২০২২ নারী বিশ্বকাপ ক্রিকেট যখন কড়া নাড়ছিল, বিসমাহ তখন মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটাচ্ছিলেন। দলের প্রয়োজনে ডাক পড়তেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে পিছপা হননি। বরং একদিকে মায়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলের নেতৃত্বভার দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। ক্রীড়াঙ্গনে দায়িত্বশীলতার এমন নজির উদাহরণই শুধু নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আর্থসামাজিক অবস্থায় বিরল!
মা এবং মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বিসমাহর সেই বিস্ময়কর ক্রিকেট জীবন এখনও চলমান। যেমনটা দেখা যাচ্ছে এবারের নারী এশিয়া কাপেও। তবে মা হওয়ার মাত্র ৬ মাসের মাথায় খেলায় ফেরার গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। সেসব গল্প নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আড্ডায় বসেছিলেন পাকিস্তানের অধিনায়ক।
বাংলা ট্রিবিউন: মা হওয়ার পর ক্রিকেটে ফেরার পথটা নিশ্চয়ই সহজ ছিল না?
বিসমাহ মারুফ: আসলেই সহজ ছিল না। আমার পরিবার, ক্রিকেট বোর্ড সহযোগিতা না করলে ক্যারিয়ার তখনই থেমে যেতো। সত্যি কথা হচ্ছে, পরিবার থেকে সমর্থন পেলে যেকোনও মেয়ের জন্যেই কঠিন পথও সহজ হয়ে যায়। আমার জন্য এটা অনেক গৌরবের যে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ক্রিকেট খেলতে পারছি। দলে আমার সতীর্থদের কাছ থেকে অনেক সমর্থন পেয়েছি। দেশের কাছ থেকে, ক্রিকেট বোর্ডের কাছ থেকেও সহযোগিতা পেয়েছি। এসব কিছু না হলে আমার জন্য এগিয়ে যাওয়া সহজ হতো না।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে ‘সুপার মম’ বলা হয়, সবকিছু আসলে কীভাবে ম্যানেজ করছেন?
বিসমাহ: আমি একজন মা; ক্রিকেটার হিসেবে সবকিছুই উপভোগ করছি। তবে এসব ম্যানেজ করা মোটেও সহজ না। সেই কঠিন কাজটি সহজ করে দিয়েছে আমার আম্মা ও স্বামী। তাদের ত্যাগের কারণে এখনও ক্রিকেটার বিসমাহ মারুফ হয়ে আছি। বোর্ডেরও ভূমিকা আছে, আমাকে সুযোগ করে দিয়েছে। এই কারণে সন্তানকে মায়ের কাছে রেখে খেলতে পারছি। ফলে সব কৃতিত্বই আসলে বোর্ড ও পরিবারের। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। তারা সহযোগিতা না করলে আমার পক্ষে ‘সুপার মম’ হওয়া সম্ভব হতো না।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার স্বামীর ভূমিকার কথা শুনতে চাই…
বিসমাহ: পরিবার, বিশেষ করে স্বামীর বিরাট ভূমিকা রয়েছে আমার ফিরে আসার পেছনে। সে আমাকে সাহস জুগিয়েছে, সমর্থন করেছে। আপনি চিন্তা করেন, মা হওয়ার পর দলের সঙ্গে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাচ্ছি খেলার জন্য। আমার বাচ্চাও চলে আসছে। তখন বাড়িতে সে একা। আমি থাকি ক্রিকেট মাঠে; প্র্যাকটিস থাকে, ম্যাচ থাকে। দলের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতাও থাকে। আমি তার সঙ্গে কথা বলার সময় পর্যন্ত পাই না। তার জন্য মোটেও এটা সহজ ব্যাপার নয়। বলা যায় একজন পুরুষের জন্য অনেক বড় ত্যাগ। যা সে নিয়মিত করছে। তার সমর্থন না পেলে কবেই ক্রিকেট ছেড়ে দিতে হতো। তবে আমি এবং আমার মেয়ে যখনই সুযোগ পাই, তাকে পুরোটা সময় দেই।
বাংলা ট্রিবিউন: ফাতিমা বড় হচ্ছে, ড্রেসিংরুমে আপনার সতীর্থদের সঙ্গে তার সময়টা কীভাবে কাটে?
বিসমাহ: (হাসি)… আপনারা বুঝতে পারবেন না। আমার ফাতিমা টিমের সবার বন্ধু হয়ে গেছে। সবার সঙ্গে সে মিশে গেছে। সবার সঙ্গে খেলা করে। সবাই ফাতিমাকে আপন করে নিয়েছে। মা হিসেবে এসব দেখে মাঝে মাঝে আবেগ ধরে রাখতে পারি না। ধন্যবাদ আমার টিমমেটদের, তারা আমার মেয়েকে আপন করে নিয়েছে।
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেট এবং ক্রিকেটারদের সঙ্গে ফাতিমা বড় হয়ে উঠছে, মেয়ের তো ক্রিকেটারই হওয়া উচিত?
