সোনার মেয়েদের স্বর্ণালি আনন্দভ্রমণ

সবশেষ রাজপথে কবে এমন দৃশ্য দেখা গেছে, স্মৃতি হাতড়ে বের করা কঠিন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বাফুফে ভবন পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশের অনেক স্থানে হাজারো উৎসুক মানুষের ভিড়। কারও হাতে লাল-সবুজ পতাকা উড়ছে, কেউ বা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে এসেছেন। সবাই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন প্রিয় খেলোয়াড়দের এক পলক দেখতে। প্রচণ্ড গরমেও উৎসাহে কমতি ছিল না। আর এই ভালোবাসার জবাব দিয়েছেন সাবিনারা একটু অন্যভাবে। সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ট্রফি নিয়ে ছাদখোলা বাসে করে সাবিনা-সানজিদারা শহর প্রদক্ষিণ করে ফুটবলপ্রেমীদের অভিবাদনের জবাব দিয়েছেন। এই দৃশ্য বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিরল!

সাফজয়ী অদম্য মেয়েদের বরণ। ছবি: সাজ্জাদ হোসেনসাবিনা-স্বপ্নারা আগেও বয়সভিত্তিক ফুটবলের ট্রফি জিতেছেন। দেশে কিংবা দেশের বাইরে। কিন্তু কখনোই এমন অভূতপূর্ব দৃশ্যের মুখোমুখি হননি। আগে গ্যালারি কিংবা মাঠ থেকে বের হয়ে আসার সময় প্রশংসা কুড়িয়েছেন। এবার বাঁধভাঙ্গা উল্লাস। বল্গাহীন আনন্দ। আগের সবকিছুকেই ছাপিয়ে গেছে। অনন্য অর্জনে উৎসবে মেতেছে সবাই।

আগে কখনও সাবিনারা পাননি হাজারো মানুষের এমন উজাড় করে দেওয়া ভালোবাসা। বেলা বাড়তেই বিমানবন্দরে উৎসুক জনতার ভিড় বাড়তে থাকে। আর সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের জনাকীর্ণ উপস্থিতি তো ছিলই। তখনও ছাদখোলা বাসটি আসেনি। বিমান বাংলাদেশের এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি দেশের মাটি স্পর্শ করার পরই বিমানের ভেতরেই কেক কেটে উদযাপন করা হয়েছে মুহূর্তটি।

সাফজয়ী অদম্য মেয়েদের বরণ। ছবি: সাজ্জাদ হোসেনভিআইপি লাউঞ্জে তখন ঘোষক বারবার সাফজয়ী চ্যাম্পিয়ন দলকে অভিনন্দন বার্তা দিচ্ছিলেন। মিষ্টিমুখ করে ভিড়ের কারণে সাবিনারা লাউঞ্জে কোনোমতে আসতে পারলেও পূর্ব নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনটি হতে পারেনি। সেখান থেকে ভিড় এড়িয়ে তাদের অন্য পাশে নেওয়া হয়। এর বেশ কিছু সময় পর লাউঞ্জের বাইরে মিনিট কয়েকের জন্য নিজেদের অভিব্যক্তি জানিয়ে গেছেন সাবিনা-ছোটনরা।

বাইরে তখন খোলা ছাদের বাসটি অপেক্ষায় ছিল তাদের বরণ করে নিতে। আর সামনেই বাদ্য-বাজনা বাজছিল। বাসে ওঠার আগে ফুলের বৃষ্টিতে ভিজেছেন সবাই। নিরাপত্তা কর্মীদের বেষ্টনী ঘিরে সাবিনাদের বাস ততক্ষণে ধীরে ধীরে চলতে শুরু করেছে।

সাফজয়ী অদম্য মেয়েদের বরণ করতে অপেক্ষায় বাফুফের কর্তাব্যক্তিরা। ছবি: সাজ্জাদ হোসেনবিমানবন্দরের বাইরে তখন ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার পালা। খোলা বাসের একদম সামনে অধিনায়ক সাবিনা। হাতে ট্রফি। তার পাশে সানজিদা আক্তার, ঋতুপর্ণা চাকমা, মাশুরা পারভীনসহ অন্যরা। কোনও সময় ট্রফি ধরে উল্লাস প্রকাশ করছিলেন সাবিনা, আবার ক্রীড়াপ্রেমীদের অভিবাদনেরও জবাব দিতে দেখা গেছে তাকেসহ অন্যদের। সাফজয়ী ছবি সংবলিত ব্যান্ডিং করা বাসটিতে চড়ে বসেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীসহ বাফুফের কর্মকর্তারাও। রাস্তার দুপাশে তখন মানুষজনের ভিড় ছিল দেখার মতো।

বিমানবন্দর থেকে বিজয়ীদের বাস কাকলী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিজয় সরণি ফ্লাইওভার, তেজগাঁও পেরিয়ে মগবাজার-মৌচাক-কাকরাইল-ফকিরাপুল-মতিঝিল হয়ে পৌঁছায় বাফুফে ভবনে। ততক্ষণে সূর্যের আলো নিভে সন্ধ্যা গড়িয়েছে। কয়েক ঘণ্টার এই পথ পাড়ি দিতে দুধারে প্রচুর মানুষের ভালোবাসা কুড়িয়েছে ফুটবল দল।

সাফজয়ী মেয়েদের অভিবাদন জানাতে বাফুফেতে হাজির হয়েছিলেন হাজারও ক্রীড়াপ্রেমী। ছবি: সাজ্জাদ হোসেনশেষটাও কম জমকালো হয়নি। বাফুফে ভবনে তখনও অনেক মানুষ। অধীর অপেক্ষা। সেখানে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ছাড়াও অন্যরা তাদের রাজকীয়ভাবে বরণ করে নিয়েছেন। নিজের ঢেরাতে ফেরার অন্য রকম আনন্দ। এই দীর্ঘ যাত্রায় সাবিনাদের ক্লান্ত মনে হলেও সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসায় সবকিছুই বৃষ্টির পরশের মতো উবে গেছে। সবার হৃদয়ছোঁয়া ভালোবাসায় সিক্ত সাবিনা-সানজিদারা।

বিমানবন্দর থেকে বাফুফে ভবন—সোনার মেয়েদের স্বর্ণালি আনন্দভ্রমণ!