কেরি প্যাকারের ওয়ার্ল্ড সিরিজ যেভাবে বদলে দিয়েছিল ক্রিকেট

আজকের ক্রিকেটে রঙিন জার্সি, ফ্লাডলাইটের আলোয় দিবারাত্রির ম্যাচ, সাদা বল, ড্রপ-ইন পিচ কিংবা টেলিভিশনের অসংখ্য রিপ্লে। সবই এখন খুব স্বাভাবিক। কিন্তু একটা সময় এসব ছিল ক্রিকেটের কল্পনারও বাইরে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯- কেরি প্যাকারের ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেট সেই পুরোনো ক্রিকেটকে ভেঙে নতুন এক যুগের দরজা খুলে দিয়েছিল। ক্রিকেট শুধু মাঠের খেলা হিসেবে থাকেনি, হয়ে উঠেছিল দর্শকের জন্য পূর্ণাঙ্গ বিনোদন এবং বড় ব্যবসার মঞ্চ।

১৯৭৭ সালে ত্রিশের শেষভাগে থাকা এক ব্যক্তি বাবার কাছ থেকে পাওয়া ব্যবসার দায়িত্ব নিয়ে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন। একটি সফল নারী ম্যাগাজিন চালু করেছিলেন তিনি। কিন্তু নিজের নাম প্রতিষ্ঠার জন্য আরও বড় কিছু করার অপেক্ষায় ছিলেন। খেলাধুলার মধ্যেই সেই সুযোগ খুঁজে পান কেরি প্যাকার।

খেলাধুলায় প্যাকার কেন এসেছিলেন, সেটি নিয়ে তিনি কখনও রাখঢাক করেননি। তিনি প্রচলিত অর্থে খেলাটির প্রেমে পড়ে পরিবর্তন আনতে চাওয়া মানুষ ছিলেন না। বরং ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট সিরিজের জন্মই হয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রচলিত ব্যবস্থার সরাসরি বিরোধিতা করে।

শুরুতে প্যাকারের লক্ষ্য ছিল ক্রিকেটের সম্প্রচার স্বত্ব কেনা। কিন্তু সেই চেষ্টায় সফল না হলে তিনি খেলাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা তথা খেলোয়াড়দের দিকে হাত বাড়ান।

জাতীয় ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে প্রথমে প্রায় ৩০ জন ক্রিকেটারকে দলে টানেন প্যাকার। কিন্তু ক্রিকেট সংস্থা যখন ওই খেলোয়াড়দের নিষিদ্ধ করে, তখন প্যাকারও পিছু হটেননি। অস্ট্রেলিয়া বনাম রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড বিশ্বের একটি সিরিজ আয়োজনের ধারণা থেকে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগে টনি গ্রেইগ, ডেরেক আন্ডারউড, অ্যালান নট ও জন স্নোর মতো ক্রিকেটাররা যোগ দেন।

এরপর একে একে বিশ্বের সেরা ক্রিকেটাররাও প্যাকারের দলে আসতে থাকেন। ক্লাইভ লয়েড, ভিভ রিচার্ডস, গর্ডন গ্রিনিজ, অ্যান্ডি রবার্টস, ইমরান খান, ব্যারি রিচার্ডস ও মাইক প্রক্টরদের মতো তারকারা যোগ দেন সেই বহরে। ‘দ্য গডফাদার’ সিনেমার ভাষায় বলতে গেলে, প্যাকার এমন এক প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা তারা ফিরিয়ে দিতে পারেননি। ক্রিকেটের প্রচলিত কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই খেলোয়াড়দের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিল।

শেষ পর্যন্ত সম্প্রচার স্বত্বের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেট বন্ধ করে দেন প্যাকার। দুই মৌসুমে তার এই প্রতিযোগিতায় মোট ৭০ জন ক্রিকেটার অংশ নিয়েছিলেন। আয়োজন করা হয়েছিল ১৬টি ‘সুপারটেস্ট’ ও ৩৮টি একদিনের ম্যাচ।

তবে মাত্র দুই মৌসুমেই সেই বিদ্রোহী অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটকে এমনভাবে বদলে দেন, যার প্রভাব আজও রয়েছে।

তখন ক্রিকেট সম্প্রচার হতো মূলত একটি ক্যামেরায়। ছয় বল দেখা যেত বোলারের প্রান্তের পেছন থেকে, পরের ওভারে ক্যামেরা চলে যেত ব্যাটসম্যানের পেছনে। প্যাকারের ক্রিকেটে সেই চিত্র বদলে যায়। টেলিভিশনে যুক্ত হয় অসংখ্য রিপ্লে, ম্যাচ সম্প্রচারে আসে নতুন মাত্রা।

দিনের অফিস সময়ে মাঠে গিয়ে খেলা দেখার সুযোগ যাদের ছিল না, তাদের জন্য ফ্লাডলাইট খুলে দেয় নতুন দরজা। রাতের আলোয় মাঠে বসে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সরাসরি ক্রিকেট উপভোগ করার সুযোগ তৈরি হয়। ক্রিকেট হয়ে ওঠে আরও বড় এক দর্শক বিনোদন।

একদিনের ক্রিকেটে ঐতিহ্যবাহী সাদা পোশাকের জায়গা নেয় রঙিন পোশাক। গ্রিনহাউজে তৈরি করে মাঠে বসানো হতো ড্রপ-ইন পিচ। এসব পিচে বল ব্যাটে তুলনামূলক ভালোভাবে আসতো, ফলে চার-ছক্কার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

শুধু দর্শক নয়, খেলোয়াড়দের জন্যও প্যাকারের বিপ্লব ছিল বড় পরিবর্তন। ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেটের আগে ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররা একটি টেস্ট খেলে যেখানে ২১০ পাউন্ড আয় করতেন, প্যাকারের যুগে সেটিই বেড়ে দাঁড়ায় ম্যাচপ্রতি ১ হাজার পাউন্ডেরও বেশি!

প্যাকার ও তার দল যেভাবে ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেট প্রচার করেছিল, তাতে মাত্র দুই বছরের মধ্যেই দর্শকদের মধ্যে এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। বিপুল সংখ্যায় মানুষ ম্যাচ দেখতে মাঠে ছুটে আসতো, অনেক সময় দর্শকসংখ্যা ৫০ হাজারও ছাড়িয়ে যেত। ক্রিকেটে হেলমেটের ব্যবহার জনপ্রিয় করে ব্যাটসম্যানদের আরও নির্ভীক করে তোলার কৃতিত্বেরও একটি অংশ প্যাকারকে দেওয়া হয়।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে বিপুল ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট আয়োজন হচ্ছে, তার নকশার জন্যও প্যাকারের ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেটের কাছে ঋণ স্বীকার করতে হয়।

প্যাকার একবার বলেছিলেন, ‘আমি তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় প্রবেশ করেছি, এটাই প্রমাণ করে ব্যবসাকে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হয়। নিয়মিত নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে হয়।’

নিজের কাজেও সেই কথারই প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন তিনি। পরিবর্তন করেছেন, সময়ের সঙ্গে এগিয়েছেন এবং বারবার নতুন করে ক্রিকেটকে আবিষ্কার করেছেন।