বিসমাহ: হা হা হা… আসলে সে যদি ক্রিকেটার হতে চায় আমার কোনও বাধা থাকবে না। তাকে খেলার জন্য জোর করবো না। আর আমার ইচ্ছার কথা যদি জানতে চান বলবো আমার মেয়ে একজন নারী নয়, মানুষ হিসেবে বড় হয়ে উঠুক। ওর যেটা ভালো লাগে সেটাই ও করুক। ক্রিকেটার হতে চাইলেও আমার আপত্তি নেই। যেভাবে ও বড় হয়ে উঠছে তাতে ক্রিকেটার হলে তো অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
বাংলা ট্রিবিউন: ফাতিমা কোথায়? তাকে মাঠে নিয়ে এসেছিলেন?
বিসমাহ: তার নানির কাছে। ওখানে সে আনন্দেই আছে। ফাতিমাকে এখনও মাঠে নিয়ে আসা হয়নি। ফাইনালে উঠলেই নিয়ে আসবো। ওকে নিয়েই ট্রফি উদযাপন করতে চাই। আর সেটা করতে পারলে আমার জন্য দারুণ গর্বের ব্যাপার হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: কখনও ভেবেছিলেন মা হওয়ার পর আবার পাকিস্তান দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন?
বিসমাহ: আসলে আমি কখনও চিন্তা করতে পারিনি সন্তান জন্ম দেওয়ার পর আবার পাকিস্তান দলে ফিরতে পারবো। সেখানে নেতৃত্ব পাওয়াটা বিশাল ব্যাপার। এজন্য আমার বোর্ডকে ধন্যবাদ জানাই। তারা আমার ওপর আস্থা রেখেছে। আমাকে সব ধরনের সহযোগিতা করেছে।
বাংলা ট্রিবিউন: মা হওয়ার পর ক্রিকেটে ফেরার পথটা সহজ হওয়ার কথা নয়, নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করলেন?
বিসমাহ: যখন আমি আবার দলে ফিরে এসেছি, বিশ্বকাপ ক্রিকেট সামনে। চিন্তা করেছি কীভাবে দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায়। দলকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে এটাই মাথায় ছিল। আমি সামনে তাকাতে চেয়েছি। আগেই বলেছি এক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থন ছিল। আমার স্বামী হতাশ হতে দেয়নি।
বাংলা ট্রিবিউন: লম্বা সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। ক্রিকেট নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ ভাবনা কী?
বিসমাহ: সবার সহযোগিতাতেই সবকিছু সম্ভব হয়েছে। আমার মেয়েকে নিয়ে আরও কিছু দিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে চাই। এখনও চিন্তা করিনি কোথায় গিয়ে থামবো। আর হ্যাঁ, ভবিষ্যতে তরুণ মেয়েদের সঙ্গে থাকতে চাই। তাদের সহযোগিতা করতে চাই। আপাতত এতটুকুই পরিকল্পনা।
বাংলা ট্রিবিউন: এশিয়া কাপ ক্রিকেটে পরপর দুই ম্যাচে জয়। বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের হারানো নিশ্চয়ই স্পেশাল?
বিসমাহ: আমরা একটি একটি করে ম্যাচ নিয়ে চিন্তা করছি। বাংলাদেশকে হারানো অবশ্যই স্বস্তির। ওরা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। তাছাড়া নিজেদের মাঠে খেলছে। ওদের বিপক্ষে খেলাটা সহজ ছিল না। ধন্যবাদ মেয়েদের যে সবাই দারুণ পারফরম্যান্স করেছে।
বাংলা ট্রিবিউন: এশিয়া কাপে ট্রফি জয়ের ব্যাপারে আপনারা কতটা আত্মবিশ্বাসী?
বিসমাহ: আমারা ম্যাচ বাই ম্যাচ এগিয়ে যেতে চাই। এক এক ম্যাচের পরিকল্পনা একেক রকম। আমাদের লক্ষ্য অবশ্যই সামনে এগিয়ে যাওয়া। প্রতি ম্যাচে জয় ছিনিয়ে নেওয়া। বাকিটা আল্লাহ ভরসা। তবে এতটুকু বলতে পারি এখানে ট্রফি জেতার জন্যই এসেছি। সামনে আমাদের কঠিন পরীক্ষা। ভারত শক্তিশালী দল। বাংলাদেশও এগিয়ে থাকবে। সব মিলিয়ে আমাদের জন্য কাজটা মোটেও সহজ নয়।
বাংলা ট্রিবিউন: শুনেছি আজ নাকি সিলেট ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা ছিল?
বিসমাহ: হ্যাঁ, সেই পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পরে ক্যান্সেল হয়েছে। সামনেই হয়তো আবার পরিকল্পনা হবে। সিলেটে অনেক সুন্দর জায়গা আছে। আমি সেসব জানার চেষ্টা করেছি। কোনও এক ফাঁকে দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে বেড়াবো।