দিন-তারিখ ঠিক মনে নেই তার, তবে সময়টা ২০১২ সালেই। এক দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বাবা আব্দুল আলিম শেখ বিশ্রাম করছিলেন। স্কুল থেকে ফিরে বাবার রুমে চলে গেলেন। বাবার হাত ধরে আবদার করে বসেন ক্লাস ফাইভে পড়া মেহরাব হোসেন, ‘আমি সাকিব-তামিম ভাইদের মতো ক্রিকেটার হতে চাই।’ সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার আব্দুল আলিম ছেলেকে অভয় দিয়ে বলেন, ‘ঠিক আছে বিকালে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছি।’ ক’দিন পরই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আব্দুল আলিম চলে যান রাজশাহীর ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে।
১০ বছরের মেহরাবকে দেখে খুব একটা পাত্তা দেননি একাডেমির কোচেরা। অনুশীলনের প্রথম দিনে ব্যাট-বল কিছুই হাতে পাননি। টেপ টেনিস বলে ক্যাচিং দিয়ে মেহরাবের ক্রিকেটে হাতেখড়ি। তবে একদিন পরই কোচেরা বুঝে যান মেহরাব প্রতিভাবান। রাজশাহী ক্লেমন ক্রিকেটের একাডেমির কোচ আরেফিন চৌধুরী তুষার ক্রিকেট বলেই অনুশীলন শুরু করতে বলেন। সেই শুরু, এরপর শুধুই এগিয়ে যাওয়া। শুরুতে ছিলেন কেবল অফ স্পিনার। ম্যাচে তো দূরে থাক, নেটেও খুব একটা ব্যাট করার সুযোগ পেতেন না। তবে ২০১৪ সালে গাজী টায়ার্স ক্রিকেট হান্টে সুযোগ পেয়ে সাকিব আল হাসানের শৈশবের কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে পেয়ে ভাগ্য খুলে যায় তার। ওখানেই নিজের ব্যাটিং সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে ব্যাটিং অলরাউন্ডার হয়ে ওঠেন।
ছোট্ট এই ক্যারিয়ারে মেহরাবকে ভাগ্য সঙ্গ দিয়েছে আরও। ২০২০ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ব্যাকআপ হিসেবে ছিলেন মেহরাব। শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকা যেতে না পারলেও মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীর ইনজুরি শেষ মুহূর্তে বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে দেয়। কোনও ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়নি, তবে বিশ্বকাপ জেতা ক্রিকেটার হিসেবে নামটা খোদাই করে নিয়েছেন। সেই মেহরাব এখন আরও বেশি পরিণত। রাকিবুল হাসান এবারের যুব দলে যোগ দেওয়ার আগে তার হাতেই ছিল অনূর্ধ্ব-১৯ দলের দায়িত্ব। আসন্ন বিশ্বকাপে এই অলরাউন্ডার ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগে অবদান রাখতে মুখিয়ে।
আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৭ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনে। আজ (শুক্রবার) থাকছে ব্যাটিং অলরাউন্ডার মেহরাব হোসেনের একান্ত সাক্ষাৎকার-
মেহরাব: ক্রিকেটের প্রতি ছোটবেলা থেকেই বাড়তি ঝোঁক ছিল। টিভিতে তামিম-সাকিব ভাইদের খেলা খুব পছন্দ করতাম। ২০১২ সাল হবে, আমি একদিন স্কুল থেকে ফিরে বাবাকে বলি, আব্বু আমি তামিম ভাই, সাকিব ভাইদের মতো ক্রিকেটার হবো। আব্বুকে বলার পর ভয়ে ছিলাম, বকা দেয় কিনা। কিন্তু আব্বু আমাকে বললো, ‘ঠিক আছে আমি বিকালে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসবো।’ আব্বুর কথা শুনে আমার মনে সে কী আনন্দ। ক’দিন পরই আব্বু আমাকে রাজশাহী ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসে। ভর্তি হওয়ার পর প্রথম অনুশীলনে আমাকে টেপ টেনিস বল দিয়ে টেনিস ব্যাটে ক্যাচিং করায়। ছোটবেলা থেকে আমি বল ভালো ধরতাম, থ্রো ভালো করতাম। ফলে ক্যাচিং অনুশীলনেও ভালো করি। ওখানে ভালো করার পর, কোচ বললেন, ‘তুমি এই গ্রুপে অনুশীলন করো।’ একদিন অনুশীলন করার পর আরেফিন চৌধুরী তুষার স্যার আমাকে ক্রিকেট বলে অনুশীলন করতে বললেন।
বাংলা ট্রিবিউন: প্রথমবার নাকি অনূর্ধ্ব-১৪ দলে সুযোগ হয়নি?
