রাকিবুল হাসানের মন জুড়ে ছিলো পেসার হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু শারীরিক গঠন ঠিক পেসারসুলভ না হওয়ায় তাকে স্পিনে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন কোচ। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর রাকিবুল মেনে নেন সেটাই। এরপর আর কখনোই পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। তার ছোট কাঁধেই এখন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বড় ভার।
সেখানে কিছুদিন অনুশীলনের পর বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলকে আবিষ্কার করা কোচ ওয়াহিদুল গনির অঙ্কুর ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন রাকিবুল। এ নিয়ে তার বাবা-মা যারপরনাই বিরক্ত ছিলেন। কিছুদিন তাই লুকিয়েই খেলতে হয়েছে । ‘ক্রিকেট খেলে কী হবে, পড়াশোনা মন দিয়ে করো’- এমন কথা শুনতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। সঙ্গে ছিলো বাবার হাতে 'উত্তম-মধ্যম' খাওয়ার ভয়ও।
সব ভয় ও বাঁধা ঠেলে অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় দলে ডাক পেয়ে যান রাকিবুল। সেই দলের হয়ে ময়মনসিংহ সফরে গিয়ে ভালোই খেলেন । এটাই সামনে এঁকে দেয় অবারিত আলোর রেখা। বাবা-মাও এখন ছেলের পাশে। আর তাতেই বড় স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন যুবদলের এই ক্রিকেটার। আপাতত রাকিবুলের চ্যালেঞ্জ স্পিন ভেলকিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলা। রংধনুর দেশেই কয়েকদিন বাদে শুরু হচ্ছে আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ।
আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৫ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনে। আজ থাকছে স্পিনিং অলরাউন্ডার রাকিবুল হাসানের একান্ত সাক্ষাৎকার−
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটের স্বপ্নটা কীভাবে বাসা বাঁধলো মনের মধ্যে?
রাকিবুল: ৯-১০ বছর বয়স থেকে বড় ভাইদের সঙ্গে টেপ টেনিস খেলতাম। স্কুলে ঠিকমতো যেতাম না। খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে ক্রিকেট নিয়েই মেতে থাকতাম। আমার বাসার পাশের মাঠ আর আমার স্কুলের মাঠে আমাদের বড় ভাইরা ম্যাট বিছিয়ে ক্রিকেট বলে ম্যাচ খেলতো। ভাবতাম, আমিও যদি মতো খেলতে পারতাম। এর বাইরে টিভিতে খেলা দেখতাম, তখনও স্বপ্ন দেখতাম ক্রিকেটার হবো।
বাংলা ট্রিবিউন: কতটা কঠিন ছিল ক্রিকেটার হওয়ার এই যাত্রাপথ?
রাকিবুল: ২০১২ সালের মাঝমাঝি আমি অনুশীলন শুরু করবো চিন্তা করেছিলাম। আমার কোচ ওয়াহিদুল গনি স্যারের সহকারী সোহেল ও জাহিদ ভাই আমাদের এলাকাতে থাকতেন। ওনার কাছে গিয়ে ভর্তি হওয়ার পরিকল্পনা করি। কিন্তু টাকা কোথায় পাবো? পরিবার তো কিছু জানে না। পরে পরিকল্পনা করলাম, প্রাইভেট টিউটরের একমাসের বেতন না দিয়ে ওই টাকা দিয়ে ভর্তি হবো। যেই ভাবা সেই কাজ। ভর্তি হয়েই পেস বোলিং করার জন্য রানআপ নিতে গেলাম। তখন ছোট ছিলাম, এতো লম্বা ছিলাম না। কোচ আমাকে বললন তুমি স্পিন বোলিং করো। ভাইদের কাছে তিন-চার মাস অনুশীলন করার পর ওয়াহিদুল গনি স্যারের অঙ্কুর ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হই ২০১৩ সালে। এরপর বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের পাশাপাশি প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ ও প্রিমিয়ার লিগেও কিছু ম্যাচ খেলেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: কোচিংয়ে ভর্তি হওয়ার পরও কি বাবা-মায়ের বকা-ঝকা শুনতে হয়েছে?
রাকিবুল: লুকিয়ে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি যখন বাবা মা জানলেন, আব্বু মারতে এলেন । যখন জানলেন আমি ভালো খেলছি, এলাকার লোকজন বলল আপনার ছেলে তো ভালো খেলছে, তাকে খেলতে দেন। ক্রিকেটে হয়তো ভালো কিছুই হতে পারবে। এরপর বাবা-মা যখন দেখলেন আমি বাইরে খেলতে যাচ্ছি, প্রথম সফর করলাম অনূর্ধ্ব-১৪ বিভাগরে হয়ে ময়মনসিংহে, ওখানে ভালো করার পর আমি তাদের পাশেই পেয়েছি।
বাংলা ট্রিবিউন: টাকা মেরে দেওয়া সেই গৃহশিক্ষকের সঙ্গে কি দেখা হয়?
রাকিবুল: বেতন মেরে দেওয়ার পর ওই স্যারের সামনে কখনোই আর যাইনি। আমি পড়তাম খিলগাঁও গভ: স্কুলে। আমি ওনার কাছে ইংরেজি ও অঙ্ক পড়তে যেতাম। স্যারের টাকা মেরে ক্রিকেটে ভর্তি হওয়ার ঘটনা মনে পড়লে আব্বু-আস্মু এখনও হাসেন।
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেট খেলতে এসে কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে?
