ছুটে চলা বাংলাদেশের মহিলা ফুটবল

অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর বাংলাদেশের মেয়েদের উল্লাসমেয়েদের ফুটবলে আলোকিত বাংলাদেশ। গত মাসেই অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তিশালী দল হয়ে ওঠা বাংলাদেশের মহিলা ফুটবলের উত্থান, বেড়ে ওঠা, সাফল্যের গল্পের প্রথম পর্ব আজ-

মেয়েদের স্কুল ফুটবল চালু হওয়ার পর অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে অনেক, যা বাংলাদেশের ফুটবলে রেখেছে সবচেয়ে বড় ভূমিকা। ক্যাম্পিং ও একসঙ্গে অনেক দিন খেলাটাও বাংলাদেশের তরুণীদের নজরকাড়া পারফরম্যান্স ও সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনে প্রধান উপাদান। এমনকি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার ভাষ্য, বাংলাদেশের মেয়েদের উত্থান সবার জন্য দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে সংস্থাটি এও জানিয়েছে, তারা বিশ্বে মেয়েদের ফুটবলের উন্নতির পথে ‘রোল মডেল’।

পাঁচ বছর আগেও বাংলাদেশের মহিলা ফুটবলে প্রভাব বিস্তার করেছে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মেয়েরা। সরকার প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ের প্রতিযোগিতা শুরু করার পর দেশের সব জায়গা থেকে খেলোয়াড় বের হতে থাকে। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, সিলেট ও কক্সবাজারের মেয়েরা অবদান রাখতে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে; বিশেষ করে ময়মনসিংহের একটি জায়গা থেকে এসেছে সবচেয়ে বেশি।

দেশের ফুটবল নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সঙ্গে নিবেদিত স্থানীয় কোচদের একটা দল ও আয়োজকরা সরকারের মেগা প্রকল্পে নগদ অর্থায়ন করে বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের জন্য সেরা খেলোয়াড়দের বেছে নিয়েছে, যাদের অনেকে কয়েক বছর ধরে মূল জাতীয় দলের স্কোয়াডেও প্রভাব বিস্তার করছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজেদের প্রমাণ দিয়ে এই মেয়েরা এখন এশিয়ার আট দলের সেরা। এই খেলার সঙ্গে জড়িত কর্তৃপক্ষের বিশ্বাস, আধুনিক ফিটনেস অনুশীলন, সঠিক একাডেমি সুবিধা ও সরকার থেকে আরও সমর্থন পেলে এই কিশোরীরা সিনিয়র পর্যায়েও এশিয়ার সেরা হয়ে দেখাবে।

২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) মহিলা উইং কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন মাহফুজা আক্তার কিরণ। তার মতে, আর্থিক প্রতিবন্ধকতা মেয়েদের একাডেমি সুবিধার পেছনে বড় বাধা হয়ে আছে। মেয়েদের বেশিরভাগ সময় ক্যাম্প করতে হয় বাফুফের মতিঝিলের ডরমিটরিতে। মেয়েদের অনুশীলন করতে হয় কাছের কৃত্রিম টার্ফে, যেটা আবার ব্যবহার করা হয় আরও অন্য খেলায়। কিরণের সঙ্গে কোচ ও খেলোয়াড়রা একটা জিম চাইছেন এক বছর ধরে, যদিও সেটা হয়নি।

বিকেএসপির একটা অংশ মেয়েদের দেওয়ার আলোচনা হলেও সেটা মহিলা ফুটবলের উন্নতিতে কতটা কাজে দেবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে সাফল্য পেলেও বিকেএসপির ছোট্ট একটা অংশে অনুশীলনের সুবিধা পেয়ে সিনিয়র পর্যায়ে ধারাবাহিকতা ধরে রাখাটা কঠিন।

কিরণ মহিলা উইং কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেছেন ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত। ‘২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মহিলা ফুটবলের অবস্থাটা স্বাভাবিক ছিল, মাত্র কয়েকটা জেলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল মহিলা ফুটবল।’- মঙ্গলবার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেছেন কিরণ। তিনি আরও যোগ করেছেন, ‘বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবল থেকে আমরা লাভবান হয়েছি। এর মাধ্যমে গোটা দেশ জানতে পেরেছে মেয়েদের ফুটবল সম্পর্কে।’

