অভিজ্ঞ মুশফিক-মাহমুদউল্লাহর অপরিপক্ব ক্রিকেট

দেশ ছাড়ার আগে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত জানিয়েছিলেন, দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের অভিজ্ঞতা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কাজে লাগাবেন। ইতোমধ্যে দুটি মাচ খেলে ফেলেছে বাংলাদেশ, দুই ম্যাচেই ব্যাটিং ব্যর্থতায় হারতে হয়েছে। দলের অভিজ্ঞ দুই ব্যাটার মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ কোনও প্রভাব ফেলতে পারছেন না। উল্টো অপরিপক্ব ক্রিকেট খেলে দলকে বিপদে ফেলছেন তারা।  

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হবে বাংলাদেশ- দেশ ছাড়ার আগে অধিনায়ক শান্ত দেশবাসীকে স্বপ্ন দেখিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়নি। টানা দুই ম্যাচ হেরে এক ম্যাচ আগেই বাংলাদেশের বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটি হতে যাচ্ছে নিয়মরক্ষকার। খালি হাতেই আরও একটি আইসিসি টুর্নামেন্ট থেকে দেশে ফিরতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের মতো নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও একই গল্পের পুনরাবৃত্তি! সেই পুরানো ব্যাটিং ব্যর্থতা। রাওয়ালপিন্ডির ব্যাটিংবান্ধব উইকেটে বাংলাদেশের কোনও ব্যাটারই সাবলীল ক্রিকেট খেলতে পারেননি। বিশেষ করে হতাশ করেছেন দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ দুই ক্রিকেটার মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ। তবে টস হেরে একেবারে খারাপ শুরু হয়নি বাংলাদেশ দলের, ৮ ওভারে ২ উইকেট হারালেও স্কোরবোর্ডে রান ছিল ৬৪। তিন নম্বরে নামা আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান তাওহীদ হৃদয় শুরু থেকেই অস্বস্তি নিয়ে ব্যাটিং করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেননি। ২৪ বল খেলে করেছেন মাত্র ৭ রান। তার ফেরার পর মুশফিকের দায়িত্ব ছিল বিপর্যয় সামাল দেওয়ার। কিন্তু ২০ বছরের অভিজ্ঞতা গায়ে মাখা মুশফিক কান্ডজ্ঞানহীন শট খেলে দলকে অথৈ সাগরে ফেলে গেলেন। তার এমন শটে ধারাভাষ্যকার কক্ষেও হতাশা তৈরি হলো। ইয়ান স্মিথ তো বলেই দিলেন,  এত অভিজ্ঞতা নিয়ে এমন শট…।  ভারতের বিপক্ষে রানের খাতা না খুলেই আউট হন অভিজ্ঞ এই উইকেট কিপারব্যাটার।

মুশফিককে ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ বলা হয়। দ্বিপাক্ষিক সিরিজে দলের সংকটকালে নিজের ডিপেন্ডবল ভূমিকা বহুবার দেখালেও আইসিসি ইভেন্টে পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায়, মুশফিক সাকিব-তামিম-মাহমুদউল্লাহ-মাশরাফিদের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে। ওয়ানডে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি কিংবা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ কোনও আসরেই তার ব্যাট থেকে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স আসেনি। রঙিন পোশাকের ক্রিকেটের ১২টি আইসিসি ইভেন্টে অংশ নিয়েও মুশফিক বড় মঞ্চের ত্রাতা হতে পারেননি। ইতোমধ্যে দুই ম্যাচ খেলেও পুরো ব্যর্থ। 

বাজে শটে মুশফিকের বিদায়ের পর প্রত্যাশা ছিলো ইনজুরির কারণে ভারতের বিপক্ষে দলের বাইরে থাকা  মাহমুদউল্লাহ হয়তো দলের হাল ধরবেন। কিন্তু তিনিও করেছেন হতাশ। যে কারণে কিছুটা কম অভিজ্ঞ সৌম্যকে একাদশ থেকে বাদ দিয়ে বেশি অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহকে নেওয়া হয়েছে, তার কিছুই পূরণ করতে পারেননি তিনি। মূলত মুশফিক-মাহমুদউল্লাহর এমন ব্যর্থতাই দলকে বিপদে ফেলে দিয়েছে।

পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে নাম ধরে না বললেও অধিনায়ক শান্ত মিডল অর্ডার ব্যাটারদের দায় দেখছেন। অধিনায়কের করা এই দায় পুরোপুরিই বর্তায় মুশফিক-মাহমুদউল্লাহর কাঁধে, ‘হ্যাঁ অবশ্যই (মিডল অর্ডারের ব্যর্থতা বড় কারণ)। ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ ভালো উইকেট ছিল। আমাদের শুধু দুটি বড় জুটি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা যেভাবে ব্যাটিং করেছি, হতাশাজনক। বিশেষ করে প্রথম দশ ওভারের পর আমাদের আরও এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।’

দুই অভিজ্ঞ ব্যাটারের ব্যর্থতার মাঝে অধিনায়ক শান্ত ও জাকের আলী অনিক দলের স্কোরকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের চেষ্টায় দলের স্কোর দুইশ পেরোলেও সেটি জয়ের জন্য যথেষ্ট হয়নি। বিশেষ করে শান্তর স্ট্রাইকরেট নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই হয়। মুশফিক-মাহমুদউল্লাহদের মতো অভিজ্ঞ না হলেও তার অভিজ্ঞতাও কম নয়। কিন্তু তার স্লো ব্যাটিংও দায়ী বাংলাদেশের এমন হারে। ৭৭ রানের ইনিংস খেললেও বল খেলেছেন ১১০টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৫ রান করা জাকের খেলেছেন ৫৫ বল। বাংলাদেশের ইনিংসে ডট বল ছিল ১৮১টি। ৩০০ বলের ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটাররা ডট দিয়েছেন ১৮১টি। এখানেই তো ম্যাচ হেরে গেছে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা! 

স্কোরবোর্ডে কোনোমতে ২৩৬ রান তোলার পর বোলাররা যেভাবে বোলিং করেছেন, সেটি দেখে দর্শকদের মধ্যে হতাশা কাজ করেছে। ব্যাটারদের ব্যর্থতায় বোলারদের দারুণ পারফরম্যান্স কোনও কাজেই আসছে না। আগের ম্যাচে নাহিদ রানাকে খেলানো হয়নি। সোমবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নাহিদ খেলতে নেমে দারুণ করেছেন। ৯ ওভারে ৪৩ রান খরচায় শিকার করেছেন একটি উইকেট। অভিজ্ঞ তাসকিনও ছিলেন দুর্দান্ত। ৭ ওভারে ২৮ রান  খরচায় তার শিকার একটি উইকেট। তাসকিন ও নাহিদ দুজনই আজ কিউই ব্যাটারদের মনে ত্রাস ছড়াতে পেরেছন। আরেক পেসার মোস্তাফিজও ছিলেন দারুণ। সবমিলিয়ে বোলাররা প্রত্যাশা পূরণ করলেও ব্যাটারদের পারফরম্যান্সকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। বিশেষ করে অভিজ্ঞরা যেভাবে পারফরম্যান্স করছেন, সেটি দেখাই দৃষ্টিকটু।

এখন সময় হয়েছে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা মুশফিক-মাহমুদউল্লাদের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখা? নিজেদের নিজে প্রশ্ন করা, আর কতখানি অভিজ্ঞ হলে দলে অবদান রাখতে পারবেন তারা?