বিশ্বকাপ জেতা সাকিব চ্যালেঞ্জটা নিচ্ছেন আবার

সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের তিলকচানপুর গ্রামে জন্ম তানজিম হাসান সাকিবের। প্রথম শ্রেণিতে থাকতে টেপ টেনিসে হাতে খড়ি হলেও ক্রিকেট বলে খেলা শুরু ষষ্ঠ শ্রেণিতে। একবার মায়ের আবেগ কাজে লাগিয়েই চট্টগ্রামে এক মাসের ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। সেখানে তার প্রতিভার ঝলক দেখে অভিভূত হন ক্যাম্প কমান্ড্যান্ট কোচ মোহাম্মদ কায়সার আহমেদ। তার পর সাকিবের প্রতিভার কথা শুনিয়ে ব্যবসায়ী বাবা গৌউস আলীর মন গলানোর চেষ্টা করেন তিনি। তাতেই কপাল খুলে যায় সাকিবের। একটা সময় সাকিব বাবা-মাকে ক্রিকেট খেলতে দেওয়ার জন্য নানা ভাবে বোঝাতেন, সেই তারাই এখন সাকিবের অনুপ্রেরণার উৎস। ২০২০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জেতার পর তো ছেলেকে নিয়ে আরও স্বপ্ন দেখতে থাকেন তারা- কবে শফিউল-মাহমুদুল-শামীমদের মতো জাতীয় দলে খেলবে সাকিব!

পেসার হলেও বাংলাদেশ দলের উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম ও ভারতের সাবেক অধিনায়ক মাহেন্দ্র সিং ধোনির ভীষণই ভক্ত সাকিব। তাদের মতোই দায়িত্বশীল ক্রিকেটার হতে চান। টপ অর্ডারের ব্যর্থতায় মুশফিক-ধোনি যখন দলের হাল ধরেন, সেটি ভীষণ অনুপ্রাণিত করে তাকে। তবে ব্যাট হাতে দুই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানের পরিশ্রম ও ক্রিকেট এথিকসে মুগ্ধ হলেও বল হাতে সাকিব অনুসরণ করেন পেসার ডেইল স্টেইনকে।

সেই প্রেরণা নিয়েই আরেকটি যুব বিশ্বকাপের মঞ্চে নামছেন। গত দুই বছরে বড়দের সঙ্গে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের পাশাপাশি প্রিমিয়ার লিগ খেলেছেন। গত দুই বছর অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ করেছেন বড়দের সঙ্গে খেলে। এখন অভিজ্ঞ এই পেস বোলিং অলরাউন্ডার নির্ভার থেকেই বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য তুলে আনতে বদ্ধপরিকর। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তার বোধ স্পষ্ট- পারফরম্যান্সের বিকল্প নেই।

আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৭ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনে। আজ  (বৃহস্পতিবার) থাকছে পেস বোলিং অলরাউন্ডার তানজিম হাসান সাকিবের একান্ত সাক্ষাৎকার -

বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটে এলেন কীভাবে?

সাকিব: প্রথম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় ক্রিকেটের সঙ্গে আমার পরিচয়। মহল্লায় বড়দের সঙ্গে টেপ টেনিস দিয়ে শুরু। স্থানীয় মাঠে এলাকার বড় ভাইদের সঙ্গে মজা করে ক্রিকেট খেলতাম। এরপর পঞ্চম শ্রেণিতে থাকতে আমাদের এক আত্মীয় জাকির হাসান (জাতীয় দলের ক্রিকেটার) বিকেএসপিতে ভর্তি হন। তখন থেকে আমারও বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন। ভাবতাম বিকেএসপিতে গেলেই শুধু ক্রিকেট খেলা যায়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর থেকেই বিকেএসপিতে ভর্তির ট্রায়ালের খোঁজখবর রাখতাম। কিন্তু একবার মিস হয়ে যায়। অবশেষে নবম শ্রেণিতে উঠে বিকেএসপিতে ভর্তি হই।

বাংলা ট্রিবিউন: বিকেএসপিতে ভর্তি হতে পরিবারের সহযোগিতা কেমন পেয়েছেন?

