অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ

পেস বোলিং ছেড়ে উইকেট রক্ষক-ব্যাটার হয়ে আদিলের এগিয়ে চলা

ক্রিকেটে আদিল বিন সিদ্দিকের হাঁটি হাঁটি পা পা করা শুরু মাত্র ছয় বছর বয়সে। পড়াশোনায় মন বসেনি তার। সারাক্ষণ মাথায় ঘুরঘুর করে ক্রিকেটের পোকা। তাই বই-খাতা ফেলে ছুটতেন মাঠে। স্কুল ফাঁকি দিয়ে কিংবা টিফিনের সময় পালিয়ে অলিগলিতে ব্যাট-বলে ডুবে যেতেন। এজন্য কতবার বাবার হাতে পিটুনি খেতে হয়েছে সেই ইয়ত্তা নেই! বাবা চাইতেন ছেলে পড়াশোনা করে অনেক বড় হবে। কিন্তু ক্রিকেটকে ঘিরেই আদিলের ধ্যান-জ্ঞান। তার ক্রিকেটপ্রেমের কারণে পুরো পরিবার এক সন্ধ্যায় বৈঠকে বসে! ছোট ভাইয়ের পক্ষে ওকালতি করেন বড় ভাই। কিন্তু কোনোভাবেই মন গলে না ফায়ার সার্ভিসে চাকরি করা বাবা সিদ্দিকুর রহমানের। দুই ভাইয়ের পাক্কা দুই বছর চেষ্টার পর অবশেষে রাজি হন তিনি।

বাবার হাত ধরে ২০১৬ সালে কেরানীগঞ্জের নসরুল হামিদ ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন আদিল। পরের বছর বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট অনূর্ধ্ব-১২ কার্নিভালে অংশ নেন। এতে সেরা ব্যাটারের তালিকায় নাম ওঠার সুবাদে অনূর্ধ্ব-১৪ জেলা দলে জায়গা পেয়ে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্য শুরু হয় তখন থেকেই। পরের প্রতিটি ধাপে জেলা দলে সুযোগ পেলেও বিভাগীয় দলে সুযোগ হচ্ছিল না। অনূর্ধ্ব-১৮ জেলা দলের হয়ে সর্বোচ্চ রান করে আদিল সুযোগ করে নেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রাথমিক ক্যাম্পে। গত দুই বছর দলের অংশ হয়ে আছেন তিনি। নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেলেও নিজের অ্যাকাডেমিতে ম্যাচ খেলে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন এই উইকেট রক্ষক-ব্যাটার।

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের বিকল্প উইকেট রক্ষক ও ওপেনার হিসেবে সুযোগ পেয়েছেন আদিল। তবে ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি ছিলেন পেস বোলিং অলরাউন্ডার! বলের গতি ঠিকঠাক না থাকায় পেস বোলিং বাদ দিয়ে হাতে নেন উইকেট রক্ষকের গ্লাভস। নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন উইলিয়াসনের ভক্ত তিনি। তার মতোই ব্যাটার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন আদিল।

ক্রিকেটপ্রেমের কারণে এসএসসির গণ্ডি পেরোতে পারেননি আদিল। আটকে আছেন দশম শ্রেণিতেই। এখন ব্যাট-গ্লাভস হাতে ছুটছেন স্বপ্নজয়ের পেছনে। পড়াশোনা শেষ করতে না পারার ব্যাপারে খুব বেশি আফসোস নেই আদিলের। কারণ ক্রিকেটে ভালো কিছু করতে পারবেন সেই আত্মবিশ্বাস ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে আছে।

অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশ স্কোয়াডকে নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের ধারাবাহিক আয়োজনে আজ থাকছে উইকেট রক্ষক-ব্যাটার আদিল বিন সিদ্দিকের সাক্ষাৎকার।

