শাহারের রেফারিং করার অভিজ্ঞতা ১৭ বছর বয়স থেকে, যখন নিজ শহর হামার অনূর্ধ্ব-১৪ লিগে দায়িত্ব নেন। দামেস্ক, আলেপ্পো ও হোমসের পর সিরিয়ার চতুর্থ বড় শহরের ফুটবল দিয়ে তার এ অধ্যায় শুরু। প্রতিবেশী দেশ লেবাননের যুব গেমসেও অভিজ্ঞতা আছে শাহারের, ‘সিরিয়ায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগে দুই বছর কাটানোর পর ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সিরিয়ার প্রথম বিভাগে ছিলাম।’
কিন্তু বেশিদিন নিজ দেশে থাকতে পারেননি শাহার। গৃহযুদ্ধ করেছে তাকে দেশছাড়া। স্ত্রী লোবানাকে নিয়ে লেবানন ঘুরে গত বছরের অক্টোবরে জার্মানিতে পা রাখেন। ভাই জার্মানিতে থাকেন বলে গন্তব্য নিয়ে বেশি ভাবতে হয়নি তাকে। কিন্তু অন্য শরণার্থীদের সঙ্গে তুরস্ক হয়ে ইজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে আসতে কম কাঠখোঁড় পোড়াতে হয়নি তাকে। স্ত্রী লোবানা ছিলেন ৭ মাসের অন্তঃসত্তা। অনেক বেশি অর্থ খরচ করে নিরাপদে পৌঁছান জার্মানিতে। ওই কষ্টের সমুদ্রযাত্রার কথা মনে পড়লে এখনও শিউরে ওঠেন শাহার, ‘অর্ধেক পথ পাড়ি দিতেই মটর নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু নৌকার অন্য যাত্রীদের সহায়তায় আবার আমরা যাত্রা শুরু করি।’
অন্য আরও শরণার্থীদের মতো করে মেসিডোনিয়ায় যান বাসে চড়ে, এরপর সার্বিয়া। ট্রেনে করে একে একে পাড়ি দেন ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া ও অস্ট্রিয়ার সীমান্ত। সেখান থেকে জার্মান সীমান্ত পাসাউয়ে যান তারা, এরপর পৌঁছান গন্তব্য মিউনিখে। শাহার ফিরে গেলেন সেই দিনটায়, ‘মিউনিখে পুলিশ আমাদের বাস টিকিট দিল শরণার্থী কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি বললাম না, আমরা মিউনিখে যাচ্ছি না, বার্লিনে যাচ্ছি।’ তিনি ভেবেছিলেন জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের সদর দফতর বার্লিনে, ‘কিন্তু সেটা ছিল ফ্রাঙ্কফুটে। আমরা যখন বার্লিনে যেতে চাইলাম তখন পুলিশরা সুন্দর ব্যবহার করল এবং বার্লিনে যাওয়ার দুইটি টিকিট আমাকে দিল।’
এর আগে শাহারের পাসপোর্টে ওমানের ভিসা স্ট্যাম্প দেখে জার্মান পুলিশদের কেউ কেউ ভ্রু কুঁচকেছিল, তবে তিনি ব্যাখ্যা দেন যে একটি অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টে রেফারির দায়িত্ব পালন করতেই সেখানে গিয়েছিলেন, ‘আমি তাদের একটি ফটো দেখালাম। বললাম আমি একজন রেফারি।’
এরপর বার্লিন ফুটবল ফেডারেশনের সংস্পর্শে আসেন তিনি, যেখানে তাকে লান্দেসলিগা বার্লিনে (বার্লিন লিগের এক ধাপ নিচের প্রতিযোগিতা) ৩ ম্যাচ রেফারি হিসেবে পরীক্ষা দেন। শাহার বলেন, ‘লান্দেসলিগায় ম্যাচ শেষে বার্লিনার ফুসবল ভারব্যান্ড আমাকে একটি রেফারি ক্যাম্পে ডেকে পাঠাল। তারা আমাকে বলল- এখন তুমি বার্লিন লিগার একজন রেফারি। শুনে আমি খুব খুশি হলাম।’
গত রোববার বার্লিন লিগার পঞ্চম ম্যাচে রেফারির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পাঁচটি হলুদ কার্ড ও একটি লাল কার্ড দেখিয়ে সফলভাবে ম্যাচ পরিচালনা করেন শাহার। ওই ম্যাচের দল ডিজেকে এসডব্লিউ নিউকোয়েলনের খেলোয়াড় মার্কো ফিঙ্ক তার প্রশংসা করলেন, ‘তার দারুণ ম্যাচ ছিল এটা। অসাধারণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।’ লাল কার্ড দেয়াটা যৌক্তিক ছিল মনে করেন ফিঙ্ক।
স্থানীয় লিগের ফটোগ্রাফার ক্রিস্টোফ লেহনার শাহারকে বেশ কয়েকবার দেখেছেন। তার মতে, খেলোয়াড়দের সঙ্গে ভাষাগত যোগাযোগ এ সিরীয় রেফারির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অবশ্য ইংলিশ ও জার্মান ভাষার অল্পস্বল্প জানা আছে শাহারের, ‘খেলোয়াড়রা আমাকে কী বলছে সেটা বুঝতে আমার কিছুটা সমস্যা হয়। কিন্তু আমি যেটা আমি বুঝি না, মনের মধ্যে রেখে দেই। সহকারীরা আমাকে অনেক সহায়তা করে।’ ভাষাগত অদক্ষতাকে শীর্ষ লিগে পৌঁছানোর অন্তরায় হিসেবে দেখছেন ২৭ বছর বয়সী, ‘জার্মানিতে একজন ভালো রেফারি হতে আমি অবশ্যই কঠোর পরিশ্রম করব। আমি এখন বুন্দেসলিগায় পৌঁছাতে ধাপে ধাপে কাজ করছি।’
বার্লিনের একটি স্কুলে সাঁতারের ইন্সট্রাক্টর হিসেবেও কাজ করেন শাহার। পাশাপাশি জার্মান ভাষাটাও শিখছেন ধীরেসুস্থে। এছাড়া জার্মানির মাটিতে গত বছরের ৩ ডিসেম্বর সন্তানের বাবা হওয়ার স্বাদটা উপভোগ করছেন তিনি।। ছেলে নিদালকে সময় দিতে ভোলেন না ব্যস্ততার মাঝেও।
তবে সবসময় ইতিবাচক থাকছেন শাহার। শীর্ষ পর্যায়ে রেফারিং করার স্বপ্নকে এতটুকু ম্লান হতে দেননি, ‘আমি বুন্দেসলিগার এক ও দুই নম্বর বিভাগে যাওয়ার আশা করি। পরের পর্যায়ে অর্থাৎ বুন্দেসলিগায় যেতে আমি প্রত্যেক দিন কঠোর পরিশ্রম করি। কারণ বুন্দেসলিগা বিশ্বের অন্যতম সেরা লিগ।’ ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েবকে আদর্শ মানেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী শাহার, ‘আগামী পাঁচ বা ছয় বছরের মধ্যে সম্ভবত আমি জার্মান নাগরিকত্ব পাব। জার্মানি থেকে আন্তর্জাতিক রেফারি হিসেবে কাজ করতে পারব আশা করি। এটাই আমার স্বপ্ন।’ তথ্যসূত্র: ইএসপিএন এফসি