মেহরাব: প্রথম বছর অনূর্ধ্ব-১৪ দলে সুযোগ পাইনি। লাইনআপে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু আমি ছোট বলে বাদ দিয়ে দেয়। আশাহত হয়েছিলাম। পরে তুষার স্যার আমাকে অনুপ্রাণিত করেন। পরেরবার সুযোগ হয়ে যায়। এভাবেই পর্যায়ক্রমে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের ধাপগুলো পেরিয়ে এসেছি। ২০২০ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ ব্যাকআপ দলে ছিলাম। ওই বছর মৃত্যুঞ্জয়ের ইনজুরিতে শেষ মুহূর্তে দক্ষিণ আফ্রিকা যাই।
বাংলা ট্রিবিউন: অফ স্পিনার হিসেবে আপনার ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু। পরে অলরাউন্ডার হলেন কী করে?
মেহরাব: আমি অফ স্পিনার হিসেবে অনুশীলন শুরু করি। ব্যাটিং পারলেও সেটি শখের বসেই করতাম। নিজের ব্যাটিং সম্পর্কে আসলে ধারণা ছিল না। ভাবতাম, মজা লাগছে করি। শুধুমাত্র শখের বসেই করতাম। আমি যেহেতু বোলার, সেই কারণে ব্যাটিং অনুশীলনে সুযোগ পেতাম না। ২০১৪ সালে গাজী টায়ার্স ক্রিকেট হান্টে সুযোগ পাই। ওখানেই সালাউদ্দিন স্যার (মোহাম্মদ সালাউদ্দিন) আমাকে ব্যাটিংয়ের সুযোগ করে দেন। আমার ব্যাটিং উনার বেশ পছন্দ হয়েছিল। এরপর থেকেই মূলত আমি ব্যাটিং অলরাউন্ডার হয়ে যাই। এমনিতে ছোটবেলা থেকে আমার বেসিক খুব ভালো ছিল। দেড় বছরের মতো সালাউদ্দিন স্যারের সঙ্গে ব্যাটিং নিয়ে কাজ করেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: পরিবারের সমর্থন শুরু থেকে পেয়েছেন। তাদের অনুপ্রেরণা নিশ্চয় বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগায়?
মেহরাব: আমার ভালো সময় কিংবা খারাপ সময়গুলোতে আমার পরিবার আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমার বাবা-মা সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট করে। তারা আমাকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখেন। চেষ্টা করবো তাদের স্বপ্ন পূরণ করার।
বাংলা ট্রিবিউন: ভারতের বিপক্ষে যুব এশিয়া কাপের সেমিফাইনাল ভালো যায়নি। বিশ্বকাপের আগে দু্শ্চিন্তার জায়াগা কি বাড়িয়ে দিলো না?
মেহরাব: আমার মনে হয় না এখানে চিন্তার কিছু আছে। প্রথমেই বলবো যেটা চলে গেছে সেটা নিয়ে আমরা বিন্দুমাত্র ভাবছি না। আমরা হয়তো ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটাতে ভালো করতে পারিনি, তারপরও আমাদের দলটা কিন্তু ব্যালেন্সড। একটা দিন তো খারাপ যেতেই পারে। আমি বলবো, ভারতের বিপক্ষে এশিয়া কাপে খারপ দিনটা চলে যাওয়াতে ভালোই হয়েছে। আমার অন্তত বুঝতে পারলাম, কী ধরনের ভুলগুলো আমরা করেছি। এই হার আমরা মাথায় নিচ্ছি না। ভারতের সঙ্গে খেলতে গেলে মানসিকভাবে কিছুটা চাপে পড়ে যাই। এশিয়া কাপে হয়তো হয়নি, বিশ্বকাপে দেখা হলে সেমিফাইনালের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে।
বাংলা ট্রিবিউন: আগের দল প্রচুর ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিল, সেই তুলনায় আপনাদের ম্যাচ সংখ্যা সামান্য। প্রস্তুতির ঘাটতি তো থেকেই যাচ্ছে?
মেহরাব: অবশ্যই আমাদের প্রস্তুতিটা পারফেক্ট হয়নি। এখানে অজুহাত দেখানোর সুযোগ নেই। আমাদের যতটুকু রিসোর্স ছিল আমরা পুরোটা কাজে লাগিয়ে সেরা প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করেছি। এই পর্যায়ে এসে আমরা যদি ভাবি, আমাদের প্রস্তুতি পারফেক্ট হয়নি। তাহলে কিন্তু নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হবে। আমরা হয়তো অনেক বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পারিনি। তবু নিজেদের মধ্যে অনেক ম্যাচ খেলেছি। ক্যাম্পে হার্ডওয়ার্ক করেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি এই দলের অধিনায়কত্ব করেছেন বেশ কিছুদিন। দলের কম্বিনেশনটা আসলে কেমন?