আদিল বিন সিদ্দিক (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেট খেলতে গিয়ে নাকি বাবার হাতে প্রায়ই পিটুনি খেতেন?
আদিল বিন সিদ্দিক: ক্রিকেট খুব ভালো লাগে আমার। ছোটবেলা থেকে অন্যান্য খেলা খেললেও ক্রিকেট আমার বেশি পছন্দ। স্কুল ফাঁকি দিয়ে মাঠে খেলতে যাওয়া, টিফিনের পর ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেট খেলতে চলে যাওয়া– এসব অনেক করেছি। কতবার করেছি সেই হিসাব নেই! এসব কারণে স্কুলের শিক্ষক থেকে শুরু করে আব্বুর হাতে অনেক পিটুনি খেতে হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে বাবাকে রাজি করালেন কীভাবে?
আদিল: আব্বুকে একদিন জানাই– আমি ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু আব্বু কিছুতেই রাজি ছিলেন না। আমার বড় ভাইয়া তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আব্বুর এক কথা– ‘পড়াশোনা করো।’ কিন্তু আমার তো পড়াশোনায় মন বসে না! দুই বছর চেষ্টার পর অবশেষে আব্বুর মন গললো। ২০১৬ সালে তিনিই আমাকে কেরানীগঞ্জের নসরুল হামিদ ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। তার রাজি হওয়ার পেছনে আমার বড় ভাইয়ের অবদান অনেক। এখনও একই অ্যাকাডেমিতে আছি।

বাংলা ট্রিবিউন: রাজি করাতে কি আপনাকে কোনও শর্ত মানতে হয়েছিল?
আদিল: শর্ত বলতে তেমন কিছুই না। আব্বু যেহেতু ফায়ার সার্ভিসে চাকরি করতেন, তিনি শৃঙ্খলা মেনে জীবনযাপন পছন্দ করেন। আব্বু চাইতেন আমিও যেন সেভাবেই চলি। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি যাই করবে মনোযোগ দিয়ে করো। ফোকাস রাখো। তাহলেই উন্নতি করতে পারবে।’ বাবার এই দর্শনে আমার জন্য সুবিধাই হয়েছে। এমনিতেই ছাত্র হিসেবে অমনোযোগী থাকায় এবং ক্রিকেটে বেশি সময় দিতে গিয়ে পড়াশোনা করা হয়নি। দশম শ্রেণিতেই আটকে আছি!

বাংলা ট্রিবিউন: বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে আপনার পারফরম্যান্স তো অনেক উঠানামা করেছে...
আদিল: এটা ঠিক। কখনও ভালো করেছি, কখনও খারাপ। অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয়ে পরের বছর অনূর্ধ্ব-১২ কার্নিভালে অংশ নিয়ে সেরা ব্যাটার হয়েছিলাম। এখান থেকেই অনূর্ধ্ব-১৪ জেলা দলের হয়ে খেলেছি। কিন্তু বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পাইনি। অনূর্ধ্ব-১৮ পর্যন্ত কোনও পর্যায়েরই বিভাগীয় দলে সুযোগ পাইনি। ক্যাম্পে ডাক পেলেও পরবর্তী সময়ে বাদ পড়তাম। এসব ঘটনায় হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। তবুও নিজের ভুলগুলো শুধরে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। অনূর্ধ্ব-১৮’তে প্রথম বছর বিকেএসপির হয়ে দুই ম্যাচে ব্যর্থ হই। ফলে আর ডাক পাইনি। পরের বছর ক্যাম্পে ডাক পেয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হই। সম্ভবত ১৯৩ রান করেছিলাম। ঢাকা বিভাগীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ রানের তালিকায় দুই নম্বরে ছিলাম। সেই পারফরম্যান্স দিয়েই অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পে সুযোগ পেয়ে যাই।

বাংলা ট্রিবিউন: যতদূর জানি আপনি পেসার ছিলেন। পেস বোলিং ছাড়লেন কেন?
আদিল: বিসিবির অনূর্ধ্ব-১২ কার্নিভালে পেস বোলার হিসেবেই খেলেছি। পাশাপাশি ব্যাটারও ছিলাম। অনূর্ধ্ব-১৪’তে ওঠার পর পেস বোলিং ছেড়েছি। তখন থেকেই এখনও উইকেট রক্ষক হিসেবে খেলছি। সত্যি বলতে, আমার বোলিংয়ে আহামরি কোনও পেস ছিল না। নিজের বোলিং নিয়ে নিজেই সন্তুষ্ট ছিলাম না বলেই পেস বোলিংয়ে আর মনোযোগ দেইনি।

