ইউরোপ মুখ ফিরিয়েছে, ইনফান্তিনোর ভরসা এখন ছোট দেশগুলো!

ফিফার ক্ষমতার মসনদে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর অবস্থান এখন আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি নড়বড়ে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ফুটবল সংস্থাগুলো প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তবে এই সংকটেও আশার আলো দেখছেন ইনফান্তিনো। কারণ বিশ্ব ফুটবলে বড় শক্তির পাশাপাশি সমান ভোটাধিকার রয়েছে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর। আর সেই দেশগুলোর সমর্থনই হতে পারে তার ক্ষমতা ধরে রাখার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কারণ তারা ফুটবল উন্নয়ন অনেকটাই ফিফার আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার বিতর্কিত প্রস্তাব ভেস্তে যাওয়ার পর গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন ইনফান্তিনো। উয়েফা ও কনকাকাফ ইতোমধ্যে তার নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছে।

আগামী বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা কংগ্রেসে তিনি চতুর্থ মেয়াদের জন্য সভাপতি পদে লড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে তার ওপর চাপ নির্বাচনের আগে আরও বাড়তে পারে।

সোমবার ওয়েলস প্রথম জাতীয় ফুটবল সংস্থা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। একই সঙ্গে উয়েফা জানিয়েছে, বিতর্কিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে তারা ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে।

ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের অন্তত ২০ শতাংশ লিখিতভাবে দাবি জানালে একটি বিশেষ কংগ্রেস ডাকা সম্ভব। এমনটি হলে তিন মাসের মধ্যে সেই সভা আয়োজন করতে হবে এবং সেখানে নতুন প্রার্থীরাও সামনে আসতে পারবেন।

শুধু উয়েফারই ৫৫টি সদস্য দেশ রয়েছে। তারা সবাই একমত হলে একাই বিশেষ কংগ্রেস ডাকার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে পারবে।

তবে বিশেষ কংগ্রেস হলেও ইনফান্তিনোকে অপসারণ করা সহজ হবে না। কারণ ফিফায় ধনী-গরিব, বড়-ছোটসহ সব দেশের ভোটের মূল্য সমান। ২১১টি সদস্য দেশের প্রত্যেকটিরই একটি করে ভোট রয়েছে।

এ কারণে ফ্রান্স, স্পেন বা ইংল্যান্ডের মতো বড় ফুটবল শক্তিগুলোর সমর্থন ফেরানোর চেয়ে ভুটান, ভানুয়াতুর মতো ছোট দেশগুলোর সমর্থন ধরে রাখাই ইনফান্তিনোর জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এসব দেশ কখনও বিশ্বকাপে খেলেনি এবং তাদের ফুটবল উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ অনেকটাই ফিফার অনুদানের ওপর নির্ভরশীল।

২০২৩-২৬ বিশ্বকাপ চক্রে ফিফার সদস্য দেশগুলো ফুটবল উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সর্বোচ্চ ৩০ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত অনুদান পেতে পারে, যা আগের চক্রের তুলনায় ১০ লাখ ডলার বেশি।

সমৃদ্ধ ফুটবল দেশগুলোর জন্য এই অর্থ খুব বড় না হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনাটিও মূলত এসব ছোট সদস্য দেশের সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যেই আনা হয়েছিল। ইনফান্তিনোর সময়ে অনেক ছোট দেশই উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পেয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৬০তম স্থানে থাকা ভানুয়াতুর জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে তিন লাখের কাছাকাছি। তবে দেশটির ফুটবল সংস্থার প্রধান ল্যামবার্ট মালটক ফিফার নির্বাহী পরিষদের আট জন সহ-সভাপতির একজন।

ফিফা ভানুয়াতুর রাজধানী পোর্ট ভিলায় ৬ হাজার ৫০০ আসনের একটি স্টেডিয়াম নির্মাণে ৪১ লাখ ৫০ হাজার ডলার অনুদান দেয়। স্টেডিয়ামটি ২০২২ সালে সম্পন্ন হয়।

ভানুয়াতুর প্রথম পেশাদার ফুটবলার ব্রায়ান কালটাক মনে করেন, ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

তিনি বলেছেন, ‘প্রথমত তিনি আমাদের দেশের প্রতিনিধিকে ফিফার নেতৃত্বে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু ভানুয়াতু নয়, তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই ফুটবলের প্রসারে কাজ করছেন।’

এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশেও ফিফার অনুদানে প্রশিক্ষণ মাঠ, জিমনেশিয়াম ও বিভিন্ন ফুটবল উন্নয়ন কর্মসূচি চালু হয়েছে, যা জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর পক্ষে নিজস্ব অর্থায়নে করা কঠিন।

তবে সমালোচকদের মতে, এই অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে ফিফা আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখে। ফলে বর্তমান সভাপতির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সমর্থন গড়ে তোলা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

ফলে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে সরানোর যেকোনও প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত শুধু ইউরোপের বড় দেশগুলোর ওপর নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভোটের হিসাবের ওপরও নির্ভর করবে।