সাকিব: বাবা-মাকে অনেক বোঝাতে হয়েছে। পরিবারের সবাই শুধু পড়াশোনা করতে বলতো। কেউই চাইতো না ক্রিকেট নিয়ে থাকি। ২০১৫ সালের দিকে যখন এক মাসের জন্য চট্টগ্রামে ক্যাম্প করতে যাই, মা আমাকে যেতেই দিচ্ছিলেন না। আব্বু বিদেশে ছিলেন, তখন আম্মুকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করে ক্যাম্পে যাই। ক্যাম্পের শেষ দিকে আব্বু দেশে ফিরে আমাকে আনতে চট্টগ্রামে আসেন। কোচ কায়সার স্যারের (কায়সার আহমেদ) সঙ্গে আব্বুর কথা হয়। স্যারের কথায় আব্বু ইমপ্রেসড হওয়াতেই আর সমস্যা হয়নি।

বাংলা ট্রিবিউন: গত দুই বছরে বড়দের সঙ্গেও ক্রিকেট খেলেছেন। সাকিবের মধ্যে বাড়তি কী পরিবর্তন এসেছে?

সাকিব: গত দুই বছরে অনেক বেশি মানসিক শক্তি বেড়েছে। এক বছরের ইনজুরি অনেক বেশি শিক্ষা দিয়ে গেছে আমাকে। ইনজুরি থেকে ফেরার পর মাথায় এটা ছিল না যে, আমি ইনজুরিতে ছিলাম। শুথু মাথায় রেখেছি, আমি আগের অবস্থাতেই আছি। এক বছরে চলে গেছে- এটা ভাবতে গেলে নেতিবাচক ভাবনা মাথায় চলে আসতো।

বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বকাপ দিয়ে আপনার বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের ধাপ শেষ হচ্ছে। নিজেকে কত তাড়াতাড়ি জাতীয় দলে দেখতে চান?

সাকিব: আমি ওভাবে কখনও চিন্তা করি না যে, কালকেই জাতীয় দলে ঢুকবো কিংবা এক বছরের মধ্যে জাতীয় দলে খেলবো। আমার চিন্তাটা এভাবে থাকে- কালকে আমি যে জায়গায় খেলবো, সেখানে যেন সেরাটা দিতে পারি। ওই লক্ষ্যটুকু বাস্তবায়ন করতে পারলেই খুশি। যদি এভাবেই ভালো খেলতে থাকি, এক সময় ডাক পাবোই। আমার ভাবনাটা একেবারেই সাধারণ।

বাংলা ট্রিবিউন: একটা সময়তো বাবা-মাকে বুঝিয়ে ক্রিকেটে আসতে হয়েছিল, এখন তারা কী বলে?

সাকিব: তাদের চিন্তা ভাবনাতে অনেক আগেই পরিবর্তন এসেছে। তবে যুব বিশ্বকাপ জেতার পর এখন আরও বেশি পরিবর্তন এসেছে। এখন আমাকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করেন আমার বাবা-মা। অনেক ক্ষেত্রে আমাকে পুশ করেন- এটা করো, ওটা করো। আম্মুতো শুরু থেকেই আমার জন্য অনুপ্রেরণার নাম। আমার খারাপ সময়ে, আম্মুর কথা মনে করে অনুপ্রেরণা খুঁজে নেই। আমার যখনই খেলা থাকে, এক সেকেন্ডের জন্য আম্মু টিভির সামনে থেকে উঠে না। এমনকি লাঞ্চ ব্রেকের সময়ও না।

বাংলা ট্রিবিউন: মা-বাবা নিশ্চয়ই অপেক্ষায় আছেন, কবে সাকিব জাতীয় দলে খেলবে?

সাকিব: সেটাতো সব বাবা-মাই করেন। আমিতো বললাম, আমার ভাবনা সাধারণ। যদি ভাবি আমাকে আগামী বছর জাতীয় দলে সুযোগ পেতে হবে, তাহলে এই ভাবনা আমার কোনও কাজে আসবে না। মূলত আমার যেটা কাজ সেটাই করতে হবে। অবশ্যই প্রসেসের মধ্যে থাকলে সুযোগ আসবেই। আমারও চেষ্টা থাকবে বাবা-মাকে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার খবরটি তাড়াতাড়ি দেওয়ার।

বাংলা ট্রিবিউন: এই দলের অন্যতম সিনিয়র ক্রিকেটার আপনি। যুব বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জটা কতখানি?

