নামেই যার পরিচয়। ‘ড্রপ-ইন’ পিচ অর্থাৎ মাঠে স্থায়ীভাবে তৈরি করা নয়, অন্য কোথাও প্রস্তুত করে নিয়ে এসে ক্রিকেট মাঠে বসিয়ে দেওয়া হয়। বিশাল ক্রেনের সাহায্যে নির্দিষ্ট জায়গায় বসানো হয় এই পিচ। আবার ক্রিকেট ম্যাচ শেষ হয়ে গেলে সেটি তুলে সরিয়েও রাখা যায়।
কিন্তু কেন এমন পিচের প্রয়োজন হয়? কোথায় ব্যবহার করা হয়? আর ক্রিকেটে এই পদ্ধতির শুরুই বা কীভাবে? চলুন জেনে নেওয়া যাক ড্রপ ইন পিচের গল্প।
একই ভেন্যুতে একাধিক খেলা আয়োজন করতে হলে ড্রপ-ইন পিচ অত্যন্ত কার্যকর। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড (এমসিজি) এর বড় উদাহরণ। সেখানে গ্রীষ্মের খেলা ক্রিকেটের জন্য শুধু ক্রিকেট পিচটি ব্যবহার করা হয়। অন্য সময় ভেন্যুতে ফুটবলসহ অন্যান্য খেলা আয়োজনের জন্য পিচটি সরিয়ে রাখা হয়।
একটি ক্রিকেট পিচ প্রস্তুত করতে বেশ সময় লাগে। কিন্তু ক্রিকেট ও অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল লিগের (এএফএল) মৌসুমের মাঝের সময়টা এতটাই কম যে সেই সময়ের মধ্যে নতুন করে ক্রিকেট পিচ প্রস্তুত করা প্রায় অসম্ভব। তাই সেখানে ড্রপ-ইন পিচ গুরুত্বপূর্ণ সমাধান।
যেসব দেশে ক্রিকেট প্রধান খেলা নয়, সেখানেও এটি কার্যকর। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নাসাউ কাউন্টি ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পিচ তৈরি করা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে।
প্রথম কে ব্যবহার করেছিলেন?
ক্রিকেটের অনেক নতুন ধারণার মতো ড্রপ-ইন পিচের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে কেরি প্যাকারের নাম।
অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড প্যাকারের হাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেট ভেন্যুগুলো ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়ার পর তিনি বিকল্প পথে হাঁটেন। মেলবোর্নের ভিএফএল পার্ক, অ্যাডিলেডের ফুটবল পার্ক, সিডনির মুর পার্ক শোগ্রাউন্ড এবং পার্থের গ্লুচেস্টার পার্ক ইজারা নেন প্যাকার।
কিন্তু এগুলোর কোনোটিই ক্রিকেট স্টেডিয়াম ছিল না। ফলে কোথাও প্রস্তুত ক্রিকেট পিচও ছিল না। অনেকেই মনে করেছিলেন, এসব ভেন্যুতে ক্রিকেটের উপযোগী পিচ তৈরি করা সম্ভব হবে না।
তবে প্যাকারের কিউরেটর জন ডেলি অন্য পথ বের করেন। ভেন্যুর বাইরে ‘হটহাউস’-এ পিচ প্রস্তুত করা হয়। এরপর বিশাল ক্রেনের সাহায্যে সেই পিচ তুলে নিয়ে স্টেডিয়ামের ভেতরে বসানো হয়। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে ক্রিকেটে পরিচিতি পায় ড্রপ-ইন পিচ।
টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ব্যবহার কবে?
২০০০ সালে গ্যাবা স্টেডিয়ামে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের ফুটবল ম্যাচ হয়েছিল। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট আয়োজনের আগে হাতে ছিল মাত্র দুই মাসের মতো সময়। তখন কিউরেটররা সেখানে একটি ড্রপ-ইন পিচ বসান।
পিচটি ছিল পেসবান্ধব এবং ধীরগতির। সেই উইকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুই ইনিংসে যথাক্রমে ৮২ ও ১২৪ রানে অলআউট হয়। অস্ট্রেলিয়ার পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রা ম্যাচে অবিশ্বাস্য বোলিং করে ৩৩ ওভারে ২১টি মেডেনসহ মাত্র ২৭ রান দিয়ে ১০ উইকেট নেন।
ড্রপ-ইন পিচ কি ভালো?
অনেক ক্ষেত্রেই এটি কার্যকর সমাধান। বিশেষ করে যখন অন্য কোনও বিকল্প থাকে না। তবে ড্রপ-ইন পিচ মানেই যে সব সময় ভালো ক্রিকেট উইকেট হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
কারণ এগুলো প্রাকৃতিক পরিবেশে তৈরি হয় না। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এরপর নতুন পরিবেশ ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। বাড়তি যত্ন নেওয়ার পরও পিচ কতটা ভালো থাকবে, তার নিশ্চয়তা থাকে না।
মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ১৯৯৬ সাল থেকেই ড্রপ-ইন পিচ ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু ২০১৭ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার কোনও ক্রিকেট পিচ হিসেবে এমসিজির পিচ ‘দুর্বল’ রেটিং পায়।
এর দুই বছর পর, ২০১৯ সালে একটি শেফিল্ড শিল্ড ম্যাচ পিচের কারণে বাতিল হয়ে যায়। এরপর কর্তৃপক্ষ নতুন সেটের ড্রপ-ইন পিচ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।