কুমিল্লার ভাষা সৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে ঐতিহ্যবাহী ক্লাব মোহামেডানের নবজাগরণ হয়েছে। ফেডারেশন কাপের ফাইনালে আট গোলের রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে টাইব্রেকারে আবাহনী লিমিটেডকে হারিয়ে দীর্ঘদিন পর শিরোপা এসেছে তাদের ঘরে। পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকা ম্যাচের ভাগ্য শেষপর্যন্ত নিজেদের দিকে নিয়ে গিয়ে আলোড়ন তৈরি করেছে সাদা-কালো জার্সিধারীরা। এমন সাফল্যের পেছনে জাতীয় দলের সাবেক তারকা ও বর্তমানে হেড কোচ আলফাজ আহমেদের অবদান কম নয়। মাঝপথে দায়িত্ব নিয়ে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন একসময়ের এশিয়ার মাসসেরা ফুটবলার। শিরোপা জেতার পর চারদিক থেকে শুভেচ্ছা বৃষ্টিতে ভিজছেন ৫০ বছর বয়সী কোচ। ট্রফি জয়ের আগে ও পরে নানান দিক নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের মুখোমুখি হয়ে আলফাজ শুনিয়েছেন অনেক কথাই……
বাংলা ট্রিবিউন: ২০১৪ সালে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করে এবার এসে প্রথম সাফল্য পেলেন। তার ওপর এমন রুদ্ধশাস ম্যাচ জিতে। নিশ্চয়ই অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছে…
আলফাজ: তা তো অবশ্যই। দেখুন মোহামেডানে অনেক দিন ধরে শিরোপা খরা চলছে। আমরা খুব করে চাইছিলাম একটা শিরোপা জিততে। সমর্থকরাও আছে এর মধ্যে। সেই সাফল্য কুমিল্লার মাঠে এসে ধরা দিয়েছে। এমন আনন্দ আসলে বাধনহারা। বলে বোঝাতে পারবো না।
খেলোয়াড়ি জীবনে অনেক সাফল্য পেয়েছেন। কোচিং ক্যারিয়ারে এই প্রথম সফলতা পেলেন। ম্যাচশেষে কুমিল্লার ফাইনালকে এগিয়ে রেখেছেন। একটু পরিষ্কার করে বলবেন কারণটা?
আলফাজ: খেলোয়াড়ি জীবনে শিরোপা জিতেছি অনেকবার। সবমিলিয়ে সেটা দুই ডজনের কাছাকাছি বা এর চেয়ে বেশি। কোচিং করতে এসে ৯ বছরের মাথায় প্রথম সাফল্য এলো। তাও আবার এমন ৮ গোলের রুদ্ধশ্বাস টাইব্রেকারের ম্যাচে। আসলে এমন ম্যাচ সেভাবে খেলা হয়নি। ডাগআউটে বসে তাই মনে হয়েছে অন্য কিছুর চেয়ে এই সাফল্যকে সবচেয়ে এগিয়ে রাখা উচিত।
কুমিল্লা থেকে উৎসব করতে করতে ক্লাব তাঁবুতে ফিরেছে দল। সেখানেও এক পশলা আনন্দ-উৎসব হয়েছে। নিশ্চয়ই রাতে ঘুমটা ভালো হয়েছে?
আলফাজ: তা তো অবশ্যই। এমন ম্যাচের পর ঘুম তো ভালো হওয়ারই কথা। এমনিতে অনেক টেনশনে ছিলাম। ১৪ বছর পর ফাইনালে উঠে শিরোপা জিততে পারবো কিনা? সমর্থক সবার কাছ থেকে চাপ ছিল। যে করেই হোক শিরোপা জিততে হবে। আমি নিজেও চাইছিলাম সাফল্য পেতে। সবার চেষ্টায় এখন নিজেকে সফল মনে হচ্ছে।
এই সাফল্যের পেছনে কাকে বেশি নম্বর দেবেন?
