দীর্ঘদেহী, সাদা-পাকা চুল, একাগ্র মনে কাজ করতেন। ফুটবলই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। জর্জ কোটান এখনও বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে আছেন। ২০০৩ সালে বাংলাদেশকে সাফ ফুটবলের শিরোপা উপহার দিয়েছিলেন, যা আজও একমাত্র শিরোপা। অস্ট্রিয়ান কোচ কোটানের যোগ্য উত্তরসূরী আর পায়নি বাংলাদেশ। এরপর ৬টি টুর্নামেন্ট হলেও সোনালি ট্রফি আর ছোঁয়া হয়নি। শেষ তিনটি সাফ ফুটবলে তো গ্রুপ পর্বের বাধাই পেরোতে পারেনি।
আর্জেন্টাইন আন্দ্রেস ক্রুসিয়ানির অধীনে ২০০৫ সালে অবশ্য শিরোপার কাছাকাছি গিয়েছিল লাল-সবুজ দল। কিন্তু পাকিস্তানের করাচি থেকে ট্রফি নিয়ে ফেরা সম্ভব হয়নি, ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে যায় তারা। এমনকি ২০০৯ সালে ঘরের মাঠেও ধরা দেয়নি সাফল্য। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে সেমিফাইনালে সেই ভারতই হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল এদেশের ফুটবল-ভক্তদের। এরপর ‘দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ’ নামে পরিচিত সাফ ফুটবল মানেই বাংলাদেশের ব্যর্থতার গল্প।
আসলে বাংলাদেশের ফুটবল আর হতাশা এখন সমার্থক শব্দ। বছর দুয়েক আগে এশিয়া কাপের প্রাক-বাছাই পর্বে ভুটানের কাছে ৩-১ গোলে হার দেশের ফুটবলের এক লজ্জার অধ্যায়। এরপর থেকে নামতে নামতে ফিফা র্যাংকিংয়ে ২১১ দলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এ মুহূর্তে ১৯৪!
অনেক দিনের হতাশার পর আশার আলো দেখাচ্ছে সদ্য সমাপ্ত এশিয়ান গেমস। ইন্দোনেশিয়ায় জেমি ডে’র শিষ্যদের পারফরম্যান্স ছিল আশাতীত। কাতার-থাইল্যান্ড-উজবেকিস্তানের সঙ্গে কঠিন গ্রুপে পড়া বাংলাদেশকে অনেকেই হয়তো পাত্তা দিতে চায়নি। তাদের সমুচিত জবাব দিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। উজবেকিস্তানের কাছে হেরে শুরুটা ভালো হয়নি। তবে থাইল্যান্ডের সঙ্গে ড্র আর কাতারকে হারিয়ে এশিয়াডে প্রথমবারের মতো নিশ্চিত করেছে নকআউট পর্ব। শেষ ষোলোতে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে লড়াই করে হারও কম কথা নয়।
এশিয়াড ফুটবল অবশ্য মূলত অনূর্ধ্ব-২৩ দলের লড়াই। তবে প্রতিটি দল ২৩-ঊর্ধ্ব তিনজন খেলোয়াড় রাখতে পারে। অন্যদিকে সাফ ফুটবল জাতীয় দলের প্রতিযোগিতা। কিন্তু যে দলই খেলুক, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের লড়াই করার মানসিকতা আশাবাদী করে তুলেছে ফুটবলপ্রেমীদের। জেমি ডে’র কোচিংয়ে ফুটবলারদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে নিঃসন্দেহে। তাদের ফিটনেসে উন্নতি হয়েছে, খেলার গতি বেড়েছে। লড়াকু মানসিকতাই যে বাংলাদেশের সাফল্যের বড় কারণ, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের শোকেসে শোভা পাচ্ছে মাত্র চারটি আন্তর্জাতিক ট্রফি—১৯৯৫ সালে মিয়ানমারে চার জাতি ফুটবল, ১৯৯৯ সাফ গেমস ও ২০১০ এসএ গেমসের সোনা এবং ২০০৩ সালে সাফ ফুটবলের শিরোপা। ভারত তো সব সময়ই কঠিন প্রতিপক্ষ, নেপাল-মালদ্বীপের সঙ্গেও বাংলাদেশের তেমন সাফল্য নেই ইদানীং। সাফ ফুটবল নিয়ে তাই হয়তো তেমন উচ্ছ্বাস নেই ফুটবলপ্রেমীদের। তবে এশিয়াড নতুন আলোর সন্ধান দিচ্ছে। সেই আলোর বিচ্ছুরণে নতুন সূর্যোদয় ঘটবে বাংলাদেশের ফুটবলে?