আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাকিবের এক দশক

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ বছরে পা দিলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। তার নাম দিয়েই নতুন করে বাংলাদেশকে চিনেছে ক্রিকেট বিশ্ব। ২০০৬ সালের ঠিক এই দিনে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে একদিনের ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন সাকিব আল হাসান। তখন হয়তো কেউই ভাবেইনি সেই সাকিব একদিন বিশ্বজয় করবেন!224013

জিম্বাবুয়ের হারারেতে সাকিবের আন্তর্জাতিক অভিষেক পর থেকে সবাই শুধু চেয়ে চেয়ে তার কীর্তি দেখে যাচ্ছেন। অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় তারকা হয়ে উঠেন মাগুরার এই ক্রিকেটার। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্রিকেটারদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে খেলার পাশাপাশি বাংলাদেশের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে বিদেশি লিগগুলোতে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে একমাত্র সাকিবেরই।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) পাশাপাশি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল), পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল), ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (সিপিএল), কাউন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, বিগ ব্যাশ টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। যেখানেই খেলেছেন বাংলাদেশকে পরিচিত করে এসেছেন নতুনভাবে।

শুধু খেলা নয় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে সামনে থেকে নেতৃত্বও দিয়েছেন তিনি। ২০০৯ সালে মোহাম্মদ আশরাফুল নেতৃত্ব হারালে অধিনায়কের দায়িত্ব পান বর্তমান অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। ওই সময়ে সহ-অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান সাকিব আল হাসান। কিন্তু ওই বছরে মাশরাফি ইনজুরিতে পড়লে অধিনায়কের দায়িত্ব চলে আসে সাকিবের উপর। কিন্তু শুরুটা ভালো হলেও, দিনে দিনে সাকিব ক্রিকেটীয় পারফরম্যান্স থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলেন। একই সঙ্গে নিজের অধিনায়কত্ব নিয়েও সন্তুষ্ট ছিলেন না সাকিব। তাই ২০১১ সালে ঘোষণা দিয়েই নেতৃত্ব ছাড়েন তিনি।169321

সবচেয়ে বেশিদিন বিশ্বের একনম্বর অলরাউন্ডারের র‍্যাংকিং ধরে রাখার পাশাপাশি সাকিবের অর্জনের খাতায় যোগ হয়েছে বাংলাদেশের অনেক ‘প্রথম ও দ্বিতীয়’ হওয়ার খেতাব। তার মধ্যে ওয়ানডেতে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ৪০০০ হাজার রান এবং টি-টোয়েন্টিতে দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ১০০০ রান সংগ্রহ করার গৌরব। শুধু তাই নয়, বিশ্বের দ্বিতীয় অলরাউন্ডার বাংলাদেশের সাকিব, যিনি ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে ১০০০ রানের সঙ্গে ৫০টি উইকেটও তুলে নিয়েছেন।

২০০৯ সালটি ছিলো সাকিবের জন্য অন্যতম স্মরণীয়। এ বছরই একসঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ‘ক্রিকেটার অব দ্য ইয়ার’, ‘টেস্ট প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’ এর জন্য মনোনীত হন।

অনেক সাফল্যের পরও কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য হয়েছিলেন সমালোচিত। ক্রিকেটে মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে সেই সব বিতর্কিত বিষয় নিয়ে হয়েছে অনেক আলোচনা। যার কারণে একবার নিষিদ্ধ হয়েছিলেন বাংলাদেশের বড় এই তারকা। ২০১৪ সালে সবধরণের ক্রিকেট থেকে থেকে ছয় মাসের জন্য নির্বাসিত করা হয় সাকিবকে। নিষেধাজ্ঞার কারণ ছিলো আচরণগত সমস্যা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষেধাজ্ঞার কারণে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাওয়া হয়নি তার। পরবর্তীতে সাকিব ইস্যুতে বৈঠক করে বিসিবি। ‘ইতিবাচক’ আচরণের পুরস্কার হিসেবে সেপ্টেম্বর থেকেই আবার ক্রিকেটে ফেরেন সাকিব।

২০০৬ সালের আগষ্টে হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় সাকিব আল হাসানের। অভিষেক ম্যাচে সাকিব ব্যাট হাতে ৩০ রানের পাশাপাশি বল হাতে ৩৯ রান খরচায় একটি উইকেট নিয়েছিলেন। একই বছর, একই দলের বিপক্ষে নভেম্বরে টি-টোয়েন্টি অভিষেক হয় সাকিবের। ওই ম্যাচে ২৬ রানের পাশাপাশি একটি উইকেট পকেটে পুরেছিলেন তিনি।Shakib-Al-Hasan-crying

জাতীয় দলের হয়ে রঙিন পোষাকে অভিষেকের এক বছর পর ২০০৭ সালে ভারতের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে অভিষেক হয় সাকিব আল হাসানের। টেস্টের অভিষকটা উল্লেখ্যযোগ্য হয়নি তরুণ সাকিবের। প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে ২৭ রান করেন তিনি। প্রথম ইনিংসে ১৩ ওভার হাত ঘুরালেও উইকেট শূন্য ছিলেন তিনি। অন্যদিকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট কিংবা বল কোনটাই করেননি সাকিব।

106314সাকিবের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

টেস্ট: ৪২ টেস্টে ৩৯.৭৬ গড়ে ২,৮২৩ রান করেছেন সাকিব। বল হাতে নিয়েছেন ১৪৭ উইকেট। ৩টি সেঞ্চুরির পাশাপাশি রয়েছে ১৯টি হাফসেঞ্চুরি। ২০১১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে ১৪৪ রান করেছিলেন তিনি। ওটাই তার সাদা পোষাকে সর্বোচ্চ স্কোর।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম টেস্টে ৩৬ রানে ৭ উইকেট নিয়েছিলেন সাকিব। এটাই তার সেরা বোলিং ফিগার। এছাড়া ১৪ বার ৫ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি একবার দশ উইকেট নিয়েছেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার।

ওয়ানডে: ১৫৭ ওয়ানডেতে ৩৫.১৮ গড়ে ৪,৩৯৮ রান করেছন সাকিব। বল হাতে নিয়েছেন ২০৬টি উইকেট। ৬টি সেঞ্চুরির পাশাপাশি রয়েছেন ৩০টি হাফসেঞ্চুরি। ২০০৭ সালে অ্যান্টিগায় কানাডার বিপক্ষে অপরাজিত ১৩৪ রান করেছিলেন সাকিব। ওটাই তার সর্বোচ্চ স্কোর।

গত বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটে ৫ উইকেট নেওয়ার গৌরব অর্জন করেন সাকিব। ওই ম্যাচে ৪৭ রান খরচায় ৫ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করেন তিনি। একবার ৫ উইকেট নিলেও ছয়বার তিনি ৪টি করে উইকেট নিয়েছেন।

টিটোয়েন্টি: ৫৪ টি-টোয়েন্টিতে ২৩.৯৭ গড়ে ১,১০৩ রান করেছেন সাকিব। কোন সেঞ্চুরি না থাকলেও রয়েছে ৬টি হাফসেঞ্চুরি। শিকার করেছেন ৬৫ উইকেট। ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাল্লেকেল্লেতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৮৪ রান করেন তিনি। ওটাই তার সর্বোচ্চ স্কোর।

চলতি বছর ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওমানের বিপক্ষে ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করেন সাকিব। ওই ম্যাচে ১৫ রান খরচায় তিনি ৪টি উইকেট নিয়েছিলেন। সাকিব এখন পর্যন্ত ৫ উইকেট না পেলেও তিনবার নিয়েছেন চারটি করে উইকেট।

/আরআই/এমআর/