আলফাজ: আমার দলের সবাই ভালো খেলেছে। গোলকিপার সুজন থেকে শুরু করে দিয়াবাতে সবাই যার যার জায়গা থেকে সেরাটা দিয়েছে। একটা ফাইনাল ম্যাচে যেভাবে খেলা উচিত সেভাবেই খেলেছে সবাই। ৯০ মিনিট। এরপর আরও ৩০ মিনিট। সবশেষ টাইব্রেকার। এমন স্নায়ুচাপের ম্যাচে শেষটা ভালো করা কম চাট্টিখানি কথা নয়। এর জন্য দলের সব খেলোয়াড়দের প্রশংসা করতেই হচ্ছে।
একটু আলাদা করে যদি সুলেমানে দিয়াবাতের কথা বলি। আবাহনীর বিপক্ষে একাই চার গোল দিয়ে ম্যাচ টাইব্রেকারে নিয়ে গেছে মালির এই তারকা ফুটবলার। আপনি কী বলবেন?
আলফাজ: দিয়াবাতে খুব ভালো একজন স্ট্রাইকার। ও জানে কখন কী করতে হবে। ফাইনাল ম্যাচে ও যা সুযোগ পেয়েছে তা থেকেই গোল করার চেষ্টা করেছে। এমন একজন সুযোগ্য স্ট্রাইকার থাকলে সাফল্য তো আশা করাই যায়ই। আর ফাইনাল জিতে তা প্রমাণও হয়েছে।
কিন্তু প্রথমার্ধে যেভাবে আবাহনী ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল তখন কী ঘুরে দাঁড়াতে পারবেনব বলে মনে হয়েছিল?
আলফাজ: আমি কখনও আশা হারাই না। বিরতির পর ওদের বলেছিলাম মাথা ঠাণ্ডা করে খেলতে। তিনটি পরিবর্তন এনেছিলাম। ফরমেশনও কিছুটা পাল্টানো হয়েছে। তাতেই সাফল্য এসেছে। দল লড়াকু মনোভাব নিয়েই ম্যাচ জিতেছে।
একটু পেছনে ফিরে যাই। মৌসুমের মাঝপথে শফিকুল ইসলাম মানিকের জায়গায় আপনাকে যখন হেড কোচ করা হলো তখন কী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন?
আলফাজ: আসলে তখন সহকারী থেকে হেড কোচ হয়ে চ্যালেঞ্জটা ভালোভাবেই নিয়েছিলাম। ভাগ্য ভালো ছিল তখন প্রিমিয়ার লিগে একমাসের বিরতি ছিল। সেই সময় নতুন করে ফিটনেসের দিকে দৃষ্টি দেই। নিজের মতো দলকে অনুশীলন করাতে পেরেছিলাম। সেই পরিশ্রমের পর এবার ট্রফি জয় বেশ কাজে দিয়েছে।
ফেডারেশন কাপের ট্রফি জিতে মোহামেডানের সামনে নতুন করে দুয়ার উন্মুক্ত হলো। এখন তো সমর্থকদের চাওয়া-পাওয়া আরও বেড়ে গেলো। আপনি কি মনে করেন সামনের দিকে সাদা-কালো দল নিয়ে আরও সাফল্য আসবে?
আলফাজ: সামনের মৌসুমে দল কেমন হবে তা কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন। আমিও চাই এই মোহামেডান যেন আগের মতো সাফল্যের উচ্ছ্বাসে ভাসে। আনন্দের জোয়ার আসে। সমর্থকরা আগের মতো আনন্দে মাতে।
নিজের ৯ বছরের কোচিং ক্যারিয়ারে প্রথম সাফল্য। ক্যারিয়ার নিয়ে স্বপ্নের ডালপালা তো নিশ্চয় বেড়েছে...
আলফাজ: তা তো বেড়েছেই। কোচিং যেখানেই করাই না কেন, আমি চাই সাফল্য আরও পেতে। মোহামেডানের হয়ে আরও সাফল্য পেলে তখন আরও ভালো লাগবে। এছাড়া একটা সুপ্ত ইচ্ছা আছে। জাতীয় দলে একসময় কোচিং করাতে চাই। একসময় অনেক খেলেছি। লাল-সবুজ দলে কোচিং করাতে পারলে তখন নিজেকে সার্থক মনে হবে।