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ড কাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতা শুরু হয় ২০১১ সালে। যেখানে প্রত্যেক বছর ৬৪ হাজার স্কুলের প্রায় ১০ লাখের উপরে মেয়ে ফুটবলার অংশ নিচ্ছে। বাফুফে বিশেষভাবে দেখভাল করছে ৩৯ জন তরুণীকে, যারা সাম্প্রতিক সময়ে দেশের জার্সিতে আলাদা আলাদা দলের হয়ে খেলেছে। এই খেলোয়াড়দের ৩৮ জনই এসেছে বিশ্বের অন্যতম এই (বঙ্গমাতা গোল্ড কাপ) ফুটবল প্রতিযোগিতা থেকে।

২০০৯ সাল থেকে মহিলা ফুটবল দলকে খুব কাছ থেকে দেখভাল করছেন প্রধান কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটন। এর এক বছর আগেই, ২০১০ সালে দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে জাতীয় মহিলা দল প্রথম কোনও আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার স্বাদ পায়। ছেলেদের ফুটবল শুরুর ৩২ বছর পর বাংলাদেশের মেয়েরা পা রাখে আন্তর্জাতিক ফুটবলে। ছোটন জানিয়েছেন, ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মোট ৩৬ জন মেয়ে ফুটবলার খেলেছে। এদের সবাই এসেছে মাত্র পাঁচটি জেলা- রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, সাতক্ষীরা, যশোর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে।

নিয়মিত স্কোয়াডে থাকা সদস্যদের বড় অংশ এসেছে আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের মাতৃতান্ত্রিক পরিবার থেকে। যদিও আলাদা ছিলেন সাবিনা খাতুন, এসেছেন তিনি সাতক্ষীরা থেকে। জাতীয় ও ঘরোয়া পর্যায়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা সাবিনা এখনও নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতীয় মহিলা দলকে। কোচিং কোর্সের ‘বি’ লাইসেন্সের প্রথম পর্ব শেষ করার পর তিনি এখন মেয়েদের যুব দলের কোচিং স্টাফের চারজনের একজন।

‘আমি যখন কোচিং শুরু করি, মহিলা ফুটবলের যাত্রাও শুরু হয়েছে তখন। প্রতিযোগিতা ও অনুশীলন সুযোগ-সুবিধার অভাব ছিল তখন। তবে ২০১১ সাল থেকে শুরু হয় মহিলা ফুটবলের কার্যক্রম। এখনকার মেয়েরা লম্বা সময় ধরে অনুশীলন করতে পারে, একসঙ্গে অনেক ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়, আর তাদের মধ্যে একতাও অনেক। যেটা আসলে তাদের ফুটবল খেলাটা সহজ করে দিয়েছে।’- মঙ্গলবার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেছেন সাবিনা।

অবদান আছে কিছু কোচ কাম উদ্যোক্তাদেরও। সাতক্ষীরার আকবর আলী, নারায়ণগঞ্জের বিদ্যুৎ ও যশোরের সাচ্চু তাদের নিজ নিজ এলাকায় সমাজের বেড়াজাল ভেঙে সাহায্য করেছেন মেয়েদের এবং দেখিয়েছেন ঢাকার পথ। সাবিনার সঙ্গে আরও অনেক তরুণী ফুটবল শিখেছেন আকবরের কাছে, যার দুই মেয়ে মুক্তা ও রিক্তা ২০১২ সাল থেকে খেলছে বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের হয়ে।

উপজাতিরা মহিলা ফুটবলে রাখছে বিশেষ অবদান। পাহাড়ি এলাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠায় তারা যেমন স্বাধীন, তেমনি হয় অ্যাথলেটিক ও কঠোর পরিশ্রমী। সাবিনা জানিয়েছেন, তারা নিজেদের ঝালিয়ে নিয়েই যোগ দিয়েছিলেন জাতীয় দলে। খাগড়াছড়ির অম্রা চিং মারমা ও রাঙামাটির সুইনু প্রু মারমা ২০১৪ সাল থেকে জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ দুই খেলোয়াড়।

স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতা দেশের সব কোনায় ছড়িয়ে যাওয়ার পর ও ২০১৩ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল প্রতিযোগিতা চলাকালীন ময়মনসিংহের গারো পাহাড় এলাকা ও মধুপুর তাদের স্কুল ফুটবলের দাপট দেখায়, যা নজর কাড়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের স্কাউটিং কোচদের। (শেষ পর্ব পড়ুন আগামীকাল)

(ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত)