এভাবেও বীর হওয়া যায়, দেখালেন শতবর্ষী ক্যাপ্টেন মুর

শততম জন্মদিনে হাঁটছেন ক্যাপ্টেন মুরক্রিকেট তার ভালোবাসার একটা জায়গা। কখনও প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট  যদিও খেলেননি। যৌবনে ছিলেন মোটরবাইক রেসার, পদকও জিতেছেন। কিন্তু কখনও ভাবেননি ক্রিকেট তাকে এমন সম্মান দেবে। তার বয়সের ‘সেঞ্চুরি’ পূরণ হবার দিনে, ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সদস্যপদ পেলেন ইংল্যান্ড টেস্ট দলের।

সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল ভন ভিডিও বার্তায় শতবর্ষ পূরণ করা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক ক্যাপ্টেন টম মুরকে ইংল্যান্ড দলের সদস্যপদ দেন। আর ভিডিও লাইভে এসে সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক অ্যালেক স্টুয়ার্ট, অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস, অ্যালিস্টার কুক এবং বর্তমান অধিনায়ক জো রুট ইংল্যান্ড দলে ক্যাপ্টেন মুরকে পরিচয় করিয়ে দেন।

বলাই বাহুল্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারত ও তৎকালীন বার্মা ফ্রন্টে যুদ্ধ করা ব্রিটিশ সাঁজোয়া বাহিনীর এই ক্যাপ্টেনকে দেওয়া হয়েছে সম্মানসূচক (অনারারি) সদস্যপদ। অবশ্য কে কাকে প্রকৃতপক্ষে সম্মানিত করলো সেটি একটা প্রশ্ন বটে। মাইকেল ভন যেমন ভিডিওতেই বলেছেন, ‘এ পর্যন্ত ৬৯৫ জন পুরুষ এবং ১৬০ জন নারী ইংলিশ টেস্ট ক্রিকেট দলের স্পেশাল ক্লাবের সদস্য হয়েছেন। আমি খুব ভাগ্যবান যে ২০০৫ সালে অধিনায়ক হিসেবে অ্যাশেজ আর্ন হাতে তুলতে পেরেছি। এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারতো না। এবং আমরা সবাই ক্যাপ্টেন মুরকে আমাদের দলে স্বাগত জানাচ্ছি।’ ভনের পর অ্যালেক স্টুয়ার্ট বলেন, ‘ শুভ জন্মদিন ক্যাপ্টেন টম, ১০০ নট আউট।’ ইনস্টাগ্রামে ভন ক্যাপ্টেন টমের একটি ছবিসহ পোস্ট দিয়েছেন, ‘জাতির অধিনায়ক… দলে স্বাগত কর্নেল টম মুর।’ ক্যাপ্টেন টমের মাথায় ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্যাপ, আর সেটি তাকে পরিয়ে দিয়েছেন তার নাতি বেনজি ইনগ্রাম-মুর।

ভন ক্যাপ্টেন মুরকে জাতির অধিনায়ক বলছেন কেন? কারণ শততম জন্মদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই সৈনিক ব্রিটিশদের কাছে ইতিবাচক থেকে জীবনের জন্য লড়াই করার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন আর কেউ কখনও তা করেছে বলে লিখিত ইতিহাস জানাতে পারেনি।

করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে গোটা পৃথিবী এলোমেলো। যুক্তরাজ্য করোনাঘাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। সারাবিশ্বে করোনাভাইরাসে যখন প্রায় ২ লাখ মানুষ মারা গেছে, শুধু যুক্তরাজ্যেই মৃত্যু প্রায় ২০ হাজারের ওপরে, ক্যাপ্টেন টম ভাবলেন কোভিড-১৯ ভাইরাসের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়াই করা জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের (এনএইচএস) কর্মীদের সাহায্যে গঠিত ‘এনএইচএস চ্যারিটিজ টুগেদারে’র তহবিলে অর্থ জোগাবেন। ৬ এপ্রিল ঠিক করলেন তার বেডফোর্ডশায়ারের বাড়ির বাগানে ১০০ পাক হেঁটে অর্থ সংগ্রহ করবেন। তার এই ইচ্ছেটা সংবাদমাধ্যমে দারুণ প্রচারও পেলো।

প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল মাত্র ১০০০ পাউন্ড। প্রতিদিন ১০ পাক (এক পাকে ২৫ মিটার) করে হাঁটা শুরু করলেন চাকা লাগানো ধাতব ফ্রেমে ভর দিয়ে। ৩০ এপ্রিল ১০০তম জন্মদিনেই ১০০ পাক হাঁটা হয়ে গেল। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী তার তহবিলে জমা পড়লো ৩০ মিলিয়নেরও বেশি অর্থাৎ ৩ কোটি পাউন্ডের বেশি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা দাঁড়ায় ৩২০ কোটি ৫৩ লাখ ২২ হাজার ২২৯ টাকা। ব্যক্তিগতভাবে কোনও দাতব্য কাজে সংগৃহীত অর্থ হিসেবে বিশ্বরেকর্ড।

এমন জন্মদিন অনেকের জীবনে আসে না। তার জন্মদিন টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়েছে সরাসরি। হাঁটতে থাকা অবস্থায় তাকে গার্ড অব অনার দিয়েছেন ব্রিটিশ রয়্যাল আর্মির ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত দুটি হারিকেন ও স্পিটফায়ার যুদ্ধবিমান তার মেয়ের বাড়ির ওপর ( ছোট মেয়ে হ্যানা ইনগ্রাম-মুরের সঙ্গেই থাকেন) তার সম্মানে তিনবার ফ্লাইপাস্ট করেছে। তাকে ক্যাপ্টেন থেকে সম্মানসূচক কর্নেল পদে পদোন্নতি দিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ব্রিটেনের রাণী এলিজাবেথ প্রতিনিধি পাঠিয়ে নিজের হাতে স্বাক্ষর করা জন্মদিনের কার্ড পাঠিয়েছেন তাকে। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন রেকর্ডকৃত ভিডিও বার্তায় জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, ‘আমি জানি আমি যখন কথা বলছি পুরো জাতির হয়ে বলছি, আপনার ১০০তম জন্মদিনে আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই। আপনি আমাদের জীবনের একটি আলোকবিন্দু।’

এ পর্যন্ত ১ লাখ ৪৪ হাজার জন্মদিনের কার্ড পেয়েছেন। কার্ড এখনও আসছে এবং আসছেই।

জন্মদিনের আগেই একটা দ্বৈত অ্যালবাম বের করেছেন, ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন।’ তার সহশিল্পী মাইকেল বল। এটি দিয়েই সবচেয়ে বেশি বয়সে যুক্তরাজ্যের মিউজিক চার্টের শীর্ষে উঠে রেকর্ড করেছেন।   

এখনকার অন্ধকার সময়ে ক্যাপ্টেন টম মুরের এই বীরত্বব্যঞ্জক কাজের বন্দনা চলছে পৃথিবীজুড়ে।  শতবর্ষ দীর্ঘ জীবন পাওয়া সত্যিকারের এক বীর তিনি।