রাকিবুল: ক্রিকেটের জন্য পড়ালেখাই বাদ দিয়ে দিয়েছি। ২-১ বছর আমার গ্যাপ গেছে। ২০১৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ দলে ছিলাম। তখন আমার এসএসসি দেওয়ার কথা ছিলো। সিএবির সঙ্গে তখন হোম সিরিজ খেলছিলাম। আমি স্ট্যান্ডবাই ছিলাম। স্ট্যান্ডবাই ক্যাম্পের জন্য আমি পরীক্ষা দিইনি। তখন ভাবছিলাম আমি হযতো যেকোনও সময় ডাক পাবো ।ফলে আমার সেবার এসএসসির টেস্ট পরীক্ষা দেওয়া হয়নি।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার আইডল কে?
রাকিবুল: ছোটবেলায় অনেকের খেলা ভালো লাগতো। যুবরাজ সিংকে ভালো লাগতো। তার ব্যাটিং, ফিল্ডিং অনেক ভালো লাগতো। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতেও শুরু করলাম। তখন সাকিব আল হাসান ও রবীন্দ্র জাদেজার খেলা ভালো লাগা শুরু করে। তাদের বোলিং, ফিল্ডিং, ব্যাটসম্যানদের রিড করা, গেম সেন্স এগুলো খুব ভালো। ফলে তাদের আইডল মেনেই আমি এগিয়ে যাচ্ছি।
বাংলা ট্রিবিউন: আফগানিস্তনের সঙ্গে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ বৃষ্টির কারনে খেলতে পারলেন না। দলের প্রস্তুতি কেমন?
রাকিবুল: গত ৮-১০ মাসে আমরা অনেক ম্যাচ খেলেছি। হয়তো এই প্রস্তুতি ম্যাচ দুটি খেলতে পারলে ভালো হতো। আমাদের এমনিতে দুটো ম্যাচ আছে। তা ছাড়া ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড গিয়ে সেখানে আমরা ভালো ফল করেছি । ওখানে খেলার অভিজ্ঞতাটা দক্ষিণ আফ্রিকায় কাজে দেবে। ওভারঅল আমাদের প্রস্তুতি খুব ভালো। ব্যাটসম্যানরা ভালো টাচে আছে, বোলাররা ভালো জায়গায় বোলিং করছে। বিশ্বকাপে আমরা আমাদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারলেই হলো।
বাংলা ট্রিবিউন: স্পিনিং অলরাউন্ডার হিসেবে লোয়ার অর্ডার ব্যাটিংয়ের প্রস্তুতি কেমন আপনার?
রাকিবুল: দুটি এশিয়া কাপেই এমন হয়েছে। শেষের ব্যাটসম্যানরা হয়তো চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত পারেনি। আমাদের প্ল্যান আছে, যদি কোনও সেট ব্যাটসম্যান ক্রিজে থাকে বোলারদের তাদের সাপোর্টিং রোল প্লে করে ব্যাটিং করতে হবে। হয়তো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আমরা পারিনি। বড় দুটি টুর্নামেন্টে এমন হয়েছে। এই ভুল থেকে আমরা শিখেছি। বিশ্বকাপে এমন পরিস্থিতি হলে আশা করি আর ভুল হবে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তুত আছি।
বাংলা ট্রিবিউন: জানেন তো দক্ষিণ আফ্রিকায় স্পিনারদের জন্য সাফল্য পাওয়া কঠিন?
রাকিবুল: ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে স্পিনারদের ভূমিকা হচ্ছে পেসারদের সাপোর্ট দেওয়া। আমি স্পিনার হিসেবে সেই দায়িত্বই পালন করতে চাই। সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছি।
বাংলা ট্রিবিউন: কিছুদিন তো অনুশীলন করলেন, কন্ডিশন সম্পর্কে কেমন ধারনা পেলেন।
রাকিবুল: আবহাওয়া গরম। খেলতে পারলে ভালো করে বুঝতে পারতাম। এখন পর্যন্ত কঠিন মনে হচ্ছে না। বিশ্বকাপের আগে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে পারলে আশা করি সবকিছু আমাদের অনুকূলেই থাকবে।
নাম: রাকিবুল হাসান
ডাকনাম: রাকিব
জন্ম: ৯ সেপ্টেম্বর ২০০২
জন্মস্থান: রূপসি, কুড়িপাড়া, ময়মনসিংহ
উচ্চতা: ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি
পড়াশোনা: এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষ
প্রথম ক্লাব: অঙ্কুর ক্রিকেট একাডেমি
বর্তমান ক্লাব: শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাব
ব্যাটিং স্টাইল: বাঁহাতি
প্রিয় শট: স্কুপ
বোলিং স্টাইল: বাঁহাতি স্পিনার
প্রিয় ডেলিভারি: আর্ম বল
প্রিয় মানুষ: মা
প্রিয় ক্রিকেটার: সাকিব আল হাসান ও রবীন্দ্র জাদেজা
প্রিয় বন্ধু: সাকিব ও আরিফ
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: গত বছর এশিয়া কাপ খেলার পর শ্রীলঙ্কা সিরিজ চারদিনের ম্যাচে প্রথম ইনিংসে দুটি, পরের ইনিংসে ৭ উইকেট নেওয়া।
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন।