টপ অর্ডারের যে অবস্থা হয়েছিল, তাতে শঙ্কার মেঘ জমাট বাঁধে। তবে লিটন দাস নিজের স্বভাববিরুদ্ধ ব্যাটিংয়ে সময়োপযোগী এক ইনিংস খেললেন। দীর্ঘদিন রান খরায় ভোগা এই ওপেনার প্রয়োজনের সময়েই ফিরলেন চেনা ছন্দে। ‘প্রিয়’ প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়েকে সামনে পেয়ে তুলে নিলেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেঞ্চুরি। আর তার সেই ইনিংসটাতেই বাংলাদেশ পেলো লড়াই করার মতো পুঁজি।
হারারের প্রথম ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৯ উইকেটে ২৭৬ রান করেছে বাংলাদেশ। তামিম ইকবাল-সাকিব আল হাসানদের ব্যর্থতার ভিড়ে একপ্রান্ত আগলে রেখে লিটন খেলেছেন ১০২ রানের ঝলমলে ইনিংস। শেষ দিকে আফিফ হোসেনের (৩৫ বলে ৪৫) ঝড় ও মেহেদী হাসান মিরাজের (২৫ বলে ২৬) কার্যকর ব্যাটিংয়ের আগে মাহমুদউল্লাহর (৫২ বলে ৩৩) লড়াকু ব্যাটিং বাংলাদেশের ইনিংসের হাইলাইটস।
দলীয় রান ০, তামিমও ০
বাংলাদেশের শুরুটা একেবারেই ভালো ছিল না। তামিম ইকবাল নিজেই বলেছিলেন, হারারে স্পোর্টস ক্লাবের উইকেটে প্রথম এক ঘণ্টা হবে ব্যাটসম্যানদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। তো টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামার পর থেকে সংগ্রাম করতে থাকেন তিনি। তবে সেটা কাটিয়ে উঠতে পারলেন না বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক।
রানের খাতা খোলার আগেই আউট হয়ে গেছেন তামিম। দলীয় স্কোরে কোনও রান যোগ হওয়া আগে প্যাভিলিয়নে ফিরেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। ব্লেসিং মুজারাবানির লাফিয়ে ওঠা বেশ বাইরের বল কাট করতে চেয়েছিলেন তামিম। কিন্তু বল তার ব্যাটের কানায় লেগে জমা পড়ে উইকেটকিপার রেগিস চাকাভার গ্লাভসে। তিনি যখন আউট হন, ২.১ ওভার খেলা হলেও বাংলাদেশের স্কোরের ঘর ছিল শূন্য।
আগ্রাসী মনোভাব কাল হলো সাকিবের
চাপ নিয়ে খেলতে একেবারেই পছন্দ না সাকিব আল হাসানের। তাই তামিম ইকবাল দ্রুত আউট হওয়ার পরই স্বভাবসুলভ ব্যাটিং করেন শুরু। তবে পরিস্থিতির দাবি না মিটিয়ে একটু যেন বেশিই আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে খেলছিলেন তিনি। আর সেটাই কাল হলো তার!
আউট হয়ে গেছেন সাকিব। তার ব্যাট রানে ফেরার ইঙ্গিত দিলেও বেশি দূর যেতে পারেননি। ১৯ রান করে প্যাভিলিয়নে ফিরেছেন তিনি। আগের ওভারের শেষ বলে জোরে ব্যাট চালিয়েছিলেন, বলে না লাগায় ক্ষোভও ঝারেন শূন্যে ব্যাট আঘাত করে। ওই ওভারের শেষে নতুন ওভারে নিজের মুখোমুখি প্রথম বলে আবারও শট খেললেন, এবার ধরা পড়লেন কভারে।
ব্লেসিং মুজারাবানির দ্বিতীয় শিকার হয়েছেন সাকিব। অফ-স্টাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে কভারে ক্যাচ দেন রায়ান বার্লের হাতে। ২৫ বলের ইনিংসটি তিনি সাজান ৩ বাউন্ডারিতে।
হতাশ করলেন মিঠুন-মোসাদ্দেক
ব্যক্তিগত কারণে জিম্বাবুয়ে থেকে দেশে ফিরে না এলে ওয়ানডে সিরিজে চার নম্বরে ব্যাটিং করতেন মুশফিকুর রহিম। গত কয়েক বছর এই পজিশনেই বেশি ব্যাট করেছেন তিনি। মুশফিক না থাকায় পজিশনে প্রমোশন পেয়ে চারে নামলেন মোহাম্মদ মিঠুন। তবে এই উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানের অভাব পূরণ করতে পারলেন কই!
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারের প্রথম ওয়ানডেতে ভালো শুরুর ইঙ্গিত দিয়েও মিঠুন লম্বা করতে পারেননি ইনিংস। ১৯ বলে ৪ বাউন্ডারিতে ১৯ রান করে সাজঘরে ফিরে গেছেন এই ব্যাটসম্যান। টেন্ডাই চাতারার বল তার ব্যাট ছুঁয়ে উইকেটকিপার রেগিস চাকাভার গ্লাভসে জমা পড়ে।
মিঠুনের বিদায়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ আরও বাড়ে। খানিক পর অবস্থা আরও খারাপ হয় মোসাদ্দেক হোসেনের বিদায়ে। রিচার্ড এনগারাভার শিকার হয়ে মাত্র ৫ রানে ফিরে যান মোসাদ্দেক। তার বিদায়ে ৭৪ রানে সফরকারীরা হারায় চতুর্থ উইকেট। তার আগে সুবিধা করতে পারেননি তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান।
ভাঙলো মাহমুদউল্লাহর প্রতিরোধ
টপ অর্ডারের ব্যর্থতায় অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহ দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। একটু একটু করে ইনিংসের ভিত গড়ে আশা জাগাচ্ছিলেন। এমনকি ক্রিজে সেটও হয়ে গিয়েছিলেন এই ব্যাটসম্যান। তবে বেশি দূর যেতে পারেননি। তার প্রতিরোধ ভেঙে উৎসব করেছে জিম্বাবুয়ে।
হারারের প্রথম ওয়ানডেতে মাহমুদউল্লাহ ৩৩ রানে আউট হয়েছেন। লুক জংউইয়ের বলে ধরা পড়েছেন উইকেটকিপার রেগিস চাকাভার গ্লাভসে। বড় ইনিংসে সম্ভাবনা জাগিয়েও আউট হয়ে যাওয়া মাহমুদউল্লাহ ৫২ বলের ইনিংসে নেই কোনও বাউন্ডারি, তবে মেরেছেন একটি ছক্কা।
জিম্বাবুয়ে পেয়েই জ্বলে উঠলেন লিটন
করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে রানের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন লিটন দাস। তিন ওয়ানডেতে পেয়েছিলেন দুই সেঞ্চুরি। এরমধ্যে একটি আবার বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রানের (১৭৬) ইনিংস। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে যেন রান করা ভুলেই গিয়েছিলেন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান! অবশেষে সেই জিম্বাবুয়েকে পেয়েই আবার সেঞ্চুরি পেলেন লিটন। যদিও শতক ছোঁয়ার পরপরই ফিরেছেন সাজঘরে।
ইনিংসের শুরু থেকেই অস্বস্তি নিয়ে ব্যাটিং করেছেন লিটন। যদিও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি কাটিয়ে উঠেছেন। ৭৮ বলে হাফসেঞ্চুরির দেখা পাওয়া লিটন পরের ৫০ করেছেন ৩২ বলে। সব মিলিয়ে ১১০ বলে ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেঞ্চুরির মাইলফলকে পৌঁছান এই ব্যাটসম্যান। পুরো ইনিংসে তার ডটবলের সংখ্যা ছিল ৪৫টি। ৮ বাউন্ডারিতে তিনি সেঞ্চুরির দেখা পান। রিচার্ড এনগারাভার বলে আউট হওয়ার আগে ১১৪ বলে করেন ১০২ রান।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডেতে ৩১১ রান করেছিলেন লিটন। হারারের ওয়ানডের আগের ৮ ম্যাচে লিটনের সর্বোচ্চ রান ছিল ২৫। এরমধ্যে তিনবার রানের খাতা না খুলেই আউট হয়েছেন এই টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান। শুধু ওয়ানডে ফরম্যাটেই নয়, বাকি দুই ফরম্যাটেই এমন অবস্থায় ছিলেন লিটন। তারপরও টিম ম্যানেজমেন্ট লিটনের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। দলের কঠিন অবস্থায় বেশ ভালো করেই আস্থার প্রতিদান দিলেন তিনি।
মুজারাবানির শুরুর ছোবল
টেস্ট সিরিজেও শুরুতে বাংলাদেশের ওপর ছোবল বসিয়েছেন ব্লেসিং মুজারাবানি। ওয়ানডেও ঠিক তা-ই। বাংলাদেশের হারানো প্রথম ২ উইকেট তার। যেনতেন উইকেট নয়, ফিরিয়েছেন তামিম-সাকিবকে। ১০ ওভারে ৪৭ রান দিয়ে তার শিকার ২ উইকেট। তবে সংখ্যার বিচারে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন জংউই। ৯ ওভারে ৫১ রান দিয়ে নিয়েছেন ৩ উইকেট। আর এনগারাভা ১০ ওভারে ৬১ রান খরচায় নেন ২ উইকেট।