গ্যালারিতে বাংলাদেশে সমর্থকদের চিৎকারে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল ভারতীয় দর্শকদের হইচই! সংখ্যায় নেদারল্যান্ডসের সমর্থকরা খুব বেশি নয়, তাদের সমর্থন দিতেই ভারতীয় দর্শকরা যেন গলায় গলা মেলালেন। গ্যালারিতে থাকা বাংলাদেশি সমর্থকরা যেভাবে কোণঠাসা হয়েছেন, ২২ গজেও ডাচদের দারুণ পরিকল্পনায় ক্রিকেট দলও ছিল খোলসের মধ্যে। বড় স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে আসা দলটি টানা পাঁচ ম্যাচ হেরে সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্ন থেকে দূরে, বহু দূরে চলে গেলো। শুক্রবার ক্রিকেটের নন্দন কানন খ্যাত ইডেন গার্ডেন্সে র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা দলটির কাছে পাত্তাই পায়নি বাংলাদেশ। ৮৭ রানের বড় ব্যবধানে ম্যাচ হেরে সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্ন ধুলিস্মাৎ হয়ে গেছে লাল-সবুজ জার্সিধারীদের।
সেমিফাইনালের পথটা খোলা রাখতে চাইলে কলকাতায় জিততেই হতো বাংলাদেশ দলকে। র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে স্বাভাবিকভাবে জয় প্রত্যাশা করছিল বাংলাদেশ। টানা হারের ধকলে কিছুটা চাপ থাকলেও ডাচদের বিপক্ষে এভাবে আত্মসমর্পণ করবে কেউই ভাবেনি। বাংলাদেশ থেকে কলকাতার দূরত্ব খুব বেশি না হওয়ায় এই ম্যাচটি বিপুল সংখ্যক দর্শক সমাগম হয়েছিল। ম্যাচের আগে প্রত্যেকের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসী সুর। কিন্তু বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হতেই অন্ধকার বাংলাদেশি সমর্থকদের মুখ। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ঢাকা থেকে বাংলাদেশের খেলা দেখতে এসেছেন জুবাইর হোসেন। ৫ বছরের সন্তানকে নিয়ে এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যু ঘুরে বেড়ানো জুবাইর এমন ক্রিকেট নিয়ে হতাশা প্রকাশ করলেন। সবার প্রত্যাশা ছিল আনন্দের শহর, ক্রিকেটের নন্দন কাননে এসে হারের বৃত্ত ভাঙবে বাংলাদেশ। কিন্তু উল্টো ডাচ রূপকথার দিনে আনন্দের শহরে দুঃখগাঁথা লিখলো বাংলাদেশ।
এই দলটিই গত কয়েক বছর ধরে ওয়ানডে ফরম্যাটে ছন্দময় ক্রিকেট খেলছিল। আইসিসি ওয়ানডে সুপার লিগে বাংলাদেশ দল তিন নম্বরে থেকে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পেয়েছিল। হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে, সবখানেই বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্য ছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে এশিয়া কাপ থেকেই ছন্দহীন বাংলাদেশ। পাশাপাশি মাঠের বাইরের অনেক ইস্যু তো ড্রেসিংরুমে নানা প্রভাব রেখেছে। তার প্রতিফলন যেন প্রত্যেক ম্যাচেই দেখা যাচ্ছে। বড় স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে আসা দলটি ডাচদের বিপক্ষে হেরে গেছে। এখন পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাকি তিন ম্যাচ বাংলাদেশের জন্য কেবল নিয়ম রক্ষার!
