ঠিক আট বছর আগের কথা। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে হারের পর সামগ্রিক চিত্র বোঝাতে সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক নাসের হুসেন ধারাভাষ্যে বলেছিলেন, ‘ওয়ান অফ দ্য গ্রেটেস্ট ডেইজ ইন বাংলাদেশ হিস্ট্রি, ওয়ান অফ দ্য লোয়েস্ট পয়েন্টস ইন ইংলিশ হিস্ট্রি।’ ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হেরেই টুর্নামেন্ট থেকে ইংলিশদের বিদায় নিতে হয়েছিল। যে পরাজয় আমূল বদলে দেয় ইংলিশ ক্রিকেটকে। সমালোচনা পেছনে ফেলে অধিনায়ক এউইন মরগানের নেতৃত্বে সীমিত ওভারের ক্রিকেটের সংজ্ঞাটাই বদলে ফেলে তারা। আক্রমণাত্মক ক্রিকেটকে মূলমন্ত্র মেনে মরগানের নেতৃত্বেই ২০১৯ বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে চ্যাম্পিয়ন হয় ইংল্যান্ড। ভারতের বিশ্বকাপে তাদের শুরুটা ভালো না হলেও মঙ্গলবার তাদের সেই ‘ব্র্যান্ড অব ক্রিকেটে’-এর কাছেই বাংলাদেশ মার খেলো!
২০১৫ বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশ-ইংল্যান্ডের লড়াই এলে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ওভালে সেই ম্যাচটির প্রসঙ্গ অবধারিতভাবেই চলে আসে। বাংলাদেশ দল ওই ম্যাচ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার চেষ্টা করে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের জন্য সেটি ছিল শিক্ষার। যদিও ৮ বছর আগে মরগান-স্টোকসরা যা শিক্ষা নেওয়ার নিয়ে নিয়েছেন। এই মুহূর্তে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ব্র্যান্ড অব ক্রিকেটের কাছে কোন দলই তেমন একটা পাত্তা পাচ্ছে না। চলমান বিশ্বকাপে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়ে এসেছে জস বাটলারের দল। কিন্তু প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের দাপুটে জয়ের পর বাংলাদেশের বিপক্ষে মুখোমুখি হওয়ার আগে ভীষণ চাপে পড়ে যায় তারা। আজ মাঠে নামার পর সেই চাপ আছড়ে ফেলেছে নিজেদের ব্র্যান্ড অব ক্রিকেটে।
ধর্মশালায় টস হেরে ইংলিশদের ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। সাকিবের সিদ্ধান্ত যেন ইংলিশদের জন্য শাপে বরই হলো। দুই ওপেনার জনি বেয়ারস্টো ও ডেভিড মালান মিলে ১১৫ রানের জুটিতে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে মঞ্চ গড়ে দিয়েছেন। দারুণ ছন্দে থাকা বাংলাদেশের তিন পেসার তাসকিন, মোস্তাফিজ, শরিফুলকে কোনও সুযোগই দেননি দুই ওপেনার। জুটি ভাঙতে পাওয়ার প্লেতে সাকিব তার স্পিনারদেরও ব্যবহার করেছেন। শেষমেশ ৫৯ বলে ৫২ রানের ইনিংস খেলা বেয়ারস্টোকে ফিরিয়ে জুটি ভেঙেছেন সাকিব আল হাসান। তাতে অবশ্য খুব একটা লাভ হয়নি। ডেভিড মালানের দুর্দান্ত সেঞ্চুরির পর জো রুটের ৮২ রানের ইনিংসে বড় সংগ্রহের ভিত পেয়ে যায় বাটলারের দল। ভাগ্য ভালো শেষ দশ ওভারে বাংলাদেশের বোলাররা কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারায় ৪০০ রান হয়নি! কিন্তু মালানের ১০৭ বলে ১৬ চার ও ৫ ছক্কায় ১৪০ রানের ইনিংসে একটা সময় এই স্কোরকেও মনে হচ্ছিল সম্ভাব্য!
এদিকে বিশ্বকাপের আগে ফর্মহীনতায় ভুগলেও বড় মঞ্চে নেমে রানের ফোয়ারা বইছে রুটের ব্যাটে। নিউজিল্যান্ডের পর বাংলাদেশের বিপক্ষেও হাফ সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের বিপক্ষে করেছেন ৬৮ বলে ৮২ রান! তার ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও ৬টি ছয়ের মার। মঙ্গলবার ৮২ রানের ইনিংস খেলার পথে ইংলিশদের হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডও গড়েছেন। এতদিন বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বাধিক রান সংগ্রাহক ছিলেন গ্রাহাম গুচ। শুধু এই তিন জনই নন, যারাই ব্যাটিংয়ে নেমেছেন, আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ৯ উইকেটে ৩৬৪ রানের পাহাড় গড়তে অবদান রেখেছেন।
বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে সাকিব ছাড়া কেউই নিয়ন্ত্রিত বোলিং করতে পারেননি। এলোমেলো বোলিংয়ে রান দিয়েছেন। শেখ মেহেদী ৭১ রানে শিকার করেছেন ৪ উইকেট। ৭৫ রান খরচায় শরিফুলের শিকার তিনটি উইকেট। সাকিব ও তাসকিন শিকার করেন একটি করে উইকেট।
তারপর বাংলাদেশের নিজেদের ধাঁচের ব্যাটিং দেখার অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। একদিন আগেই যেমন স্পিন কোচ রঙ্গনা হেরাথ জানিয়ে গেছেন, নিজেদের ব্র্যান্ড অব ক্রিকেট খেলে ইংল্যান্ডকে চমকে দিতে চান তারা। বাংলাদেশ অবশ্য তাদের ‘ব্র্যান্ড অব ক্রিকেট’ ঠিকই খেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ের ব্যাটিং বিশ্লেষণ করলে এটি চোখে পড়বে নির্ঘাত। ইংলিশদের রান পাহাড় টপকাতে হলে বাংলাদেশের কাউকে মালান কিংবা রুট হতে হতো। কিন্তু ব্যাটারদের কেউই দায়িত্ব নিতে পারেননি। লিটন-মুশফিকের দুটি হাফ সেঞ্চুরির ইনিংস থাকলেও সেই ইনিংস কোনও কাজেই আসেনি। এমন বড় চেজের সামনে দাঁড়িয়ে ৫০ রানের মধ্যে টপ অর্ডারের চার ব্যাটারকে হারানোর পর সেই ম্যাচে ফেরা কঠিন তো বটেই। অসম্ভব কঠিনও!
বাংলাদেশও সেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেনি। পঞ্চম উইকেটে লিটন ও মুশফিক মিলে অবশ্য ৭২ রানের দারুণ একটি জুটি গড়েছিলেন। ষষ্ঠ উইকেটে তাওহীদ হৃদয়কে নিয়ে ৪৩ রানের আরেকটি জুটি গড়েন মুশফিক। ৬৪ বলে ৫১ রান করে টপলির শিকার হন উইকেটকিপার ব্যাটার মুশফিক। দায়িত্বশীল ইনিংস খেলতে থাকা মুশফিক বরাবরের মতোই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে আউট হয়েছেন। এরপর হৃদয় ফিরেছেন ৩৯ রানে। লিটন খেলেছেন দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৬৬ বলে ৭৬ রানের ইনিংস। কিন্তু কেউ মোক্ষম সময়ে ইনিংস লম্বা করতে না পারায় ৪৮.২ ওভারে ২২৭ রানে থামে বাংলাদেশের ইনিংস। তাতে ১৩৭ রানের বড় ব্যবধানে হেরে চেন্নাইয়ের পথ ধরবে সাকিব আল হাসানের দল।
ইংলিশ পেসার রিস টপলিই মূলত বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। আজকের একাদশে স্থান পেয়ে ১০ ওভারে ৪৩ রান দিয়ে তার শিকার ছিল ৪ উইকেট। মার্ক উড ও আদিল রশিদও কম ভোগাননি বাংলাদেশকে। পুরো ম্যাচেই ইংলিশরা তাদের বদলে যাওয়া ‘ব্র্যান্ড অব ক্রিকেট’ খেলে জয়ের নিশানা উড়িয়েছেন।