকেই আমাকে সমীহ করে খেলেছে। এই কারণেই হয়তো উইকেট কিছুটা কম পেয়েছি। এটা অবশ্যই আমাকে ভালো বোলিং করতে উৎসাহিত করবে। তবে ব্যাটসম্যানদের পরিকল্পনা নিয়ে আমি ভাবি না। আমার অধিনায়ক আমাকে যখন বল তুলে দেন; ওই সময় আমি আমার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি।’

মুস্তাফিজ তো এমনই- যা করবেন, তা বলবেন না। যা বলবেন, তাও তার রহস্য ভেদ করবে না!

 

/এমআর/