মুম্বাইতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পর পুরো দল কলকাতায় ফিরলেও সাকিব চলে যান বাংলাদেশে। সেখানে তার শৈশবের কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিমের সঙ্গে দুই দিনে দুটি সেশন ব্যাটিং অনুশীলন করেন তিনি। বাংলাদেশের অধিনায়কের এভাবে দেশে ফেরাটা ভালোভাবে নেননি অনেক সমর্থকই। এমনকি দ্বিতীয় দিনের অনুশীলন সেশনে সাকিবকে ভক্তদের রোষানলে পড়তে হয়। আগের ৫ ম্যাচে ব্যর্থ হওয়া সাকিব আজ ব্যাট হাতে নন্দন কাননে ফুল ফোটাবেন, এমন প্রত্যাশা ছিল ক্রিকেটপ্রেমীদের। কিন্তু তার সঙ্গে পুরো ব্যাটিং ইউনিটই ব্যর্থ হয়েছে।
শনিবার ২৩০ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে দেখেশুনেই শুরু করেছিলেন দুই ওপেনার লিটন দাস ও তানজিদ হাসান তামিম। কিন্তু এমন চাপের একটি ম্যাচে ইনিংসের শুরুতেই লিটন দায়িত্ব ভুলে রিভার্স সুইপ করলেন। তাতে যা হবার হলো! ১২ বলে ৩ রান করে বাংলাদেশ হারালো তাদের প্রথম উইকেট। লিটনের আউটের পর হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনাআপ। ৭০ রানে বাংলাদেশের সব টপ অর্ডার ব্যাটার সাজঘরে ফেরেন। দুর্বল শট বাছাইয়ে ডাচদের কাছে অসহায় আত্মসমর্থণ করেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। তাদের এমন আসা যাওয়ার মিছিল দেখে গ্যালারির এক প্রান্তে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান উঠে ভারতীয় সমর্থকদের কণ্ঠে। তাদের এই অপমান ধামাচাপা দিয়ে বাংলাদেশ দলকে উজ্জীবিত রাখার চেষ্টা চালান বাংলাদেশের সমর্থকরা। তাতে অবশ্য খুব লাভ হয়নি, বাংলাদেশ দল অলআউট হয়েছে ১৪২ রানে। শেষ দিকে মাহমুদউল্লাহ-মেহেদী-তাসকিন-মোস্তাফিজের কিছুটা প্রতিরোধে বাংলাদেশে একশ পার করেছিল।
বিশ্বকাপের পুরো সময়টা জুড়েই বাংলাদেশের ব্যাটিং বিভাগ ভোগাচ্ছে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি বাদ দিলে কোনও দলের বিপক্ষে ভালো ব্যাটিং করতে পারেনি লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। এই ব্যর্থতায় যতটা না ভূমিকা প্রতিপক্ষের বোলারদের, তার চেয়ে বড় ভূমিকা বাংলাদেশের ব্যাটারদের। প্রতি ম্যাচের মতো ডাচদের বিপক্ষেও লিটন-তানজিদ তামিম-শান্ত-মিরাজ-সাকিবরা আত্মাহুতি দিয়ে এসেছেন। শৈশবের কোচের কাছে দীক্ষা নিতে বাংলাদেশে ছুটে যাওয়া সাকিব দৃষ্টিকটুভাবে আউট হয়েছেন। এই ম্যাচে সবার চোখ ছিল তার দিকে। কিন্তু নেমেই অস্বস্তি নিয়ে ব্যাটিং করা সাকিব ১৪ বলে ৬ রান করে অপ্রয়োজনীয় কাট শট খেলতে গিয়ে প্যাভিলিয়নে। মুশফিকও ৫ বলে ১ রান করে ইনসাইড আউট হয়েছেন। বিশ্বকাপ শুরুর আগে সবচেয়ে ধারাবাহিক ছিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত, কিন্তু বিশ্বকাপের ২২ গজে তার ব্যাট যেন ঘুমন্ত। ব্যাটারদের এমন ব্যর্থতার পর নেদারল্যান্ডস কেন, এরচেয়ে নিচের সারির দলের বিপক্ষেও জেতা সম্ভব নয় বাংলাদেশের।