আদিল বিন সিদ্দিক (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

বাংলা ট্রিবিউন: অনেকদিন ধরে ম্যাচ খেলার সুযোগ পাচ্ছেন না। এ কারণে প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকবে? 
আদিল: আশা করি তেমন হবে না। দেশে ফেরার পরপরই আমাদের অ্যাকাডেমির হয়ে তিনটি ম্যাচ খেলেছি। আরিফ স্যার আমাকে অনেক সহযোগিতা করেন। আমার জন্য তিনি প্রথম বিভাগের চারটি দল নিয়ে একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করেন। এরমধ্যে তিন ম্যাচ খেলে রান করেছি। সব মিলিয়ে আমার প্রস্তুতি খুব ভালো। 

বাংলা ট্রিবিউন: বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে আপনি। পরবর্তী ধাপের জন্য কতটা প্রস্তুত?
আদিল: জাতীয় দল নিয়ে ভাবছি না। তবে বড়দের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে প্রস্তুত আছি। প্রিমিয়ার লিগ, জাতীয় লিগ, বিসিএলে খেলে নিজেকে প্রস্তুত করতে চাই। সুযোগ করে নিতে চাই এইচপি কিংবা ‘এ’ দলে।  কোথায় ক্রিকেট খেলছি আমার কাছে সেটি মুখ্য নয়। আমার ভাবনায় কেবল টানা ১৫-১৬ বছর ক্রিকেট খেলা। কোথায় খেলবো সেটা জরুরি না। ক্রিকেট খেলবো– এটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।  

বাংলা ট্রিবিউন: কেন উইলিয়ামসনকে অনুসরণ করেন বলছিলেন, কেন?
আদিল: তার ব্যাটিং খুব ভালো লাগে। ছোটবেলা থেকেই কেন উইলিয়ামসনকে অনুসরণ করছি। শুধু ব্যাটিং নয়, তার স্টাইল আর কথাবার্তাও আমাকে মুগ্ধ করে। 

বাংলা ট্রিবিউন: উইকেট রক্ষক হিসেবে কারও কাছ থেকে প্রেরণা নেওয়ার চেষ্টা করেন?
আদিল: জেনে অবাক হবেন, আমার খুব প্রিয় উইকেট রক্ষক হলেন নসরুল হামিদ ক্রিকেট অ্যাকাডেমির একজন সিনিয়র ভাই। তার নাম জুবায়ের হোসেন। তিনি প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে খেলেছেন।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার এক কোচের কথা বলছিলেন, আপনার ক্যারিয়ারে তার প্রভাব কতটা?
আদিল: আমার প্রথম কোচ আরিফ হোসেন সোলায়মান। তিনি আমাকে ক্রিকেটসহ অন্যান্য বিষয়ে সবসময় সহায়তা করে। কোনও কারণে আমার মন খারাপ থাকলে তিনি সমাধানের চেষ্টা করেন। ক্রিকেটে খারাপ সময় গেলে সেটা কাটিয়ে উঠতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন আরিফ স্যার। আমাকে মানসিকভাবে অনেক অনুপ্রাণিত করেন তিনি। তার সঙ্গে আমার প্রতিদিনই কথা হয়।

আদিল বিন সিদ্দিক (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

একনজরে
পুরো নাম: আদিল বিন সিদ্দিক   
ডাক নাম: আদিল
জন্ম: ১ নভেম্বর, ২০০৪ 
জন্মস্থান: ঢাকা
বাবা: মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান  
মা: পারুল আক্তার
উচ্চতা: ৬ ফুট  
পড়াশোনা: দশম শ্রেণি
প্রথম ক্লাব: নসরুল হামিদ ক্রিকেট অ্যাকাডেমি, কেরানীগঞ্জ
বর্তমান ক্লাব: নসরুল হামিদ ক্রিকেট অ্যাকাডেমি, কেরানীগঞ্জ
প্রথম কোচ: আরিফ হোসেন সোলায়মান 
ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি, ওপেনার
প্রিয় শট: ফ্লিক  
যুব ওয়ানডেতে রান: ১১ ম্যাচে ২৮৩ রান
প্রিয় মানুষ: বাবা-মা   
প্রিয় ক্রিকেটার: কেন উইলিয়ামসন 
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: এশিয়া কাপ জয়