আসিয়ান কাপে ৩ ম্যাচে ১৩ গোল হজম করেছে বাংলাদেশ, গোল শোধ দিয়েছে মাত্র দুটি। তবে সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯–২ গোলে অসহায় আত্মসমর্পণ। জাকার্তায় যেন একের পর এক ধাক্কায় ভেঙে পড়েছে বাংলাদেশের প্রতিরোধ। প্রশ্ন উঠেছে দলের কৌশল, স্থানীয় ও প্রবাসী ফুটবলারদের সমন্বয় এবং সর্বোপরি দেশের ফুটবলের সামগ্রিক কাঠামো নিয়ে। এত বড় ব্যর্থতার পর এবার কি বাফুফের চোখ খুলবে?
এমন ব্যর্থতার পর আগের রাতেই দেশে ফিরেছে বাংলাদেশ দল। তবে স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯ গোলের হারটি ছিল সবচেয়ে বড় বেদনার। সেই ধাক্কা এখনও পোড়াচ্ছে। মনে হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া থমাস ডুলির দল কখন কী করতে হবে, সেটিই যেন জানতো না।
প্রথম দুটি ম্যাচে যা হওয়ার হয়েছে। কিন্তু শেষ ম্যাচে ৯ গোল হজম করা মেনে নেওয়া কঠিন। বিশেষ করে যে দলে হামজা-শমিতের মতো একঝাঁক প্রবাসী ফুটবলার রয়েছেন। শেষ ম্যাচটির পারফরম্যান্স নিয়ে এখনও চলছে কাটাছেঁড়া।
জার্মান-আমেরিকান কোচ ডুলির অধীনে বহু বছর পর আবারও ৯ গোল খেয়েছে বাংলাদেশ। অথচ পুরো ম্যাচে লাল-সবুজ দলটি কী পরিকল্পনা নিয়ে খেলেছে, সেটি বুঝাার উপায় ছিল না। ১৯ বছর বয়সী মিসেল বেকার একাই করেছেন পাঁচ গোল। অথচ প্রথম দুটি গোলের পরও তাকে আটকানোর কার্যকর কোনো পরিকল্পনা দেখা যায়নি।
ইন্দোনেশিয়ার উইংভিত্তিক আক্রমণ নস্যাৎ করা, রক্ষণ কিংবা মাঝমাঠে ব্লক তৈরি করার মতো খেলোয়াড় কোথায় ছিলেন- সেটিও ছিল প্রশ্ন। জোনাল মার্কিং কিংবা পরিস্থিতি বুঝে প্রতিপক্ষকে আটকানোর পরিকল্পনাও সেভাবে দেখা যায়নি। ডুলি ওপেন প্লেতে খেলতে গিয়ে যেন সর্বনাশই করে ফেলেছেন। প্রতিপক্ষের চাপে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে বাংলাদেশের প্রতিরোধ। অথচ একটু দেখেশুনে, সংগঠিতভাবে খেলতে পারলে গোলের ব্যবধান কম রাখা সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে স্থানীয় ও বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয় আরও ভালো হওয়া প্রয়োজন ছিল।
জাকার্তায় সাবেক স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজন বাংলাদেশের খেলা দেখে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘আমার কাছে ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে ৯–২ ব্যবধানের এই হারটি কেবল একটি খারাপ ম্যাচের ফলাফল নয়। এটি বাংলাদেশের ফুটবলে বছরের পর বছর ধরে কোনও প্রকৃত উন্নতি না হওয়ার ফল। আমি ২০২১ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ ছিলাম। সে সময় খুব সীমিত প্রস্তুতি সত্ত্বেও আমরা চার ম্যাচে পাঁচ পয়েন্ট সংগ্রহ করেছিলাম। আমরা শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছিলাম, ভারত ও নেপালের সঙ্গে ড্র করেছিলাম, কেবল ক্লান্তির কারণে মালদ্বীপের কাছে হেরেছিলাম এবং শেষ ম্যাচ পর্যন্ত ফাইনালের দৌড়ে টিকে ছিলাম।’
এরপর নিজের হতাশার কথা জানিয়ে ব্রুজন বলেন, ‘পাঁচ বছর পর, জাতীয় দলের মানের কিংবা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এর পেছনের উন্নয়ন কাঠামোয় কোনো স্পষ্ট অগ্রগতি দেখতে পাওয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো যেভাবে স্থানীয় ফুটবলারদের মান ক্রমশ অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ কোনও স্থায়ী জাতীয় দল তৈরি করতে পারছে না!’
বাংলাদেশের সাবেক তারকা ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন চুন্নুও লজ্জিত। তিনি বলেন, ‘৪১ বছর আগে জাতীয় স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপে প্রিলিমিনারি কম্পিটিশনে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে আমি উইনিং গোল করেছিলাম। সেবার আমরা ২-১ গোলে জিতেছিলাম। আর আজ দেখলাম সেই বাংলাদেশেরই এমন বিধ্বস্ত অবস্থা। খেলা দেখে সত্যিই লজ্জিত হয়েছি।’
আরেক সাবেক তারকা ফুটবলার সৈয়দ রুম্মান বিন ওয়ালী সাব্বিরের মতে, ‘বাংলাদেশের ফুটবলের মূল সমস্যা কাঠামোগত দুর্বলতা ও পরিকল্পনার অভাব। সারা দেশে নিয়মিত লিগ ও প্রতিযোগিতা না থাকায় খেলোয়াড় তৈরির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। লিগের সময়সূচি, ক্যালেন্ডার ও ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে অনিশ্চয়তা। পাশাপাশি প্রবাসী ফুটবলার বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও তাদের দক্ষতা, যোগ্যতা, কোন মানের লিগে খেলেন এবং পারফরম্যান্স-এসব যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে না। ফলে জাতীয় দলের শক্তি বাড়ানোর বদলে সমস্যাগুলোই থেকে যাচ্ছে।’
আরেক সাবেক তারকা স্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমিলি সরাসরি কোচকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে শুরু থেকে ওপেন প্লেতে খেলা ঠিক হয়নি। কোচের এই ম্যাচ ঘিরে কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়নি। ফুটবলাররাও তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারেননি।’
বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল জাতীয় দল কমিটিরও চেয়ারম্যান। আসিয়ান কাপের ব্যর্থতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছি। পরবর্তী জাতীয় দল কমিটির সভায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
দলের মধ্যে স্থানীয় ও বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের সমন্বয় বাড়ানো এবং সামনের দিনে এমন ব্যর্থতা কাটানোর কৌশল কী হতে পারে- জানতে চাইলে বাফুফে সভাপতি বলেন, ‘আমরা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছি। জাতীয় দল ও টেকনিক্যাল কমিটির যৌথ সভায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আশা করছি, আমরা ভালো কিছু করতে পারবো।’