সাকিব: এটা অবশ্যই বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জটাকে খুব কঠিন ভাবে নিচ্ছি না। একটি বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা আমার আছে, ওই বিশ্বকাপে আবার চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলাম। দলের কম্বিনেশনের কথা চিন্তা করে আমাকে আর রাকিব ভাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অবশ্যই আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে চেষ্টা করবো দলকে সর্বোচ্চ সাফল্য এনে দিতে। আমাদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করবো, চেষ্টা থাকবে টিম ম্যানেজমেন্টের প্রত্যাশা পূরণ করার। তবে অতিরিক্ত কোনও চাপ নিচ্ছি না। নির্ভার থেকেই আগের মতো ক্রিকেট খেলবো। আর এটা করতে পারলে অবশ্যই ভালো কিছু সম্ভব।

বাংলা ট্রিবিউন: টপ অর্ডারের ব্যাটিং নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা আছে। সব মিলিয়ে দলের ব্যাটিং শক্তি কেমন?

সাকিব: আপনি যদি লক্ষ্য করেন নাবিল (প্রান্তিক নওরোজ) দারুণ ফর্মে আছে। ভারত সিরিজে রান পেয়েছে, এশিয়া কাপেও ভালো যাচ্ছে। দলের জন্য এটা দারুণ স্বস্তির। এছাড়া আমাদের লোয়ার অর্ডারও দারুণ শক্তিশালী। বেশ কয়েকজন আছে, যারা পাওয়ার হিটিং করতে পারে। ওপেনিংয়ে কিছুটা সমস্যা ছিল, এখন কেটে গেছে। রবিন (মাহফিজুর ইসলাম) ফর্মে আছে। আমার মনে হয় না ব্যাটিং নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ আছে।

বাংলা ট্রিবিউন: ভারতে সৌরভ গাঙ্গুলীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে?

সাকিব: আসলে উনি খুব ব্যস্ত ছিলেন। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এসে আমাদের প্রশংসা করেছেন। বাড়তি কিছু আলাপ করার সুযোগ হয়নি। তবে উনি আমাদের সবাইকে বলেছেন- তোমরা খুব ভালো করেছে, অনেকদূর যাবে।

বাংলা ট্রিবিউন: বিজয় দিবসে বোর্ড প্রধান নাজমুল হাসান পাপন আপনাদের সঙ্গে আলাপ করেছেন। বিশেষ কোনও বার্তা দিয়েছেন?

সাকিব: বিশেষ কিছু না। উনি আমাদের বলেছেন, একবারতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছো। তোমাদের ওপর মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকবে। আমরা যেন বাড়তি কোনও চাপ না নেই। চাপবিহীন ভাবে যেন নিজেদের সেরা ক্রিকেটটা খেলি।

বাংলা ট্রিবিউন: ঠিক কী কারণে মুশফিক-ধোনিকে অনুসরণ করেন?

সাকিব: মুশফিক ভাই, মাহেন্দ্র সিং ধোনিকে ভালো লাগে। তাদের ব্যক্তিত্ব, কঠোর পরিশ্রম, ক্রিকেট এথিকস- আমাকে মুগ্ধ করে। আমি তাদের মতো পরিশ্রমী ক্রিকেটার হতে চাই। এরকম দায়িত্ব নিয়ে বোলিং করতে চাই। তাদের মতো সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করতে চাই।

প্রোফাইল

নাম: তানজিম হাসান

ডাক নাম: সাকিব

মা: সেলিনা পারভিন

বাবা: গৌউস আলী

জন্ম: ২০ অক্টোবর ২০০২

জন্মস্থান: সিলেট

উচ্চতা: ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি

লেখাপড়া: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী

প্রথম ক্লাব: বিকেএসপি

বর্তমান ক্লাব: আবাহনী

ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি

বোলিং স্টাইল: ডানহাতি

প্রিয় ডেলিভারি: আউটসুইং

প্রিয় মানুষ: মা-বাবা

প্রিয় ক্রিকেটার: ডেইল স্টেইন, মহেন্দ্র সিং ধোনি ও মুশফিকুর রহিম

ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত:  অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জেতা