২০১৪ বিশ্বকাপ: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লজ্জা।
পার্থক্যটা ৬৪ বছরের। তবে টাইম মেশিনে চেপে একই সুতোয় গাঁথা ব্যর্থতার দুটো অধ্যায়। ‘ট্র্যাজেডি’ ঢাকতে গিয়ে উল্টো ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লজ্জা’য় মুখ লুকাতে হয় ব্রাজিলিয়ানদের। মারাকানার হাহাকার মিনেইরোর কান্নার স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ব্যর্থতার সাগরে। উরুগুয়ে পাশ কাটিয়ে জার্মান ‘ভূত’ চেপে বসে ব্রাজিলিয়ানদের ঘাড়ে।
এমনকি উরুগুইয়ানরাও মেনে নিয়েছিল মারাকানার ফাইনাল জিতে উল্লাস করতে যাচ্ছে ব্রাজিল। সাম্বার দেশের মানুষ তো উৎসবের সব উপলক্ষ প্রস্তুত করে রেখেছিল স্পেনকে হারানোর পর থেকেই। মারাকানায় সেদিন ইতিহাসের সাক্ষী হতে হাজির হয়েছিল রেকর্ড ২ লাখ মানুষ। তা হওয়ারই কথা। একে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ, এর ওপর আবার গোটা টুর্নামেন্টে সেলেসাওদের দাপট। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ব্রাজিল বাদ দিয়ে অন্য কোথাও যাবে, সেই ভাবনা জন্ম হওয়ার সুযোগ কই!
কারণ? গ্রুপ পর্বে দাপট দেখিয়ে চূড়ান্ত পর্বে স্বাগতিকরা সুইডেনকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর স্পেনকে বিধ্বস্ত করে ৬-১ ব্যবধানে। বিপরীতে উরুগুয়ে মাত্র এক ম্যাচ খেলে চূড়ান্ত পর্ব নিশ্চিতের পর স্পেনের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে সুইডেনের বিপক্ষে পেয়েছিল ৩-২ গোলের কষ্টার্জিত জয়। সেই উরুগুয়েই সব হিসাব পাল্টে দিয়ে স্তব্ধ করে দেয় গোটা ব্রাজিলকে। ঘরের মাঠের বিশ্বকাপের চরম ধাক্কায় শোকের নগরীতে পরিণত হয় লাতিন দেশটি।
২-১ গোলের হারের সেই ক্ষত ৬৪ বছর ধরে বুকের ভেতর কামড়ে মেরেছে ব্রাজিলিয়ানদের। ওই আসরের পর পাঁচটি বিশ্বকাপ এসেছে ঘরে, সবার চেয়ে বেশি ট্রফি জেতার রেকর্ডটাও নিজেদের করে নিয়েছে, ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০- চার আসরের মধ্যে তিনবার উৎসব করেছে, তবু মারাকানা ট্র্যাজেডি মুছে ফেলতে পারেনি ব্রাজিল। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জিততে পারলে তবেই দূর হবে হাহাকারের পর্ব। ২০১৪ সালে সেই সুযোগটা এসে যাওয়ায় শাপমোচনের মঞ্চ তৈরি হয়ে যায়। প্রতিযোগিতা শুরুর অনেক আগে থেকেই ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়রা নেন মারাকানাজো ভুলিয়ে দেওয়ার শপথ।
যে প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুদায়িত্ব ছিল নেইমারের কাঁধে। তার হাত ধরেই এগিয়ে চলছিল স্বপ্নের রথ। কিন্তু বিধাতার লিখনে বেলো হরিজোন্তোর এস্তাদিও মিনেইরোর সেমিফাইনালে খেলার সুযোগ হলো না ব্রাজিলিয়ানদের স্বপ্নপূরণের নায়কের। কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে কোমর ভেঙে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে গেলেন ছিটকে, সঙ্গে নিয়ে গেলেন ব্রাজিলিয়ানদের স্বপ্নটাও। ওই ম্যাচেই আবার হলুদ কার্ড দেখায় জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালে নিষিদ্ধ হন অধিনায়ক থিয়াগো সিলভা। রক্ষণ ও ফরোয়ার্ডের দুই সেরা খেলোয়াড়কে হারিয়ে মানসিকভাবে কতটা ভেঙে পড়েছিল সেলেসাওরা, তার বর্ণনা দেওয়া কঠিন ছিল ম্যাচের পর।
এরপরও নাকি ‘সেরা পারফরম্যান্সের ম্যাচ ছিল না’ জার্মানির! জোড়া গোল করে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতা টোনি ক্রোস জানিয়েছিলেন তেমনই। সঙ্গে এটাও নিশ্চিত করেছিলেন, ব্রাজিলিয়ানদের ‘বেশি লজ্জা’ দিতে চাননি তারা। অধিনায়ক ফিলিপ লাম বলেছিলেন, ‘বিরতির সময় আমরা আলোচনা করেছিলাম, (ব্রাজিল) ওদের আর গোল দেব না।’ দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য আরও ২ গোল দিয়েছিল জার্মানরা বদলি খেলোয়াড় আন্দ্রে শুর্লের লক্ষ্যভেদে। তবে উদযাপনে ছিল না কোনও দম্ভ।
বিপরীতে মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়া দাভিদ লুইজ-অস্কারদের মুখের মলিন ছবিতে বোঝা যাচ্ছিল তাদের মনের ভেতর কী চলছে। ঘরের মাঠের সেমিফাইনালে সমর্থকদের চাপ, দলের সেরা দুই খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি ও শুরুতেই ২ গোলে পিছিয়ে পড়ার ধাক্কাটা এত জোরে লেগেছিল সেলেসাওদের ওপর, দেখতে দেখতে ছয় মিনিটের মধ্যে হয়ে গেল ৪ গোল!
মারাকানোজো তাড়াতে গিয়ে তাই মিনেইরোর ভূত চেপে ধরে ব্রাজিলিয়ানদের। এক আঘাত থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টায় নতুন ঝড়ে ক্ষত-বিক্ষত লাতিন দেশটি। ৬৪ বছর আগের ট্র্যাজেডিই ভুলতে পারেনি ব্রাজিলিয়ানরা, আর মিনেইরোর ঘটনা তো বছর চারেক আগের কথা। সাম্বার দেশের ফুটবল সমর্থকদের স্বপ্নেও নাকি হানা দেয় মিনেইরোর ৭-১ গোলের হার! চেপে ধরা জার্মান ‘ভূত’ থেকে মুক্তি চায় তারা।
ফুটবল দেবতার কী ইচ্ছা, এই ম্যাচেও নেই নেইমার! অবশ্য তাকে ছাড়াও দুর্দান্ত এই ব্রাজিল। তিতের অধীনে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে সেলেসাওরা এখন অপ্রতিরোধ্য। জার্মান ‘ভূত’ তাড়াতে আসল ওঝা তো তিনিই!