নেদারল্যান্ডসকে ২২৯ রানে আটকে দেওয়ার পর জয়টা কঠিন হওয়ার কথা ছিল না। যদিও ডাচদের স্কোরবোর্ডে এত রান হতো না। বাংলাদেশ যদি সুযোগটা লুফে নিতে পারতো তাহলে আরও আগেই অলআউট করা যেতো নেদারল্যান্ডসকে। কিন্তু শূন্য রানে দুইবার জীবন পাওয়া ডাচ অধিনায়ক স্কট এডওয়ার্ডস ছড়ি ঘোরালেন বাংলাদেশের বোলারদের ওপরে। দুইবার ক্যাচ তুলে লিটন ও মুশফিকুর রহিমের কল্যাণে বেঁচে যাওয়া এই ব্যাটার খেলেছেন ৬৮ রানের মহাগুরুত্বপূর্ণ ইনিংস। এতেই মূলত বাংলাদেশকে ২৩০ রানের লক্ষ্য দিতে পারে ডাচরা।
টস জিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে ব্যাটিং নিয়েছিল নেদারল্যান্ডস। বাংলাদেশের দুই পেসার তাসকিন ও শরিফুল মিলে তাদের দুই ওপেনারকে সাজঘরের পথ দেখান। দ্বিতীয় ওভারেই বিক্রমজিৎ সিংকে ফিরিয়ে দেন চোট কাটিয়ে দলে ফেরা তাসকিন। ডানহাতি এই পেসারের পায়ের ওপর করা ডেলিভারি ফ্লিক করতে গিয়ে সাকিবের হাতে ধরা পড়েন ডাচ ব্যাটার। পরের ওভারেই শরিফুলের শিকার ম্যাক্স ও’ডউড। বাংলাদেশি পেসারের করা অফ স্টাম্পের অনেক বাইরের বলে ব্যাট চালিয়ে উইকেটের পেছনে ধরা পড়েন তিনি। ৪ রানের মধ্যে দুই উইকেট হারানো দলের হাল ধরেন ওয়েসলি বারেসি ও কলিন অ্যাকারম্যান। চাপ কাটিয়ে তৃতীয় উইকেটে ৫৯ রানের জুটি গড়েন তারা।
দুই ওভারের মধ্যে দুই ব্যাটারকে হারিয়ে ফের চাপে পড়ে নেদারল্যান্ডস। ১৪তম ওভারে মোস্তাফিজুর রহমানের ফুল লেংথের ডেলিভারিতে শট খেলতে গিয়ে সাকিবের হাতে ধরা পড়েন বারেসি, ৪১ বলে ৮টি চারে করেন ৪১ রান। ১৫ রান করা অ্যাকারম্যানকে পরের ওভারে ফেরান সাকিব, এবার ক্যাচ নেন মোস্তাফিজ। এক ওভার পরেই ডাচ অধিনায়ককে সাজঘরে ফেরাতে পারতো বাংলাদেশ। কিন্তু তিন বলের মধ্যে ডাচ অধিনায়কের তোলা দুটি ক্যাচ নিতে ব্যর্থ হন লিটন ও মুশফিক। জীবন পেয়ে বাস ডি লিডের সঙ্গে ৪৪ রানের জুটি গড়েন এডওয়ার্ডস। ১৭ রান করা ডি লিডকে ফিরিয়ে এই জুটি ভাঙেন তাসকিন।
এরপর ষষ্ঠ উইকেটে ১০৫ বলে ৭৮ রান যোগ করেন এডওয়ার্ডস ও এঙ্গেলব্রেখট। ৮৯ বলে ৬ চারে ৬৮ রান করে মোস্তাফিজের শিকার উইকেটকিপার এই ব্যাটার। সঙ্গীকে হরিয়ে কিছুক্ষণ পর ফিরে যান এঙ্গেলেব্রেখট। ৬১ বলে ৩ চারে ৩৫ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। মনে হচ্ছিল দুইশর কাছাকাছি রানের মধ্যেই অলআউট করে দেওয়া সম্ভব হবে ডাচদের। কিন্তু শেষ ৫ ওভারে ৪৪ রানে নেদারল্যান্ডস ২২৯ রান সংগ্রহ করে। শেখ মেহেদী হাসানের করা ইনিংসের শেষ ওভার থেকে ১৭ রান করে নেদারল্যান্ডস।
দারুণ বোলিং করা মোস্তাফিজ ১০ ওভার বোলিং করে ৩৬ রান খরচায় দুটি উইকেট শিকার করেন। মোস্তাফিজ ছাড়াও তাসকিন, শরিফুল ও শেখ মেহেদীর শিকার ২ উইকেট। বাংলাদেশের অধিনায়ক সাকিব পান একটি উইকেট।