ন্যু ক্যাম্পের এই ম্যাচ নিয়ে শঙ্কা অবশ্য এখনও যায়নি। নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো এল ক্লাসিকোতে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিরল এক দৃশ্য দেখছে ফুটবল বিশ্ব। বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়েরা থাকছেন একই হোটেলে! ন্যু ক্যাম্প থেকে মাত্র ৬০০ মিটার দূরের প্রিন্সেসা সোফিয়া হোটেলে। মাঠের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের আগেই তাই এল ক্লাসিকো ঘিরে অন্যরকম কৌতূহল।
কাতালুনিয়ার স্বাধীনতাপন্থী নেতাদের কারাদণ্ডের প্রতিবাদে অক্টোবরে শুরু হওয়া বিক্ষোভের আগুন এখনও নেভেনি। স্বাধীনতার দাবিতে তাদের আওয়াজ মাদ্রিদের বিরুদ্ধে, ফুটবলে যাদের প্রতিনিধিত্ব করে রিয়াল। অন্যদিকে ফুটবল দিয়ে কাতালুনিয়ার হয়ে জোরালো প্রতিবাদ করে থাকে বার্সেলোনা। এল ক্লাসিকো তাই ফুটবল ছাড়িয়ে রাজনীতি ও অধিকার আদায় পর্যন্ত বিস্তৃত। এবারের মঞ্চটা যে আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে ঝাঁঝালো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পয়েন্ট টেবিলের দিকে তাকালেও উত্তেজনা স্পষ্ট। ১৬ ম্যাচ শেষে দুদলেরই সমান ৩৫ পয়েন্ট। গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় শীর্ষে বার্সেলোনা। ন্যু ক্যাম্পের ম্যাচের হার-জিত শিরোপার গতিপথে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আর এই জায়গায় গত মৌসুমের ঘরের মাঠের এল ক্লাসিকো থেকে আত্মবিশ্বাস নিতে পারে বার্সেলোনা। গতবার রিয়ালকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে নিজেদের দাপট দেখিয়েছিল কাতালানরা। চতুর্থবারের চেষ্টায় ঘরের মাঠে এসেছিল তাদের প্রথম জয়।
অথচ এই বার্সেলোনাই সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে গেলে অন্য চেহারা নেয়। রিয়ালের মাঠে তাদের টানা চার জয়ের রেকর্ড। প্রতিপক্ষের মাঠে দাপটের উল্টো দিকে ঘরের মাঠে ম্রিয়মান পারফরম্যান্সের কারণ কী? অধিনায়ক লিওনেল মেসি জানালেন, বার্নাব্যুতে ‘খেলার জায়গা বেশি পাওয়ায়’ বার্সেলোনা ভালো করে।
স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক ‘মার্কা’য় দেওয়া সাক্ষাৎকারে হোম-অ্যাওয়ে এল ক্লাসিকোর সাফল্যের হার নিয়ে কথা বলেছেন মেসি। বার্নাব্যুতে বার্সেলোনার সাফল্য নিয়ে ছয়বারের ব্যালন ডি’অর জয়ীর ব্যাখ্যা, ‘বার্নাব্যুতে খেলার সময় আমরা বেশি জায়গা তৈরি করতে পারি। তারা (রিয়াল) আমাদের ওপর বেশি আক্রমণ চালায়, আর এটাই স্বাভাবিক, কারণ তারা ঘরের দল হওয়ায় সুবিধা নিতে চায়।’
মেসির কাছে ন্যু ক্যাম্পে সাফল্যের হার কম থাকার ব্যাখ্যাটা আবার অন্যরকম, ‘ন্যু ক্যাম্পে তারা অন্যরকম ফুটবল খেলে। কিছুটা পিছিয়ে রক্ষণ জমাট রাখে এবং কাউন্টার অ্যাটাকে ঘায়েল করতে চায়। কারণ আক্রমণে তাদের খুব দ্রুতগতির খেলোয়াড় রয়েছে।’ সঙ্গে যোগ করলেন, ‘বার্নাব্যুতে আমরা ৯০ মিনিট তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলি। কিন্তু এখানে (ন্যু ক্যাম্পে) খেলা খুব আঁটসাঁটো থাকে এবং খুব জটিলও।’
রিয়ালের বাধার দেয়াল ভেঙে অবশ্য ন্যু ক্যাম্পের সর্বশেষ এল ক্লাসিকোতে বড় সাফল্য এসেছিল বার্সেলোনার। যদিও লুই সুয়ারেসের হ্যাটট্রিকে ৫-১ গোলে জেতা ম্যাচে চোটের কারণে ছিলেন না মেসি। চলতি মৌসুমেও দুর্দান্ত ফর্মে থাকা আর্জেন্টাইন তারকার এবারের রূপটা আরও ভয়ঙ্কর। রিয়ালের জন্য চিন্তার বিষয়ই বটে!
যদিও ‘লস ব্লাঙ্কোস’ কোচ জিনেদিন জিদান ক’দিন আগেই ষষ্ঠ ব্যালন ডি’র হাতে তোলা মেসিকে নিয়ে খুব একটা ভাবছেন না। কেন? শুনুন তাঁর মুখেই, ‘জানি আমরা কার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। এটাও জানি তাদের মেসি আছে। তবে আমাদের নিজেদেরও অস্ত্র রয়েছে। বার্সেলোনার বিপক্ষে দারুণ একটি ম্যাচ খেলতে যাচ্ছি আমরা, তাদেরও নিশ্চয়ই একই প্রত্যাশা।’
নতুন সূচিতে হতে যাওয়া এল ক্লাসিকো বলতে গেলে ন্যু ক্যাম্পের উনুনে পড়তে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বৈরিতা বাড়তি উত্তাপ ছড়ালেও জিদানের চোখ শুধু মাঠের ফুটবলেই, ‘সপ্তাহ জুড়ে বাইরে অনেক কিছুই আলোচনা হচ্ছে। তবে লোকজন চায় শুধু ভালো ফুটবল ম্যাচ দেখতে। আমরা নিজেদের সর্বোচ্চটা দিতেই মাঠে নামব।’
এই ম্যাচ দিয়ে এল ক্লাসিকোতে অভিষেক হচ্ছে আতোঁয়ান গ্রিজমানের। গত গ্রীষ্মের দলবদলে আতলেতিকো মাদ্রিদ থেকে ১২০ মিলিয়ন ইউরোতে তাকে এনেছে বার্সেলোনা। পায়ের চোটে অবশ্য খেলা হচ্ছে না রিয়ালের এডেন হ্যাজার্ডের। তবে মাদ্রিদের জার্সিতে এল ক্লাসিকোতে অভিষেক হয়ে যেতে পারে ফর্মে থাকা তরুণ রোদ্রিগোর।
নতুন খেলোয়াড়, নতুন মৌসুমের সঙ্গে নতুন ম্যাচ— কিন্তু উত্তাপটা আগের মতোই। এল ক্লাসিকো বলে কথা!