বাংলাদেশের হ্যাটট্রিক করা প্রথম পেসার হাসান, টেস্ট ইতিহাসে প্রথম কে?

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে এতদিন হ্যাটট্রিকের কীর্তি ছিল দুই স্পিনারের। একজন অলোক কাপালি, আরেকজন সোহাগ গাজী। চলমান বাংলাদেশ-আফগানিস্তান টেস্টে এসে পেসারদের হ্যাটট্রিকের আক্ষেপ দূর করেছেন হাসান মাহমুদ। প্রথম বাংলাদেশি পেসার হিসেবে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। টেস্টে এটি ৫০তম হ্যাটট্রিক। 

এবার জেনে নিই টেস্ট ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিক করা বোলারের গল্প। টানা তিন ডেলিভারিতে উইকেট নেওয়ার কীর্তিটি করেছিলেন একজন পেসার। সেটি করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ফাস্টবোলার ফ্রেড স্পফোর্থ। ১৮৭৯ সালের ২ জানুয়ারি মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই কীর্তি গড়ে অমর হয়ে আছেন তিনি। তার দুর্দান্ত বোলিংয়ে প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ড গুটিয়ে যায় মাত্র ১১৩ রানে। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ১০ উইকেটে জিতে নেয় অস্ট্রেলিয়া।

ক্রিকেটে হ্যাটট্রিকের গুরুত্ব শুধু পর পর তিনটি উইকেট নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বোলিং দলের হাতে তুলে দিতে পারে এই অর্জন। প্রায় দেড় শতাব্দী আগে স্পফোর্থের হ্যাটট্রিক ছিল তেমনই এক মুহূর্ত। তার টানা তিন বলে তিন উইকেট হারিয়ে ইংল্যান্ড এমন চাপে পড়ে, যেখান থেকে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যায়। স্পফোর্থের জন্য এটি ছিল ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ। সেই ম্যাচেই তিনি ক্রিকেটের ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে নেন।

কে ছিলেন ফ্রেড স্পফোর্থ?

১৮৫৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সিডনির বালমেইনে জন্ম নেওয়া লম্বা গড়নের ডানহাতি ফাস্টবোলার স্পফোর্থ ১৮৭৭ সালের মার্চে মেলবোর্নে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক করেন।

১৮৭৭ থেকে ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত ১০ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১৮টি টেস্ট খেলেন তিনি। এই সময়ে ১৮.৪১ গড়ে তার শিকার ছিল ৯৪ উইকেট। ক্যারিয়ারে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন ৭ বার, আর এক ম্যাচে ১০ বা তার বেশি উইকেট নিয়েছেন চারবার। টেস্টে তার সেরা বোলিং ৪৪ রানে ৭ উইকেট।

১৮৮৭ সালের জানুয়ারিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিডনি টেস্টই ছিল অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তার শেষ ম্যাচ।

তবে স্পফোর্থের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ক্যারিয়ার ছিল আরও দীর্ঘ। ১৮৭৪-৭৫ থেকে ১৮৮৭-৮৮ মৌসুম পর্যন্ত বিস্তৃত এই ক্যারিয়ারে ১৫৫ ম্যাচে ৮৫৩ উইকেট নেন তিনি। পাঁচ উইকেট পেয়েছেন ৮৪ বার, আর এক ম্যাচে ১০ বা তার বেশি উইকেট নিয়েছেন ৩২ বার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার সেরা বোলিং ১৮ রানে ৯ উইকেট। এই সংস্করণে তার বোলিং গড় ছিল মাত্র ১৪.৯৫।

যেভাবে এসেছিল টেস্টের প্রথম হ্যাটট্রিক

১৮৭৭ সালের মার্চে একই ভেন্যুতে অভিষেকের পর অস্ট্রেলিয়ার হয়ে পরের টেস্ট খেলার জন্য স্পফোর্থকে এক বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৮৭৯ সালের জানুয়ারিতে সেই সুযোগ আসে। অভিষেক টেস্টে চার উইকেট নেওয়া স্পফোর্থ এবার যে এমন ইতিহাস গড়বেন, তা তখনও কারও জানা ছিল না।

টস জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ইংল্যান্ড। শুরুতেই জর্জ ইউলিয়েটকে শূন্য রানে ফিরিয়ে দেন স্পফোর্থ। তার বোলিং সঙ্গী ফ্র্যাঙ্ক অ্যালান এরপর আলেকজান্ডার ওয়েব ও বানি লুকাসকে আউট করেন। পরে স্পফোর্থের শিকার হন মাঙ্কি হর্নবি। একপর্যায়ে ১৪ রানে চার উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে ইংল্যান্ড। পরে দলীয় সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৬ রানে চার উইকেট।

এরপরই টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া সেই তিনটি বল করেন স্পফোর্থ। রেভারেন্ড ভারনন রয়েল, ফ্রান্সিস ম্যাকিনন ও টম এমেটকে পরপর তিন বলে ফিরিয়ে দেন তিনি। ইংল্যান্ডের স্কোর তখন ২৬ রানে ৭ উইকেট। এই ধাক্কায় প্রথমবারের মতো টেস্টে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তিও গড়েন স্পফোর্থ।

ইংল্যান্ড তখন বড় বিপর্যয়ের মুখে। অধিনায়ক লর্ড হ্যারিস ৩৩ এবং চার্লি অ্যাবসোলম ৫২ রান করে কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন। অষ্টম উইকেটে তাদের ৬৩ রানের জুটি দলকে সাময়িক স্বস্তি দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফরকারীরা প্রথম ইনিংসে ১১৩ রানের বেশি করতে পারেনি। স্পফোর্থ ২৫ ওভারে ৪৮ রান দিয়ে নেন ৬ উইকেট।

টম এমেট ৬৮ রানে ৭ উইকেট নিলেও অস্ট্রেলিয়াকে বড় সংগ্রহ গড়তে আটকাতে পারেনি ইংল্যান্ড। স্বাগতিকরা প্রথম ইনিংসে ২৫৬ রান করে, ফলে তাদের লিড দাঁড়ায় ১৪৩। অ্যালেক ব্যানারম্যান ৭৩ রান করে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ স্কোরার হন। তার পাশাপাশি আরও সাত ব্যাটার দুই অঙ্কের রান করেন।

দ্বিতীয় ইনিংসেও ইংল্যান্ডের ব্যাটিংয়ে ধস নামান স্পফোর্থ ও অ্যালান। এবার স্পফোর্থ নিজের প্রথম ইনিংসের পারফরম্যান্সকেও ছাড়িয়ে যান। ৩৫ ওভারে ৬২ রান দিয়ে নেন ৭ উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসে হ্যাটট্রিক না পেলেও দুই ইনিংস মিলিয়ে তার শিকার দাঁড়ায় ১৩ উইকেট। ৬ উইকেটের পর এবার নেন ৭ উইকেট।

দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ডের ছয় ব্যাটার দুই অঙ্কের রান করলেও দলটি ১৬০ রানের বেশি করতে পারেনি। ফলে অস্ট্রেলিয়ার সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ১৮ রান। মাত্র ২.৩ ওভারেই সেই রান তুলে নিয়ে ১০ উইকেটের বড় জয় নিশ্চিত করে স্বাগতিকরা।