মেহরাব: আমাদের দলের বোলিং ইউনিট খুব শক্তিশালী। দলে বেশ কিছু অলরাউন্ডার আছে। ফিল্ডিংয়ে আমরা ভালো সাইড। ব্যাটিংয়ে একটু সমস্যা ছিল। তবে আগের চেয়ে এখন অবস্থা অনেকটাই ভালো। আশা করি, বিশ্বকাপে আমাদের ব্যাটাররা নিজেদের প্রমাণ করবে। সব মিলিয়ে আমি দারুণ আত্মবিশ্বাসী যে ওয়েস্ট ইন্ডিজে আমরা ভালো কিছু উপহার দিতে পারবো।
বাংলা ট্রিবিউন: অলরাউন্ডার হিসেবে আপনার দায়িত্ব খানিকটা বেশি। কতখানি প্রস্তুত?
মেহরাব: আমি জিনিসটা অন্যভাবে চিন্তা করছি। আমি যখন ব্যাটিং করবো তখন জেনুইন একজন ব্যাটার। আমার কাজ তখন রান করা। আবার যখন বল হাতে নেবো, তখন পুরোপুরি বোলার। কারণ অলরাউন্ডার হিসেবে আমার দায়িত্ব দুটোই। আমাকে আমার কাজটা করতেই হবে। এখানে কোনোটাকে প্রাধান্য দেওয়ার সুযোগ নেই। দিনশেষে আমার কাজটা হবে দলের জন্য। দলের প্রয়োজন যেভাবে, সেভাবেই আসলে খেলতে চাই। পরিকল্পনামতো খেলতে পারলে বিশ্বকাপের সেরা পারফরমার হওয়ার সুযোগ তো থাকবেই।
বাংলা ট্রিবিউন: ওয়েস্ট ইন্ডিজের উইকেট ব্যাটারদের জন্য কঠিন জায়গা। এটা নিয়ে বাড়তি কোনও ভাবনা?
মেহরাব: দেখেন আমরা শ্রীলঙ্কায় গিয়ে খেলেছি, ভারতে গিয়ে খেলেছি, সবখানেই ঘাসের উইকেট ছিল। এছাড়া ক্যাম্পেও আমরা ঘাসের উইকেটে অনুশীলন করতে পেরেছি। সব মিলিয়ে তাই উইকেট নিয়ে আমাদের তেমন কোনও ভাবনা নেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে আমাদের দ্রুততম সময়ে সব মানিয়ে নিতে হবে। আবহাওয়া, কন্ডিশন, উইকেট সবকিছুর সঙ্গেই মানিয়ে নিতে হবে। যত তাড়াতাড়ি এগুলো মানিয়ে নিতে পারতো, ততই আমাদের জন্য ভালো হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: নাজমুল হোসেন শান্ত আপনার প্রিয় ক্রিকেটার। বিশেষ কোনও কারণ?
মেহরাব: আমার একাডেমির (রাজশাহী ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমি) বড় ভাই। চোখের সামনে বড় ভাইকে দেখেছি। তার ব্যাটিংয়ের ভক্ত আমি।
পুরো নাম: শেখ মোহাম্মদ মেহরাব হোসেন
ডাক নাম: অহিন
জন্ম: ৩০ জুলাই ২০০৩
জন্মস্থান: যশোর (বেড়ে ওঠা রাজশাহীতে)
বাবা: আব্দুল আলিম শেখ
মা: শামীমা নাসরিন
উচ্চতা: ৫ ফুট সাড়ে ৮ ইঞ্চি
পড়াশোনা: স্নাতক, দ্বিতীয় বর্ষ
প্রথম ক্লাব: ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমি, রাজশাহী
বর্তমান ক্লাব: রূপগঞ্জ টাইগার্স
ব্যাটিং স্টাইল: বাঁহাতি (মিডল অর্ডার)
প্রিয় শটস: স্লগ সুইপ
বোলিং স্টাইল: অফ স্পিন
প্রিয় ডেলিভারি: বাঁহাতি ব্যাটারদের বিপক্ষে আর্মার বল
প্রিয় মানুষ: মা
প্রিয় ক্রিকেটার: নাজমুল হোসেন শান্ত
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়